দর্শন ও দার্শনিকদের গল্প: অ্যানাক্সিমেন্ডার

AnaximanderRelief

এটি হচ্ছে এখন পর্যন্ত পাওয়া অ্যানাক্সিমেন্ডারের সবচেয়ে প্রাচীন মূর্তি। ধারণা করা হয় রোমানরা গ্রিকদের কোন আসল ছবি থেকে এটি এঁকেছে। এ ভাঙা মূর্তিটির মতই অ্যানাক্সিমেন্ডারের দর্শন আমাদের কাছে অসম্পূর্ণ আকারে এসেছে।

দর্শনের ইতিহাসে অ্যানাক্সিমেন্ডারের অবস্থান উপরে দেওয়া ছবিটির মতোই। সম্পূর্ণ মূর্তির ভগ্নাংশ মাত্র। এটি হচ্ছে এখন পর্যন্ত পাওয়া অ্যানাক্সিমেন্ডারের সবচেয়ে প্রাচীন মূর্তি। ধারণা করা হয় রোমানরা গ্রিকদের কোন আসল ছবি থেকে এটি এঁকেছে। এ ভাঙা মূর্তিটির মতই অ্যানাক্সিমেন্ডারের দর্শন আমাদের কাছে অসম্পূর্ণ আকারে এসেছে। তা থেকে সম্পূর্ণ চিত্র আঁকা যায় না। আমরা যখন তার দর্শন নিয়ে আলাপ করবো তখন আসলে তার দর্শনের ভগ্নাংশ নিয়ে আলোচনা করেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

সবারই ধারণা অ্যানাক্সিমেন্ডার থেলিসের ছাত্র ছিলেন। গুরুর মতো তিনিও ছিলেন মাইলেটাস এর বাসিন্দা। মাইলেটাস বর্তমান তুরস্কের মাঝে পড়ে। থেলিসের মৃত্যুর পর তারই স্কুলের দায়িত্ব নেন এবং অ্যানাক্সিমিনিস ও পিথাগোরাসের মতো ছাত্রদের শিক্ষকতা করেন। অ্যানাক্সিমেন্ডার দর্শনের প্রথম রচয়িতা, বিশ্বের মানচিত্র অঙ্কনকারী এবং বিবর্তনবাদের আদি পুরুষ। সম্ভাব্য জন্ম ৬১০ খ্রি.পূ. এবং মৃত্যু ৫৪৬ খ্রি.পূ.। থেলিস যখন তার সেরা সময়ে ছিলেন সে সময়টাতে অ্যানাক্সিমেন্ডার তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। প্রথম গ্রিক হিসেবে দর্শনের বই লিখলেও তার সে বইয়ের কোন কপি পাওয়া যায় না। বইয়ের খন্ডাংশ বিভিন্ন প্রাচীন লেখকের লেখাতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন জনের লেখাতে তার বইটির নাম এসেছে ‘অন ন্যাচার’। কবিতার মাধ্যমে তার দর্শনকে প্রকাশ করেছিলেন অ্যানাক্সিমেন্ডার। এরিস্টটল এবং তার ছাত্র থিওফ্রাস্টাসের বিদ্যায়তন ‘লাইসিয়াম’-এর লাইব্রেরিতে বইটি ছিল হয়তো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে অ্যাপোলোডোরাস নামে এক ভদ্রলোক আলেক্সান্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরিতে বইটির একটি খন্ড পেয়ে বিস্মিত হয়েছিলেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসে সিসিলির তাওরমিনা লাইব্রেরিতে একটি ক্যাটালগের অংশবিশেষে অ্যানাক্সিমেন্ডারের নাম দেখে অনুমান করা হচ্ছে হয়তো সেখানেও অ্যানাক্সিমেন্ডারের বইটি ছিল। কিন্তু থিওফ্রাস্টাসের পর ৬০০ খ্রিস্টাব্দে সিমপ্লিসিয়াসের লেখাতেই কেবল অ্যানাক্সিমেন্ডারের বইয়ের অংশবিশেষ উঠে এসেছে। এরিস্টটলের ‘ফিজিকস’ বইটির উপরে আলোচনায় অ্যানাক্সিমেন্ডারের লেখার সেই অংশটুকু উল্লেখ করেছিলেন। এ অংশটিকে দর্শনের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত অনুচ্ছেদের একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

Whence things have their origin,
Thence also their destruction happens,
As is the order of things;
For they execute the sentence upon one another
– The condemnation for the crime –
In conformity with the ordinance of Time.

