দ্য আলকেমিস্ট: সাফল্যের আসল রহস্য/ স্বপ্ন কি আসলেই স্বপ্ন?

আশা নিরাশার জীবনযাপনে আমরা প্রতিনিয়তই নিজেদেরকে দুর্বল আর অসহায় ভেবে অদ্ভুত কোনো এক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই। স্বপ্ন কিছুটা দেখি তবে হতাশা নামের ভাইরাসের বিন্দুমাত্র উপস্থিতিতেই তা আবার হারিয়েও ফেলি দ্রুত। স্বপ্নের পথে হাঁটতেই আমাদের যত আপত্তি। স্বপ্ন পূরণের একাগ্রতা কিংবা ধৈর্য্য না থাকলে তা যে আজীবন অপূরণীয় থেকে যাবে সেটা স্বাভাবিকভাবেই অনুমেয়। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশেরই মনোভাব আজকাল এমন যে, কোনো কিছু চাইলেই যদি না পাওয়া যায় তবে তার পিছে শুধু শুধু সময় নষ্ট করা বৃথা। কেউ কেউ তো সারাক্ষণ আলাদিনের প্রদীপের সাধনায় মত্ত থাকে। ভাবটা এমন যেন, এই পেলো বলে আর অমনি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়া। কষ্ট, শ্রম তথাপি অধ্যবসায় যে কত বড় ক্ষমতা তা অনেকের কাছেই অজানা। আবার জানলেও বিষয়গুলো অপ্রিয়। কিছু মানুষ আছে স্বপ্নের পথে পাড়ি দেন ঠিকই কিন্তু মাঝপথে কীভাবে যেন সবাইকে অবাক করে দিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন ফলাফল: সফলতাকে ছুতে পারেন না। এমনও আছে যারা সফলতার একদম দ্বারপ্রান্তে গিয়েও ফিরে আসেন হতাশ হয়ে। আবার এমনও আছেন যারা লক্ষ্যের দিকে যাত্রা শুরু করে আসল লক্ষ্যকে ভুলে যান। অন্যকোনো মোহ কিংবা লক্ষ্য তাকে আসল গন্তব্য থেকে সড়িয়ে দেয়। এর কারণ কি? এগুলোও মূলত দীর্ঘমেয়াদি হতাশা কিংবা সফলতা খড়ায় ভোগার ফসল কিংবা দুর্বল প্রত্যয়। কেউ যখন তার স্বপ্নের পথে চলতে ভয় পায় কিংবা অর্ধেক পথে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায় তারা মূলত কোনোদিনই স্বপ্নই দেখেনি সফল হওয়ার। এই মানুষগুলো সব সময় অন্যকে সফল হতে দেখে লোভ করেছে, কিংবা ঈর্ষাণ্বিত হয়েছে। দুনিয়ার সকল ব্যর্থ এবং দর্শক টাইপের লোকগুলোই এসব অর্ধস্বপ্নচারী।

এই গল্পটি যেহেতু বইয়ের তাই বইয়ের প্রসঙ্গে আসি।

বলা হয় কয়েক শতাব্দী পরে পরে এমন একটি বই লেখা হয় যা পাঠকের মনস্তত্ত্বকে তথা পুরো জীবনে বদলে দেয়। ‘দ্য আলকেমিস্ট’ বইকে এমন একটি বই বললে বাড়িয়ে বলা হবে না এক চুলও। অলৌকিক যাদু, স্বপ্ন এবং আমরা যে গুপ্তধন সর্বত্র খুঁজে বেড়াই সেইসব বিষয়ের এক অনন্য উদাহরণ ‘দ্য আলকেমিস্ট’। বইটির লেখক বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় জীবন্ত কিংবদন্তী ব্রাজিলিয়ান অধিবাসী  পাওলো কোয়েলহো (Paulo Coelho)।

বইটিতে আন্দালুসিয়ান বালক সান্তিয়াগো একজন ভ্রমণপিপাসু এবং স্বপ্নসন্ধানী চরিত্রের নাম। ছোটকাল থেকেই তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য থাকে ঘুরে বেড়ানো। বাবা-মা চেয়েছিল তাদের কৃষক পরিবারের গৌরব হিসেবে ছেলে হবে একজন ধর্মযাজক। এ কারণে তাকে ল্যাটিন, স্প্যানিশ ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়তে হয়েছে। কিন্তু সান্তিয়াগো সেই শিশুকাল থেকেই ঈশ্বর এবং মানুষের পাপ-পূণ্যের সম্পর্কে জানার থেকে পৃথিবী সম্পর্কে জানাটাকেই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে করতো। খাদ্য এবং পানীয় সংগ্রহ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে জীবনযাপন করা তার কাছে পশুর জীবনযাপনের মতোই মনে হয়। সাহস করে একদিন বাবাকে জানালো- that he didn’t want to become a priest. That he wanted to travel. (অর্থাৎ ধর্মযাজক না সে ট্রাভেলার হতে চায়)। উত্তরে তার বাবা বলে, সমস্ত পৃথিবীর মানুষ আমাদের এই বাসভূমিতে ঘুরতে আসে। কিন্তু সান্তিয়াগো তার বাবাকে তার তীব্র আকাঙ্খার হাতিয়ার দিয়ে এক পর্যায়ে রাজি করায়। তখন সান্তিয়াগোর বাবা তাকে তার প্রত্যাশিত ইচ্ছার পথের বাঁধাগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি এ পথে তার পূর্বপুরুষগণ যারাই পা বাড়িয়েছেন তাদেরকে মেষপালক হতে হয়েছে। উদ্যমী সান্তিয়াগো তার লক্ষ্যের প্রতি অটুট থাকে, প্রয়োজনে সে মেষপালকই হবে। বাবা ছেলের ইচ্ছার কাছে হার মানতে বাধ্য হন। ব্যস তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় সান্তিয়াগোর স্বপ্নের পথে চলা।

