দর্শন ও দার্শনিকদের গল্প: থেলিস

দর্শনের জনক হিসেবে থেলিসকে ক্রেডিট দেওয়া হয়ে থাকে। আমরা এর সাথে কোন ধরণের দ্বিমত না করে থেলিস নিয়ে জানার চেষ্টা করি। তার সম্ভাব্য জন্মসাল ৬২৪ খ্রি.পূ. এবং মৃত্যুসাল ৫৫০ খ্রি.পূ.। ইতিহাসে থেলিসের অবস্থান বেশি স্পষ্ট না হলেও তাকে নিয়ে বেশ কয়েকটি লিজেন্ড প্রচলিত। যেমন একটা গল্প আছে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটতেন এজন্য মাঝে মাঝে গর্তে পরে যেতেন। দ্বিতীয় আরেকটি লিজেন্ড হচ্ছে ৫৮৫ খ্রি.পূ. এর সূর্যগ্রহণের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হওয়া। তিনি চাঁদ ও সূর্যের আকার মাপতে চেষ্টা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয় এবং তিনিই প্রথম বছরকে ৩৬৫ দিনে ভাগ করেন।

দার্শনিকগণ বৈষয়িক বিভিন্ন বিষয়ে খামখেয়ালি হয়ে থাকেন বলে যে ঐতিহাসিক গল্প প্রচলিত থেলিস ছিলেন তার যোগ্য পূর্বসূরী। কিন্তু দার্শনিকগণ যে ইচ্ছে করেই এমন জীবন গ্রহণ করেন এবং তারা যদি বৈষয়িক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতো তাহলে প্রচুর অর্থবিত্ত বা বৈষয়িক সফলতা অর্জন করতে পারতো। থেলিস নিজে একবার তার প্রমাণ দিয়েছেন। তার স্বেচ্ছা দরিদ্রতার জন্য তাকে অবজ্ঞা করা হতো, টিপ্পনী কাটা হতো ‘দেখো, তার দর্শন তো তার কোন কাজে আসছে না!’ (পৃষ্ঠা ৪৫, হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলসফি, বার্ট্রান্ড রাসেল)

থেলিস মানুষকে শিক্ষা দিতে চাইলেন। থেলিস যেহেতু জ্যোতির্বিদ ছিলেন সেহেতু আকাশ ও তারাদের ভালো গবেষণা করে বুঝতে পেরেছিলেন সেই শীতে জলপাইয়ের বাম্পার ফলন হবে। ব্যাপারটা থেলিস ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে নাই। টাকা পয়সা ধার করে আশেপাশের সকল জমি লিজ নিয়ে ফেলেন। অন্য চাষীরা তাকে খুব অল্প টাকাতেই জমি দিয়ে দেয়। থেলিসের জলপাই চাষে তাদের আস্থা ছিল না।  কিন্তু ফসল তোলার সময় আসলে দেখা যায় সেবার থেলিসের আকাঙ্খিত জলপাইয়ের বাম্পার ফলন হয়। পুরো জলপাইয়ের ব্যবসা ছিল তার হাতের মুঠোয়। ইচ্ছেমত দাম নির্ধারণ করে বেশ অর্থকড়ি কামান। কোন কোন গল্পে এও বলা হয় সেই ছোট্ট শহরের সকল অর্থ তার কাছে চলে এসেছিল। আজকের দিনের মজুতদারদের কথা চিন্তা করলে আমরা খানিকটা বুঝতে পারবো কিভাবে একজন বা অল্প কয়েকজন মজুতদার ইচ্ছা করলে একটি নির্দিষ্ট এলাকার সকল অর্থ নিজেদের কাছে জমা করে ফেলতে পারেন।

থেলিস জলপাই ব্যবসা করে প্রচুর টাকা পয়সা জমিয়ে ফেলেছিলেন প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হওয়ার জন্য নয়। তিনি পৃথিবীকে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন দার্শনিকগণ ইচ্ছে করলে প্রচুর অর্থকড়িরও মালিক হতে পারতেন, কিন্তু তাদের জীবনের লক্ষ্য যে অন্য কিছু, আরও বড়ও যে কিছু। পৃথিবীতে অর্থ-সম্পদের চেয়েও বড় জিনিস আছে; জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা এমন একটি জিনিস।

থেলিস বিয়ে করেননি। যুবক বয়সে তার মা বিয়ের জন্য চাপ দিলে বলতো সেটা অনেক তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আবার যখন মাঝ বয়সে চলে গেলেন তখন বলতেন অনেক দেরি হয়ে গেছে। হয়তো সংসার-ধর্ম থেকে বাঁচার জন্য এরকমটা করেছিলেন। বা একজন চিন্তকের ঝামেলামুক্ত জীবনের আকাঙ্খাতে এরকমটা করেছিলেন।

তিনি মিশরে গিয়েছিলেন বলে ধারণা। তিনি মিশর থেকে গ্রিসে জ্যামিতি নিয়ে আসেন বলে ভাবা হয়। থেলিস পিরামিডের ছায়া দিয়ে পিরামিডের উচ্চতা মাপতেও সক্ষম হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। মাপার প্রক্রিয়াটাও ছিল মজার! দুপুরে যে সময়টাতে কোন বস্তুর ছায়া তার সমান থাকে সে সময়টাতে পিরামিডের উচ্চতা মেপেছিলেন।

