তারিক আলির “ক্ল্যাশ অফ ফান্ডামেন্টালিজম” বইটি পড়ার পর

এ টি এম গোলাম কিবরিয়া 

তারিক আলীকে কামেল আদমী ধরা হয়, চৌকষ মার্ক্সিস্ট তারিক অধুনা ইসলামোফোবিয়ার রমরমা পসারের দিনে একজন মুসলিম হিসেবে পশ্চিমের অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্সকে মোলায়েমভাবে দাঁড় করান। এইভাবে বললে একটু হার্শ হয়ে যায়, কিন্তু কাহিনী অনেকটা ওইরকমই। 

ক্ল্যাশ অফ ফান্ডামেন্টালিজম ২০০২ এ প্রকাশিত বই, নয় এগারোর পরবর্তী মার্কেট ধরার জন্য লেখা, কিন্তু ওই তাড়াহুড়োটা চোখে পড়েনা খুব একটা। ইসলামিক হিস্টরিতে লেখকের ভালো দখল আছে, কিন্তু ইসলামিক ফিলোসফিতে নয়। প্রি-ইসলামিক পিরিয়ডের আরবের অবস্থা ও তিনি এড়িয়ে গেছেন, ইসলামিক ডিসকোর্সে এড়ানো হয় আইয়ামে জাহেলিয়াত বলে কিন্তু একজন গবেষক কেন এড়িয়ে যাবে বোধগম্য হয়নি, হয়তো জ্ঞান কম ছিলো তার এই বিষয়ে। ৯/১১’র পর পশ্চিমে বেস্ট সেলার হয়ে উঠে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরান। মূলত পশ্চিমারা জানতে চায় কেন এইসব বর্বরেরা আমাদের টুইন টাওয়ারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের এই অনুসন্ধিৎসা মেটানোর জন্যই মূলত একটা নতুন জনরা তৈরী হয়, এই বইটাকে আমরা সেই জনরার ধরতে পারি। 

তথাকথিত মধ্যযুগের ইসলামী সভ্যতা তিনি বর্ণনা করেছেন এবং রেনেসাঁর যে দায়টুকু আছে তা স্বীকার করেছেন কিন্তু খুব বেশী গভীরে যাননি। বেশ কিছু দূর্দান্ত কবিতার অবতারনা করেছেন যেটা আমি আগে সবচেয়ে বড় ভোকাল ক্যারেন আর্মস্ট্রঙ্গের বইয়ে ও পড়িনি। মৌখিক সাহিত্যের ভালো চল ছিলো উত্তর আফ্রিকা ও আরবে, এরাবিয়ান কামসুত্র তাই বলে। যাই হোক, এই বইটা পড়ার আগে স্যামুয়েল হান্টিংটনের বিখ্যাত ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইযেশনটা পড়লে সুবিধা হয়, কারণ নামটা ওখান থেকেই নেয়া। তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলেছেন যে লড়াইটা মূলত দুই সভ্যতার মধ্যে, আব্রাহামিক রিলিজিওনের মেজোভাই ও তরুণতম ভাইটির মধ্যেই এই ঘামাসান লড়াই হচ্ছে।

মাঝখানে রমনীয় সমস্যা হিসেবে জেন্ডার ইস্যু ও এসেছে, জেন্ডার ইস্যুকে কিভাবে ডমিনেইট করে রিলিজায়াস ডিসকোর্স সেই কথা ও বলেছেন। সুন্নী স্কুল অফ থট ও শিয়া স্কুল অফ থট কিভাবে ডিফার করে তা ও বলেছেন কিন্তু পলিটিক্যাল এঙ্গেল থেকে বলেছেন, ফিলোসফিক্যাল স্পেক্ট্রাম টাচ করেননি। যতটুকু বুঝি ফিলোসফিক্যাল ডিসকোর্স খুব গুরুত্তপূর্ণ, কারণটা প্রাক্তন পারস্য বা বর্তমান ইরান দেখলে বোঝা যায়। উত্তরাধিকার সমস্যা থেকেই শিয়া স্কুলের শুরু হলেও তার দার্শনিক আলাপন বেশ আলাদা বলেই জানি। প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে ইরানী বিপ্লবের কথা কিন্তু তিনি খুব স্কেপ্টিক্যাল ছিলেন এই ব্যাপারে, অথচ ইরানীয়ান রেভলিউশনকে একটা বিশাল ঘটনা বলেই পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা ধরেন। তার সমীকরনে ভালো বাম বিকল্প না থাকলে মৌলবাদের প্রসারের যে কাহিনী তিনি বয়ান করেছেন সেই প্রস্তাবনার সাথে একমত, মিশর, তুরস্ক, আলজেরিয়া এবং ২০১৩ এর বাংলাদেশ ও সেই গল্পই বলে।