সান্তিয়াগোর এই পৃথিবীভ্রমণের যাত্রার সঙ্গী হয় একপাল মেষ/ভেড়া। অল্প অল্প করে তাদের নিয়ন্ত্রন করা শিখে ফেলে সে, বাড়তে থাকে জীবন সম্পর্কে ধারণা। ঘুরতে থাকে আন্দালুসিয়ানের প্রত্যেকটা অলিতে গলিতে। এভাবে কেটে যায় বছর দুয়েক।  একদিন রাতে মেষগুলো নিয়ে এক পরিত্যক্ত উপসনালয়ে অবস্থান নেয় সান্তিয়াগো। সেখানে ভোররাতে এক অদ্ভুত স্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায় তার। স্বপ্নে কিছু অলৌকিক আলোকবিন্দু দেখতে পায়। কে যেন তাকে দেখিয়ে দেয় দূর মিশরের পিরামিডের কাছে তার জন্য রাখা আছে অত্যন্ত আকাঙ্খিত গুপ্তধন। এই স্বপ্ন তাকে ভাবনাবিধূর করে তোলে; এ স্বপ্ন সে আগেও কয়েকবার দেখেছে। এবার সে তারিফায় এক মহিলার কাছে যায় স্বপ্নের ব্যাখা জানতে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে গন্তব্যের দিকে। এই এগিয়ে যাওয়ার পথে সান্তিয়াগোর সাথে অত্যন্ত রহস্যপূর্ণ কিছু ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন বিচিত্র চরিত্রের মানুষের সান্নিধ্য লাভ করে এবং তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন শিক্ষা গ্রহণ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষাটি সে পায় সেটি হলো- কোনো লক্ষণ দেখেই ভালো কিংবা মন্দ কাজের পূর্বাভাস অনুমান করতে পারা।

মরুভূমির পথে রওয়ানা দেওয়ার পূর্বে এক বৃদ্ধ রাজার সাথে সান্তিয়াগোর দেখা হয়েছিল, যিনি সান্তিয়াগোকে উরিম, থুরিম নামের দুটি মূল্যবান পাথর দিয়েছিল এবং পিরামিডের পথে যে লক্ষ্য নিয়ে সে যাত্রা করেছে তাতে সফলভাবে পৌছানোর কৌশলও বাতলে দিয়েছিল। এক একটি শিক্ষা অন্য ক্ষেত্রেও অসাধারণ প্রভাব ফেলে, রাজা বলেছিল- “সবই আসলে এক”। এজন্য যেকোনো একটি শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে কঠোর প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলেই কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব।

সান্তিয়াগো যেই গন্তব্যের দিকে রওয়ানা দিয়েছে সেই পথের দূরত্ব কতটুকু তা জানা নেই আদৌ। এরফলে বিভিন্ন দুঃচিন্তা বাসা বাঁধে মনে। বাস্তবতা ফিরিয়ে দিতে চায় বারবার কিন্তু মনের গভীরে তীক্ষ্ন প্রত্যয়, পুরো পৃথিবীকে জয় করার সাহস আছে যার, যে তার স্বপ্নকে পূরণ করে তবেই ছাড়বে অথবা যার লক্ষ্য তাকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায় সেই লোককে স্বপ্ন কীভাবে পিছু হটাতে পারে। এসব তার কাছেই তেমন কোনো বাঁধাই মনে হয় না। মানুষ যখন তার লক্ষ্যকে চিনতে পারে এবং লক্ষ্যকে চিহ্নিত করতে শেখে তখন কাঙ্খিত সফলতা তার হাতের মুঠোতে চলে আসে।

