দর্শন কোথায় কোথায় বিকশিত হয়েছে

(দর্শনের দুনিয়ায় আস্তে আস্তে প্রবেশ করতে চাই। দর্শনের জগতে আমার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রেখে যাওয়ার জন্য এই লিখে যাওয়া। আমার মতো বা আমার চেয়ে বেশি দর্শনপ্রেমী যারা তারা এখানে সঙ্গী হতে পারেন। ফিলসফি শব্দের শাব্দিক অর্থ ‘জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা’। এই সূত্রে আমরা সহোদর বা সতীর্থ। যেকোন পরামর্শ বা সংশোধনী সাদরে গ্রহণ করা হবে। )

দর্শনের সর্বোচ্চ ও সুসংহত বিকাশ ঘটেছে প্রাচীন গ্রিস এবং আধুনিক ইউরোপে।  মিশর, চীন, আসিরিয়া, ব্যাবিলন, সিন্ধু সভ্যতায় মানবজাতির অনেক সমৃদ্ধির কথা পাওয়া যায়। তারা শিল্পকলা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব ও সাহিত্যে বেশ অবদান রেখেছে। কিন্তু দর্শনের ক্ষেত্রে তেমন সফলতার সাক্ষর নেই। এমনকি রোম সাম্রাজ্যও দর্শনে তেমন গতি পায়নি যদিও তারা গ্রিক সভ্যতার কাছ থেকে সভ্যতার মশালটি নিজেদের হাতে নিয়েছে। সাহিত্য, রাষ্ট্রনীতি ও আইনে অসাধারণ কিছু সাফল্যের কথা থাকলেও দর্শনের বেলায় খুবই দরিদ্র চিত্র মেলে। রোমানদের দর্শনের ইতিহাস বললে মার্কাস অরেলিয়াস, সেনেকা, এপিকটেটাস, লুক্রেতিয়াস এমন হাতেগুণা কয়েকজনের নাম আসে। তারা আবার নতুন কোন দর্শন দেননি বা তাদের দর্শনকে গ্রিকদের সাথে তুলনা করার মতো নয়। তাছাড়া তারা বড়জোর গ্রিক দর্শনের শিষ্যই ছিল নিজেরা ওস্তাদ হতে পারেনি।

এবার বলা যাক ভারতের কথা। ভারতে দর্শনের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল এবং সেগুলোকে গ্রিক দর্শনের সাথে তুলনা করা যায় এমন কথা আসে। আবার কেউ কেউ এটাও বলে ফেলেন গ্রিক দর্শনও নানাভাবে ভারতের কাছে ঋণী। যথেষ্ঠ প্রমাণ, যুক্তি না থাকলেও এ নিয়ে যথেষ্ঠ ধারণা, অনুমান হয়ে আসছে। আমরা প্রশ্নটা নিয়ে তদন্ত করে দেখতে পারি।

shankhyaবেদ-উপনিষদের ধর্ম-মিশ্রিত দর্শন কেন পূর্ণ দর্শন হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা এর পেছনে ডব্লিউ টি স্টেইস-এর তিনটি যুক্তি হচ্ছে:

প্রথমত, ভারতের দর্শন ধর্ম ও ব্যবহারিক প্রয়োজন থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারেনি। ফিলসফি শব্দের সাথে যেভাবে ‘জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা বা অনুরাগ’ মিশে আছে ভারতীয় চিন্তায় সেটা ছিল না। মুক্তি বা মোক্ষ লাভের আকাঙ্খাই এখানে প্রবল ছিল। এরিস্টটল মনে করতেন দর্শন ও বিজ্ঞানের মূলে রয়েছে ‘বিস্ময়’; স্রেফ জানা বা বুঝার আকাঙ্খা। কিন্তু ভারতের দর্শনের দিকে যদি খেয়াল করি সেখানে উদ্বেগের আধিক্য, অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্খা লক্ষণীয়। এসব আকাঙ্খাগুলো আবার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের দিকে ধাবিত হয় নি। এর থেকে বরং কোন ধর্মমতের আগমন ঘটতে পারে। ভারতীয় দর্শনে এমনটাই ঘটেছে। ধর্মের পুরোপুরি বিকাশ হলেও দর্শনটা হয়নি। আবার এটাও মনে রাখতে হবে এ ধারণটা একেবারেই ভুল যে ধর্ম ও দর্শন পুরোপুরি আলাদা, তাদের মধ্যে গভীর কোন সম্পর্ক নেই। তারা একই গোত্রের কিন্তু তারা স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং অনন্যতার দাবিদার।

দ্বিতীয়ত, ভারতীয় চিন্তা দর্শনের চেয়ে কেন ধর্মের ঘরেই পরে তার আরেকটি কারণ হচ্ছে: এটা বিজ্ঞানসম্মত হওয়ার চেয়ে বেশি কাব্যিক।মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে যে বর্ণনা আমরা দেখবো তা আর যাই হউক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নয় বরং অনেক মেটাফরিকাল, কাব্যময়। এগুলো আমাদের কল্পনার খোরাক যোগাবে কিন্তু র‌্যাশনাল মনকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না।

buddha

তৃতীয়ত, ভারতের চিন্তাকে দর্শনের ইতিহাস থেকে জুদা করার আরেকটি কারণ হচ্ছে এটা পুরোপুরি ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে বিকশিত হয়েছে যা ওই সীমাটা অতিক্রম করে যেতে পারে নাই।  ফলশ্রুতিতে ভারতীয় চিন্তায় যত সার থাকুক-ই না কেন তা দর্শনের জগতকে ততটা প্রভাবিত করতে পারে নি।

rushd

এবার আসুন মুসলমানদের দর্শন নিয়ে বলা যাক। গ্রিক-রোমান সভ্যতার পতনের পর ইউরোপের জন্য মধ্যযুগ ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ। খ্রিস্ট ধর্ম আর বাইবেলের চাপে পড়ে হাজার বছর ধরে বদ্ধাবস্থায় হাশফাশ করছিলো ইউরোপ। তখনটাতে সভ্যতার মশাল ছিল মুসলমানদের হাতে। মুসলমানরা ইসলাম প্রচার, এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামরিক শক্তি ও বিজ্ঞানে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বিশ্ব চষে বেড়িয়েছে সে সময়টাতে। দর্শনের ক্ষেত্রে অরিজিনাল কিছু দিয়েছে সেটা বলা যায় না। গ্রিক দর্শনকে লালন-পালন-পরিচর্যা করে বিকশিত করেছে এবং ইউরোপের কাছে হস্তান্তর করে দিয়েছে। এটা অবশ্য কম গুরুত্বপূর্ণ অবদান নয়।

 

তথ্যসূত্র: এ ক্রিটিকাল হিস্ট্রি অব গ্রিক ফিলসফি- ডব্লিউ টি. স্টেইস

Related Posts

About The Author

Add Comment