তারাস বুলবা, নিকোলাই গোগোলের জাতীয়তাবোধের আরেকটি স্বাক্ষর

গ্রন্থ: তারাস বুলবা (মিরগোরদ,আরাবস্কি),

লেখক: নিকোলাই গোগোল

নিকোলাই গোগোলকে নতুন করে পরিচয় করে দেয়ার কিছু নেই। পুশকিনের পরেই রুশ কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান অগ্রগন্য। জাতীয়তাবোধকে কথাসাহিত্যে তুলে ধরার মাধ্যমে আপন জাতি ও জাতীয়তাবাদকে লালন এবং তার প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে গোগোল রুশ সাহিত্যে আলাদা একটি ধারাই সৃষ্টি করেছিলেন। যা পরবর্তী অনেক সাহিত্যিক ধারণ করেছেন,এমনকি দস্তয়েভস্কির মত শক্তিমান সাহিত্যিক পর্যন্ত এ “গোগোলীয় ধারার” অনুগামী।

তারাস বুলবা উপন্যাসটি নিকোলাই গোগোলের “মিরগোরদ” উপন্যাসমালায় প্রথমে অন্তর্ভূত হলেও পরে তা “আরাবস্কি”তে সংযুক্ত হয়। উপন্যাসটি লিখতে প্রায় নয় বছর সময় লেগেছে। মুলত তুর্কী সালতানাত ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পোলীয় আক্রমণের মুখে ইউক্রেনের দোনেতস্ক ও নিপার নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে যোদ্ধা ও লড়াকু ভুমিদাস “কসাক”দের নিয়ে লেখা উপন্যাসটিতে কসাকদের চারিত্রিক কাঠিন্য ও রুশদেশের প্রতি এবং খ্রিষ্টধর্মের প্রতি নিবেদনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের তুর্কী সালতানাত ও পোলীয় অভিজাততন্ত্র মিলে ভুমিদাস কসাকদের ইউক্রেনীয় ভুমি গ্রাস ও সনাতন খ্রিষ্টান উপাসনালয় গুলোয় ক্যাথলিকদের ঘাড়ে বসে অভিশপ্ত,মতলববাজ ইহুদিরা আধিপত্য শুরু করলে অহংবোধে আঘাত লাগে নিপার-কসাকদের। চলে সমরযাত্রা।

তারাস বুলবা চরিত্রটি মুলত একজন বৃদ্ধ কসাকের। তারাস বুলবা ভেবে বিস্মিত হয় যে,তার পুত্রদ্বয় আন্দ্রি ও অস্তাপ সেমিনারীতে লেখাপড়া,দর্শন শিখে কি করবে! কারন একজন কসাকের জীবনের অর্থই হল যুদ্ধ ও বীরত্ব। নিকোলাই গোগোল “তারাস বুলবা”য় কসাকদের যে বর্ণনা দিয়েছেন,তাতে কসাকরা যুদ্ধপ্রেমী,ভদকা ও জাতিয় চেতনায় সজাগ। এরা সবরকম সাজসজ্জা পরিহার,এমনকি নারীপ্রেম ছিল এদের কাছে কাপুরুষজনোচিত। বরং নারীদের অবজ্ঞার মাঝে কসাক জীবনের অর্থ খুজে পেত।

তারাস বুলবার দুই পুত্র আন্দ্রি ও অস্তাপ সেমিনারী থেকে শিক্ষিত হয়ে ফিরলে বুলবা প্রথমেই পুত্রদ্বয়কে শক্তি পরীক্ষায় আহবান করে। এবং বড় ছেলে আন্দ্রি সে পরীক্ষায় পিতাকে পরাস্ত করলে বুলবা পুত্রের প্রশংসায় উচ্ছসিত হয়। জাপোরোলীয় সেচ হল কসাকদের সামরিক দলের নাম। তারাস বুলবা তার পুত্রদ্বয়কে দ্রুত জাপোরোলীয় সেচে ভর্তি করিয়ে দেন। জাপোরোলীয় সেচে সৈন্যদলের অলস সময় কাটতো ভদকা পানে আর শুয়ে বসে।  ইতিমধ্যেই পোলীয়রা ইউক্রেন দখল করতে শুরু করলে অনেক দেরীতে খবর পায় কসাকরা। পোলীয়দের হাত ধরে ইহুদি বেণিয়া ও সুদখোররা চেপে বসে ইউক্রেন জুড়ে।