 

সমকালে জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি ও ভূগোলজ্ঞানের কারণে খ্যাতিমান ছিলেন। এবং প্রথম মানচিত্র অঙ্কনকারী হিসেবে সম্মানিত হয়ে আসছেন। বিজ্ঞানের ও আদি পুরুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। তিনি মনে করতেন মানব সমাজের মতো প্রকৃতিও কিছু নিয়মের অধীন। কেউ এই নিয়মে বাঁধা প্রদান করলে তার অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে।

থেলিসের মতে মহাবিশ্বের মূল সূত্র ছিল পানি। অ্যানাক্সিমেন্ডার থেলিসের সাথে একটা জায়গায় একমত হয়েছিলেন সেটা হলো মহাবিশ্বের মূল সূত্র কোন বস্তু হতে পারে। তবে সেটা যে পানি হবে এটা বলেন নি।

মহাবিশ্বের মূল সূত্রটি যদি কোন বস্তু হতো তাহলে সেটা অন্য বস্তুর উপর ক্ষমতাবান হতে পারতো। কিন্তু বায়ু শীতল, পানি আদ্র এবং আগুন গরম। এর কোন একটা যদি সৃষ্টির আদি উপাদান হতো তাহলে অন্যগুলোর উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারতো। সকল দৃশ্যমান উপাদনই পরিবর্তনশীল। একটি উপাদান অন্যটির উপর ক্ষমতাবান হলে তাকে সড়িয়ে দিতো। পৃথিবীর এই যে বিভিন্ন উপাদানগুলো সেগুলো একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। কেউ কারো প্রতি অধিক ক্ষমতাবান নয়। এজন্য সৃষ্টির প্রথম কারণ (ফার্স্ট কজ) বা আদি উপাদান এগুলোর কোনটাই হতে পারে না। সৃষ্টির আদি উপাদান এগুলোর বাইরের কোন জিনিস হতে পারে যেটাকে হয়তো ধরা যায় না, ছোয়া যায়না। তার কাছে সেটা ছিল একটি আকারবিহীন, রংহীন, বর্ণহীন, অনির্দিষ্ট কোন একটা বস্তু। এটাকে অ্যানাক্সিমেন্ডার নাম দিয়েছিলেন ‘এপেইরন’ (Apeiron) যার অর্থ হতে পারে ‘অসীম’, ‘অ-সংজ্ঞায়িত’ বা ‘অনন্ত’। ইংরেজিতে এটাকে ‘ইনফিনিট’, ‘বাউন্ডলেস’ বা ‘ইনডেফিনিট’ (indefinite, infinite, boundless, unlimited) ইত্যাদি অর্থ করা হয়েছে।

অ্যানাক্সিমেন্ডার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা করার পথিকৃৎ। পৃথিবীর মানচিত্র আঁকার সময় তিনি মনে করতেন পৃথিবীর আকৃতি সিলিন্ডার/নল বা চোঙার মতো। তিনি আরও মনে করতেন সূর্য্য পৃথিবীর সমান বড় বা তার চেয়ে সাতাশ গুণ কিংবা আটাশ গুণ বড়। তিনি যে মতামতই রেখেছেন তা তখন পর্যন্ত সায়েন্টিফিক বা র‌্যাশনালিস্টিক পদ্ধতিতে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এটাই তার কৃতিত্ব।

অ্যানাক্সিমেন্ডার বেশ সাহসিকতার সাথে বলেছিলেন এ পৃথিবী শূন্যে ভাসছে। পানির উপরে ভাসা বা কোন খুটির উপরে ভর করে দাড়িয়ে নয় পৃথিবী। এটা সে সময়ের জন্য অনেক বৈপ্লবিক একটা ধারণা। অবশ্য তিনি মনে করতেন পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে।