আমাদের স্বাধীনতা, একাত্তর, কাশ্মীর এবং তিনি যেহেতু পাকিস্তানী তাই পাকিস্তানের প্রসঙ্গ ও এসেছে। ওহ, অধুনা প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারে তিনি যে কথা বলেছেন, তা তিনি আগে ও বলেছেন, প্রথম আলোর সাক্ষাতকারটা সম্ভবত আংশিক ছাপা হওয়ার কারনে ভুল শুনিয়েছে। উনসত্তরের তুমুল সময়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন, আমতলায় বক্তৃতা দিয়েছেন এবং ভাসানীর সাথে পূর্ববাংলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। এছাড়া দুই আইডেন্টিক্যাল টুইনের একজন পাকিস্তানের জিয়াউল হকের কথা তিনি বলেছেন, আমাদের জেনারেল জিয়ার প্রসঙ্গ তাতে আসেনি, তবে বুদ্ধিমান পাঠক সহজেই মিল খুঁজে পাবেন।

মৌলবাদ বলে যাকে আমরা নাম ধরে ডাকি তার প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানে জিয়াউল হকের ভুমিকা এবং দ্যা বস মৌদূদীর অনেক অজানা কথন জানা যায়। ওহাবীজমের প্রতিষ্ঠাতা ইবনে ওহাব, মিশরের ব্রাদারহুডের সাইয়েদ কুতুব ও মৌদুদীর আন্তঃসম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের জের ধরে আফগানিস্তানে মুজাহিদিন দ্বারা কিভাবে আমেরিকা রাশিয়াকে বধ করতে চেয়েছিলো তার দারুন একটা বিশ্লেষন আছে এই বইয়ে। লেখক আপাদমস্তক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, তাই আমেরিকান সিআইএ কিভাবে দেশে দেশে বিপ্লব রপ্তানী করে আর গণতন্ত্রের ফুল ফুটায় তার ভালো বর্ননা আছে। মূলত ওই অংশটুকুই লেখকের শক্তির জায়গা। তিনি যেহেতু বিখ্যাত নিউ লেফট রিভিউর সম্পাদক, তাই আমেরিকার হাঁড়ির খবর তার জানতে হয়। সুহার্তোর কমিউনিস্ট নিধন, নাসেরের প্যানএরাবিক জাতীয়তাবাদ, গালফের করদ রাজ্য ও আমেরিকার স্ট্র্যাটেজি অফ মিনারেল ওয়ার থেকে শুরু করে উপসাগরীয় যুদ্ধ পর্যন্ত সব এসেছে। ডার্ক নাইট সাদ্দামকে ইরানের খোমেনীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া এবং পরে সাদ্দামের ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন হয়ে ওঠা, ব্যাট্ম্যান লাদেনের ক্রুসেড ও টুইন টাওয়ারের কেয়ামত কিভাবে লতায় পাতায় জড়ানো, এই সম্পর্কই তিনি প্রমান করেছেন তথ্য উপাত্ত দিয়ে।

এংলো-আমেরিকান ইম্পেরেলিয়াজম বোঝার জন্য এবং মৌলবাদের শিকড় সন্ধানে বইটি একটা ভালো আকরগ্রন্থ হতে পারে। তবে ইসলামিক ডিসকোর্সের ক্ষেত্রে তিনি হয়তো আরেকটু লিবারেল হতে পারতেন। রিভিলেশনের ব্যাপারগুলোকে আরেকটু সফটলি ডিল করা যেতে পারতো বলে আমার মনে হয়েছে, নাহলে তাতে ইসলামোফোবিয়াই জিতে যায়। এই ব্যালান্সটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তো, বৈশ্বিক মৌলবাদের বিকাশ, সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়ার টেরর এবং মুসলিম বিশ্বের ইদানীংকার লড়াইগুলো কেন দুই স্কয়ারের মধ্যে হচ্ছে তার একটা ধারনা আমরা পেতে পারি এই বইয়ে। আমাদের দেশে মৌলবাদের যে চোরা স্রোত বহমান থেকে আবহমান বাংলার মোজাইক নস্ট করতে চাইছে, তার ঠিকুজি খোঁজার পথে এই বইটি সহায় হবে বলে আমার ধারনা। ভ্রমন সুখকর হোক। 

Related Posts

About The Author

Add Comment