দর্শনের মৌলিক প্রশ্ন কি কি?

… the only thing we require to be good philosophers is the faculty of wonder…

বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা হচ্ছে দার্শনিকের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা! আচ্ছা এমন কিছু জিনিস আছে কি যা আমাদের সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করে; অবস্থান যা-ই হউক না কেন।

এই যে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভিন্ন হয়ে যায়। তবে একটি মানবশিশু যখন পৃথিবীতে প্রথম আসে তার বিস্ময়ের ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ। এবং সে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে পৃথিবীর সাথে প্রয়োজনমত বুঝাপড়া করে নেয়। এ সময়টাতে তার শিক্ষাগ্রহণের হারটা থাকে সর্বোচ্চ। সে কত অল্প সময়ে, কত দ্রুত কত বিষয়-ই না শেখে ফেলে!সে বিভিন্ন জিনিসের পরিচয় জানে, বিভিন্ন ব্যক্তিকে আলাদা করে চেনে, বিভিন্ন বস্তুকে চেনে, হামাগুড়ি দিতে শেখে, হোঁচট খেতে খেতে দাঁড়াতে শেখে, হাঁটতে শেখে, দৌড়াতে শেখে। এবং সে কিন্তু এক-একটি জিনিস আলাদা আলাদা করে শেখে না। একসাথে অনেকগুলো জিনিস শেখে। বেশিরভাগ মানুষই তার শৈশবে যে হারে নতুন জিনিস শিখেছে সারাজীবনে তার সমান বা কাছাকাছি পরিমাণ শিখতে পারে না। এর কারণটা হচ্ছে শিশুর সেই বিস্ময়টা আর থাকে না, বা বিস্ময়টাকে তারা মেরে ফেলে।

বড় হওয়ার সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হলো এই বিস্ময়ের ক্ষমতাটাকে মেরে ফেলা। পৃথিবীকে অভ্যাসের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া। কিন্তু শিশুর মতো বিস্ময়টা যারা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন তাদের পক্ষেই সম্ভব নতুন কিছু দেওয়া। এজন্য সকল সৃষ্টিশীল মানুষকে আমরা দেখবো তারা শিশুর মতো সৃজনশীল! একজন আইনস্টাইন, একজন লিওনার্দো ভিঞ্চি, একজন আলভা এডিসন বা একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের শেষ অবধি নিজেদের সেই শিশুসুলভ বিস্ময়ের ক্ষমতাকে লালন করেছেন এজন্য তারা অন্য বড়দের মতো যেকোন উত্তরেই সন্তুষ্ট থাকেন নি। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে নতুন নতুন জিনিসের সন্ধান করেছেন, মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছেন।

জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কি সেটা প্রশ্ন করলে একেকজন একেকরকম উত্তর দেবে। যে ক্ষুধার সর্বোচ্চ সীমায় আছে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে অন্ন। যে ঠান্ডায় মারা যাচ্ছে তার কাছে উষ্ণতা। আর যে একাকীত্ম আর নির্জনতার সমুদ্রে ডুবছে তার কাছে বন্ধুত্ব বা মানুষের সঙ্গ। আচ্ছা, এ প্রয়োজনগুলো যখন ফুরিয়ে যাবে তখন কি এমন কোন প্রয়োজন আছে যা সবার সাথেই মিলে? সেই সব প্রশ্নগুলো নিয়ে আসলে দর্শন কাজ করে। খালি রুটি-রুজি-হালুয়া নিয়ে মানুষ সন্তুষ্ট থাকতে পারে না, পরিপূর্ণ হতে পারে না, তার আরও বেশি চাই, আরও মহান কিছু চাই, আরও সাবলাইম।

দর্শনের এই জগতের দিকে আগানোর সেরা উপায় বাতলে দিতে গিয়ে ‘সোফির জগত’-এর সেই রহস্যময় দার্শনিক পরামর্শ দেন: ‘দর্শনের দিকে আগানোর সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে কিছু দার্শনিক প্রশ্ন করা-কেমনে পৃথিবী সৃষ্টি হলো? এ সব ঘটনাগুলোর পেছনে কোন উদ্দেশ্য বা অর্থ আছে? আচ্ছা, মৃত্যুর পর কি জীবন আছে? আমরা এসব প্রশ্নের কিভাবে উত্তর দেবো? আর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে-আমরা কেমনে বাঁচবো?

মানুষ যুগে যুগে এই প্রশ্নগুলো করে আসছে। বিশ্বের যেকোন অঞ্চল বা সম্প্রদায়ই মানুষ কি, এই বিশ্ব কেমনে আসলো প্রশ্নগুলো করে থাকে। আসলে দর্শনের বেশি প্রশ্ন নেই তো। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়ে গেছে। যদিও ইতিহাসে আমরা বিভিন্ন বিভিন্ন উত্তর পেয়ে আসছি। দার্শনিক প্রশ্নের মজার দিক হচ্ছে উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন করাটা সহজ। এই আজকের যুগেও প্রত্যেক মানুষকে তার প্রশ্নগুলো করতে হবে। ঈশ্বর আছে কি নাই, মৃত্যুর পর জীবন আছে কি নাই-এসব প্রশ্নের উত্তর তো আর কোন বিশ্বকোষে খুজে পাওয়া যাবে না। অথবা কোন বিশ্বকোষ আমাকে দেখিয়ে দিতে পারবে না আমাকে এভাবে বাঁচতে হবে। অবশ্য আমাদের আগের মানুষেরা বা অন্যরা কিভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর খুজেছে, কি উত্তর পেয়েছে তা জানা গুরুত্বপূর্ণ বৈকি।

 

বই সহায়তা: সোফিজ ওয়ার্ল্ড, ইয়োস্তেন গার্ডার

উপরের প্রচ্ছদ ছবি: ডেভিডের ‘দে ডেথ অব সক্রেতিস’

sophie

(দর্শনের দুনিয়ায় আস্তে আস্তে প্রবেশ করতে চাই। দর্শনের জগতে আমার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রেখে যাওয়ার জন্য এই লিখে যাওয়া। আমার মতো বা আমার চেয়ে বেশি দর্শনপ্রেমী যারা তারা এখানে সঙ্গী হতে পারেন। ফিলসফি শব্দের শাব্দিক অর্থ ‘জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা’। এই সূত্রে আমরা সহোদর বা সতীর্থ। যেকোন পরামর্শ বা সংশোধনী সাদরে গ্রহণ করা হবে। )

Related Posts

About The Author

Add Comment