এছাড়া খ্রিষ্ট ধর্মের সনাতন গির্জাগুলোয় ক্যাথলিকরা আধিপত্য শুরু করলে শুরু হয় দেশপ্রেমী ও খ্রিষ্টপ্রেমী কসাকদের লড়াই। কসাকরা যুদ্ধজয়ের পর ভয়াবহ নৃসংশতা করত।হয় সব জ্বালিয়ে সব ছাড়খার করত,নয়ত কেটে ঘোড়ার গাড়িরর পেছনে বেঁধে ছাড়ত। আর লুট তো ছিলই। এহেন কসাকদের আগমনবার্তা পেয়ে সন্ত্রস্ত পোলীয়রা পালাতে শুরু করলে,কসাকরা শহর অবরোধ করে। অবরোধে অনাহারে পোলীয়দের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠলে,অবরুদ্ধ শহর থেকে বুলবাপুত্র আন্দ্রির প্রিয়তমা আন্দ্রিকে দেখে ফেলে এবং দুতী মারফৎ খবর পাঠায় যেন,তাকে সামান্য হলেও রুটি পাঠায়।

কসাকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠা আন্দ্রি ছুটে যায় প্রিয়ার কাছে,অবরুদ্ধ শহরে। তাদের মিলনের যে বিবরণ দিয়েছেন গোগোল,তাতেই উপন্যাসটি সার্থক হয়ে উঠেছে আমার কাছে। আন্দ্রি প্রিয়ার প্রেমে,আলিঙ্গনে,চুম্বনে এতোই সিক্ত হয় যে,পক্ষত্যাগ করে পোলীয়দের অন্যতম সমরনায়কে পরিণত হয়। যদিও পিতার হাতে নিহত হওয়ার সময় কোন পোলীয় উদ্ধারে আসেনি। ঘটনাক্রমে বুলবার অপর পুত্র,অস্তাপ কসাকদের সেনাপতি হন। একইসময় তাতাররা কসাকদের পুরুষশুন্য শহরে আক্রমণ করলে উভয়সংকটে পতিত হয় কসাকরা। সেক্ষেত্রে তারা দুভাগ হয়ে পোলীয় ও তাতারদের মোকাবিলা করতে শুরু করে।

অভিনব ও অপুর্ব রণকৌশল প্রদর্শন করা সত্তেও পোলীয়দের কাছে পরাজিত হয় কসাকরা। ফাঁসি হয় বীর অস্তাপসহ সকল বন্দীদের। অস্তাপের ফাঁসি অনুসঠানে বুলবা গোপনে উপস্থিত থাকে। পরের বছর আবার পোলীয়দের আক্রমণ করে কসাকরা। এবার সেনাপতি বুলবা।
নিজের জীবনের বিনিময়ে রক্ষা করে কসাকদের সেনাদলকে।এবং বুলবা চিতকার করে বলে,আগামীবার আবার এসো কসাকদের অপমান শুধতে।
টলস্তয়ের “কসাক” আর গোগোলের “তারাস বুলবা ” মিলে কসাকদের যে চিত্র রচনা করেছে,তাতে খানিক অমিলও দেখা যায়। টলস্তয়ের “কসাক” উপন্যাসে দিমিত্রি অলেনিনের ছায়ায় শিল্পজ্ঞানে সমৃদ্ধ কসাকদের সাথে যে পরিচয় হয় আমাদের, গোগোলের রচনায় সে দিকটি অনুপস্থিত। শিল্পরসের স্থলে এখানে বীররস উপস্থিত।

উপন্যাসটি রুশসাহিত্যেরই নয় বরং বিশ্বসাহিত্যের একটি অমূল্য সম্পদ। সর্বভূক পাঠকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা “তারাস বুলবা “।

 

শাহাদাত তীরন্দাজ

Related Posts

About The Author

Add Comment