অ্যানাক্সিমেন্ডার পৃথিবীর মানচিত্র এঁকেছিলেন যদিও সেটার অস্তিত্ব আর পাওয়া যায় না। ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস তার লেখাতে এমন কিছু মানচিত্রের কথা বলেছেন।  অ্যানাক্সিমেন্ডারের মানচিত্রটা ছিল হয়তো গোলাকার। চারপাশটা সমুদ্র ও নদী বেষ্টিত ছিল। মানচিত্রের মাঝখানে অবশ্য ছিল ভূমধ্যসাগর। এর উত্তর ভাগটা ছিল ইউরোপ এবং দক্ষিণটা এশিয়া।

বিবর্তনবাদের সবচেয়ে আদি বক্তাদের একজন অ্যানাক্সিমেন্ডার। ভাবতে অবাক লাগে ডারউইনের দু’হাজার বছর আগে তিনি এমন চিন্তা করতে পেরেছিলেন। তিনি মনে করতেন এই পৃথিবী এবং প্রাণীজগত তৎকালীন ধর্মগ্রন্থে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে সৃষ্টি হয়নি। বিবর্তনের মাধ্যমে এক একটি প্রাণী এসেছে। পানি থেকে সব প্রাণী এসেছে। এবং মানুষও মাছের কোন একটি প্রজাতি থেকে এসেছে। তবে সেটা ভিন্ন একটি প্রজাতি হবে সেটা নিশ্চিত। মানবশিশুর যে দীর্ঘ ও নাজুক শৈশবকাল তাতে তার টিকে থাকা সহজ কোন ব্যাপার নয়। এটা অনেক ভাবনার বিষয়। মানবশিশু সবচেয়ে নাজুক এবং অন্য অনেক প্রাণীর বাচ্চার চেয়ে বেশি সময় দুর্বল ও পরনির্ভরশীল অবস্থায় থাকে। এ কারণে অ্যানাক্সিমেন্ডার মনে করতেন মানুষের আদিরূপ এমনটা হতে পারে না। অন্য যেকোন প্রাণীর বাচ্চা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের খাবার নিজে সংগ্রহ করতে পারে, আত্মনির্ভরশীল হয়ে যেতে পারে। মানুষের আদিরূপ যদি বর্তমানের মতো হতো তাহলে সে হয়তো টিকে থাকতে পারতো না। মানুষ হয়তো মাছের কোন প্রজাতি থেকে এসেছে যা জন্মের পরপরই আত্মনির্ভরশীল হয়ে যেতে পারে। প্লুতার্কের লেখাতে অ্যানাক্সিমেন্ডারের কথাটা উঠে এসেছে এভাবে-

…that in the beginning man was born from creatures of a different kind because other creatures are soon self-supporting, but man alone needs prolonged nursing. For this reason he would not have survived if this had been his original form (Plutarch, 2).

দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছিলেন অ্যানাক্সিমেন্ডার। মাইলেতুস এর হয়ে কৃষ্ণ সাগরে অ্যাপোলোনিয়া নামের একটি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি হয়তো গ্রিসে ‘নমন’ (gnomon) নামে একটি সৌর ঘড়ি তৈরিতেও অবদান রেখেছিলেন। সে ঘড়ি স্পার্টাতেও স্থাপন করা হয়েছিল। তিনি বেশ ঝাকঝমকপূর্ণ আচার আচরণ ও পোশাক-পরিচ্ছদ পড়তেন বলে জানা যায়।

 

তথ্যসূত্র:

হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলসফি, বার্ট্রান্ড রাসেল

এ ক্রিটিকাল হিস্ট্রি অব গ্রিক ফিলসফি, ডব্লিউ. টি. স্টেইস

সোফিজ ওয়ার্ল্ড, ইয়োস্তেন গার্ডার

ইন্টারনেট এনসাইক্লোপেডিয়া অব ফিলসফি, ডির্ক এল. কুপ্রি

এনসিয়েন্ট হিস্ট্রি এনসাইক্লোপেডিয়া, জসুয়া জে মার্ক

উইকিপিডিয়া

Related Posts

About The Author

Add Comment