থেলিসের চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে তিনি প্রথম বলেছেন সব সৃষ্টি এসেছে পানি থেকে এবং পানিতেই মিশে যাবে। তার কথাটি এখনকার বিবর্তনবাদের মতো বিকশিত হতে পেরেছিল কি না সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু তিনি সব জীবেই পানির উপস্থিতি লক্ষ্য করে হয়তো বলেছিলেন সব জীবই পানি থেকে এসেছে।

মিশরে অবস্থানকালে হয়তো নীলনদের জাদু দেখেছিলেন। কিভাবে বন্যার পানি চলে যাওয়ার পর পলিতে ফসলের উৎসব তৈরি হয়। কিভাবে একটু বৃষ্টি নামলেই সেখানে ব্যাঙ ও বিভিন্ন পোকামাকড় জন্ম নেওয়া শুরু করে দেয়। আবার পানি কিভাবে বরফ বা বাষ্পে পরিণত হয়ে যায়। বষ্প বা বরফ ও আবার পানিতে পরিণত হয়ে যায়।

থেলিসের নিজস্ব কোন লেখাপত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অন্যের লেখাতেই তার উপস্থিতি পাওয়া যায়। তার পুরো দর্শনকে দুইটি প্রকল্পে ভাগ করেছেন ডব্লিউ বি. স্টেইস। তার মতে-থেলিসের দর্শনের দুটি ধাপ:

প্রথমত, সকল জিনিসই পানি থেকে এসেছে এবং আবার পানিতেই ফিরে যাবে।

দ্বিতীয়ত, পৃথিবীটা একটা গোলাকার চাকতির মতো যা পানির উপর ভাসছে।

আচ্ছা, শুধু এ দুটো কারণেই কি থেলিসকে দর্শনের জনক বলা হয়েছে? না, ‘সকল সৃষ্টির মূলে রয়েছে পানি’, শুধু এ কথাটির কারণেই তিনি দর্শনের জনক নন। পুরো বিশ্বসৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য মিথ বা ধর্মের উপর আস্থা না রেখে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন বলে তাকে দর্শনের জনকের সম্মান দেওয়া হয়েছে। অবশ্য থেলিসকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিন্তা করারও জনক বলা যায়। থেলিস একই সাথে দর্শন ও বিজ্ঞানের জনক। দর্শন ও বিজ্ঞানের মধ্যে ফারাক মূলত আধুনিক সৃষ্টি। আগে দর্শন ও বিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক অনেক গভীর ছিল। আসলে প্রথমদিকে এদের মধ্যে পার্থক্যের কথা ভাবাও হতো না। এজন্য প্রাচীনকালের দার্শনিকদেরকে দেখবো তারা একই সাথে বৈজ্ঞানিকও।

থেলিসের আরেকটি বিখ্যাত কথা হচ্ছে: ‘সব জিনিস ঈশ্বরে পরিপূর্ণ’। আচ্ছা তিনি এর মাধ্যমে কি বুঝাতে চেয়েছিলেন? হয়তো কালো মাটি থেকে শস্যের আগমন, ফুল ও ফসলের বিকাশ, বিভিন্ন জীব ও কীট-পতঙ্গের উৎপত্তি দেখে হয়তো তার ভাবনায় এসেছিল ‘সব জিনিস ঈশ্বরে পরিপূর্ণ’। তিনি ঈশ্বরে পরিপূর্ণ বলতে হোমারের দেবতাদের বা ঈশ্বরের কথা বলেননি এ কথা নিশ্চিত। একটু বৃষ্টির পর নীল নদের তীরে প্রাণের সমারোহ তাকে হয়তো ভাবিয়ে তুলেছিল। আজকের বিজ্ঞানে যে ঈশ্বর কণার কথা বলা হয় তার আদি-উৎস খুজতে গেলে যে আমাদেরকে থেলিসের কাছেই যেতে হবে।

প্রাচীন গ্রিসের ‘সাত সাধু বা জ্ঞানী লোকের তালিকা’র ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও বা বিভিন্ন ব্যক্তির তালিকাতে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হলেও সবগুলো তালিকাতে থেলিসের উপস্থিতি বলে দেয় তিনি সমকালে কেমন সম্মানের পাত্র ছিলেন। এমনকি প্লাতো ও এরিস্টটলের লেখাতেও থেলিসের নাম অনেক সম্মানের সাথে নেওয়া হয়েছে।

 

বই সহায়তা:

সোফিজ ওয়ার্ল্ড- ইয়োস্তেন গার্ডার

এ ক্রিটিকাল হিস্ট্রি অব গ্রিক ফিলসফি- ডব্লিউ টি. স্টেইস

হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলসফি-বার্ট্রান্ড রাসেল

দ্য স্টোরি অব ফিলসফি- উইল ডুরান্ট

Related Posts

About The Author

Add Comment