তরুণ সান্তিয়াগো যে গন্তব্যে যেতে চায় তার জন্য পাড়ি দিতে হয় বিস্তির্ণ এবং অচেনা মরুভূমির পথ। এই পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পথিমধ্যে মরুবাসী দুই গোত্রের সংঘাতের সম্মূখ্যীন হতে হয় তাকে। এজন্য আশ্রয় নিতে হয় একটি গোত্রের বসতিতে। সেখানে থাকতে গিয়ে ফাতিমা নামের এক বালিকার প্রেমে পড়ে যায় সান্তিয়াগো। মনে মনে ভাবে গুপ্তধন পাওয়ার উদ্দেশে সামনে যাওয়া ঠিক হবে না বরং এই প্রেমকে আশ্রয় করেই সে ফিরে যাবে। ঘটনাক্রমে সান্তিয়াগো মরুবাসী গোত্রকে একটি সহযোগিতা করার মাধ্যমে সবার মন জয় করে মূল্যবান কিছু উপহার পায় এবং তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে জলাঞ্জলি দিতে বসে। তখন একজন আলকেমিস্ট তাকে মোহের দুয়ার থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে, মনে করিয়ে দেয় আসল লক্ষ্যের কথা এমনকি সে যে মেয়েটির প্রেমে পড়েছিল(ফাতিমা) সেই মেয়েটিও তাকে তাঁর লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায়। তবে আলকেমিস্ট সান্তিয়াগোকে নতুনভাবে তৈরি করে তোলে। বিপদে কীভাবে নিজেকে সুরক্ষা দিতে হয়, নিজের লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিয়ে, কীভাবে তা অর্জন করতে হয় এসব কিছু। সে যাইহোক বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে সান্তিয়াগো শেষ পর্যন্ত তার গন্তব্যে (মিশরের পিরামিড) পৌছাতে সক্ষম হয়। সেখানে গিয়ে সে একদল দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয় এবং তাদের মুখে শুনতে পায় যে তারাও সান্তিয়াগোর মতো গুপ্তধনের স্বপ্ন দেখতো এবং তাদের স্বপ্নের জায়গাটি সান্তিয়াগো যেই পরিত্যক্ত উপাসনালয়ে তার মেষ নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল সেখানের সুবৃহৎ একটি গাছের গোড়ায়। সান্তিয়াগো সন্ধান পায় তার গুপ্তধনের, বুঝতে পারে, যে গুপ্তধনের খোঁজে সে এতদূর পাড়ি দিয়েছে তা ছিল তার একদমই সন্নিকটে। ফিরে আসে সেই উপাসনালয়ে, সংগ্রহ করে গুপ্তধন এবং সফল হয় তার স্বপ্নের পথচলা।

কালজয়ী এই বইয়ে পাওলো কোয়েলহো বেশ কিছু বিষয়ে সুন্দর সুন্দর কিছু কনসেপ্ট দিয়েছেন যা যেকোনো ব্যক্তির সার্বিক জীবনযাপনের জন্য দিকনির্দেশনামূলক হতে পারে। যেমন লক্ষ্য সম্পর্কে পাওলো কোয়েলহো বলেন, “When a person really desires something, all the universe conspires in helping you to achieve it.” (The Alchemist, p-23) অর্থাৎ, যখন কোনো ব্যক্তি সত্যিই কোনো কিছুর পাওয়ার জন্য প্রত্যাশা করে তখন পৃথিবী ঐ ব্যক্তি সেই জিনিসটি পাইয়ে দেওয়ার জন্য উন্মূখ হয়ে ওঠে। এর দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন আমরা যা চাই তা সর্বদাই আমাদের ধ্যান-জ্ঞানের মধ্যে রাখতে হবে। কেননা অনেকেই এমন আছেন যিনি নিজের কাজ ফেলে রেখে অন্যের কাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে ফলে দু-দিকই অজেয় থেকে যায়। আবার ভালোবাসা সম্পর্কে পাওলো কোয়েলহো বলেন,  “You must understand that love never keeps a man from pursuing his destiny. If he abandons that pursuit, it’s because it wasn’t true love… the love that speaks the Language of the World.” অর্থাৎ, তোমাকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে, ভালোবাসা কখনোই তোমার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে দেয় না। যদি এটা তোমার লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিবন্ধক হয় তবে এর কারণ একটাই এটা সত্যিকারের ভালোবাসা নয়।…. ভালোবাসা হলো বিশ্বব্যাপী একটি উদার ভাষা।

সর্বোপরি, বইটি নিয়ে এই কথাগুলো যখন লিখছি তখন পর্যন্ত এটি আমার সাতবার পড়া হলো। বইটি পুরানো হয়ে গেছে, বইয়ের কতগুলো পৃষ্ঠায় কতগুলো দাগ দিয়েছি তার হিসেব নেই। এর প্রায় সবগুলো কথাই আমার ভালো লেগেছে। বইটিতে পাওলো কোয়েলহো যে মন্ত্র দিয়েছেন তা যেকোনো বয়েসী পাঠকের কাছে ভালো না লেগে উপায় নেই। বইটি একটি দারুন অনুপ্রেরণার মঞ্চ, যাদের কোনো স্বপ্ন আছে, যারা কোনো বিষয়কে নিজের লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করেছে এবং সত্যিই সেই লক্ষ্যে যারা পৌছাতে চায় তারা ‘দ্য আলকেমিস্ট’ না পড়ে যাবেন কোথায়?

Alamin Howlader
৮, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাবি।
০৯-০৩-২০১৭

Related Posts

About The Author

Add Comment