দাস ক্যাপিটাল ও বাংলাদেশ: লেকচার নোট

শুক্রবার বিকাল তিনটায় বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (কুমিল্লা চ্যাপ্টার) এর অষ্টম পাবলিক লেকচার  অত্যন্ত সফলতার সাথে আয়োজন হয়ে গেল। লেকচার আয়োজিত হয় বাংলাদেশের একটি অনন্য সুন্দর ক্যাম্পাস  কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এর কাঁঠাল তলাতে। আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (কুমিল্লা চ্যাপ্টার) এর সমন্বয়ক মাহামুদুল হাসান। লেকচারের মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে এখানে আলোচনা করার চেষ্টা করছি।

পৃথিবীতে ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর পরে দুটি বই সবচেয়ে পঠিত হয়েছে। প্রথম হচ্ছে ডারউইন এর অরিজিন অফ স্পিসিস এবং দ্বিতীয়টি কার্ল মার্কস এর দাস ক্যপিটাল। প্রথমটি প্রকৃতির বিবর্তন নিয়ে এবং দ্বিতীয়টি সামাজিক অর্থনৈতিক বিবর্তন নিয়ে লেখা। তিনি অর্থনৈতিক অসম বণ্টনের মাধ্যমে কিভাবে শোষক এবং শোষিত শ্রেণী সৃষ্টি হয় তা ব্যখ্যা করেন। তিনি বলেন, শোষিত শ্রেণীকে পিষিয়ে মারার জন্য শাসক শ্রেণী পুজি নামক মরনাস্ত্র ব্যবহার করে ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়াতন্ত্র গড়ে তুলেছে। এই ব্যবস্থার ফলে পৃথিবীজোড়ে হাহাকার তৈরি হয়েছে। দাস ক্যপিটাল ব্যক্তিক অর্থনীতির চেয়ে সামস্টিক অর্থনীতির উপর জোর দেয় বেশি।

তিনি দাস ক্যপিটালকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। বাংলাদেশের শ্রমজীবী, কৃষক এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের কথা বলেন যারা প্রকৃত অর্থে ন্যায্য মুজুরি থেকে চিরকাল বঞ্চিত। উদাহরন দিয়ে বলেন, শ্রমজীবীরা সবসময় সাধারণ সেনাদের মত হয়ে থাকেন যেখানে তার শুধু শ্রমটায় মুখ্য তার জীবন নয় কেননা সে চলে গেলেও আরেকজন তার জায়গা নিয়ে নেয়। এর জন্য মানুষের জীবন যাত্রার মান নিম্ন হয়ে থাকে। যে দেশে অর্ধেক সম্পদ মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে থাকে শেখানে জীবনযাত্রার মান কিভাবে উন্নত হবে আপনারাই বলেন। মার্কস এর দাস ক্যপিটাল দুশ্রেনির মানুষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। শোষণহীন সমাজব্যবস্থা গড়ার জন্য যেমন এর বিকল্প নেই ঠিক তেমনি পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্যও এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায়না কেননা এই বইতে লিপিবদ্ধ আছে কিভাবে পুজিবাদ গড়ে ওঠে এবং কিভাবে তা ভেঙ্গে পড়ে। আর তাই ২০০৭ সালে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে যেমন জাপান, জার্মানি প্রভৃতি দেশে এই বইয়ের কদর হঠাৎ করে বেড়ে যায়। অনেকে প্রশ্ন করেন, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার ফলেইতো বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেটদের মত ধনবানদের আমরা গণনা করতে পারি তার উত্তরে তিনি বলেন, এই দুইতিন জনের সম্পদ যদি হাজার হাজার মানুষের মাঝে বণ্টন করা হত তাহলে দুএকজনের জায়গায় কয়েকহাজার মানুষ সুখী হতো।

আলোচনায় তাসলিমা আলোচককে প্রশ্ন করেন, সমাজতন্ত্রে তো ব্যক্তি মালিকানা থাকেনা, সামস্টিক মালিকানায় এখানে মুখ্য। যেখানে বাবা মার রেখে যাওয়া সম্পত্তি সন্তান পাবেনা সেখানে তাদের ভবিষ্যৎ কি হবে? উত্তরে আলোচক বলেন, সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রই ব্যক্তিকে ভরণপোষণ করে থাকে, তার কি দরকার তা দেখে এতে তাদের চিন্তা করার কোন কারণ নেই। কোন কাজ না করে অনেক সম্পত্তির মালিক হওয়াটাই চিন্তার, কেননা যে কষ্ট না করে সবকিছু পেয়ে যায় সে মানুষের কষ্টের মূল্য বুঝেনা। সোহেল তার যুক্তিগুলো উপস্থাপনের মাধ্যমে আলোচনাকে আরো গভীরতা দান করেন। শফিউল্লা তার বন্ধু এবং অন্যরা প্রশ্ন এবং গঠনমুলক যুক্তির মাধ্যমে আলোচনাকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলেন।

আমি শুধু মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শ্রবণ করেছি এবং ঋদ্ধ হয়েছি। অবশেষে একটি কথায় বলেছি পুঁজিপতিরা তাদের পুজির মাধ্যমে গাছের মগডালে উঠে বসে আছেন আর যারা প্রলেতারিয়েত তারা বলছেন আপনারা একটু নিচে নেমে আসুন, আপনারা নিচে নেমে আসলে আমরাও একটু শান্তি পাই। দুবেলা পেটপুরে খেতে পারতাম। অবশেষে একটি কথা বলে শেষ করবো মার্কস তার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সীমাহীন অর্থ কষ্টে ভুগেছেন। ১৮৫২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তার বন্ধু এঙ্গেলসকে তিনি একটি পত্র লেখেন যাতে লেখা ছিলঃ বন্ধু আমার স্ত্রী অসুস্থ, কন্যা জেনিখেনও অসুস্থ। ডাক্তার ডাকতে পারিনি, ওষুধের টাকা না থাকায় তা সম্ভবও নয়। ৮-১০ দিন ধরে আমাদের পরিবার পাউরুটি আর আলু খেয়ে আছে, আজ সেটুকুও যোগাড় করতে পারবো কিনা সন্দেহ আছে। এই অভাবের মধ্যে থেকেও তিনি সমাজের কথা ভেবেছেন। নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থকে বলি দিয়ে সমস্ত দুঃখী মানুষের কথা ভেবেছেন। তিনি যদি তার ক্ষুদ্র সার্থকে বলি না দিতেন হয়তো আজ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতনা। সমাজতন্ত্রকে শুধু মনের মধ্যে ধারণ করলেই হবেনা এর আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে হবে সবার মাঝে আর এতেই প্রতিষ্ঠা পাবে শোষণহীন শ্রেণিহীন সমাজ।

 

নীরুপম নীরু

সমন্বয়ক, বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (কুমিল্লা চ্যাপ্টার)

Related Posts

About The Author

One Response

Add Comment