দ্য লিটল প্রিন্স এর সাথে পরিচয়

লেকচার নোট

ক্লাসিক বুক সিরিজ: দ্য লিটল প্রিন্স

আতোঁ দে সেইন্ট একঝুপেরি

বক্তা: সাবিদিন ইব্রাহিম

বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের ৯৯ তম পাবলিক লেকচার

স্থান: ডাকসু দ্বিতীয় তলা

গত শতকটি ছিল মানুষের জন্য আকাশে পাখা মেলার শতক। বিশ শতকের একেবারে প্রথমেই মানুষ প্রথমবারের মত মিলিয়ন বছরের আকাশে উড়ার স্বপ্ন সফল করে। বিমান আবিষ্কার মানবজাতির ইতিহাসে এই অনন্য ঘটনাটির জন্ম দেয়। যদিও দুটো বিশ্বযুদ্ধ এবং প্রতিনিয়ত চলতে থাকা বিভিন্ন যুদ্ধে বিভিন্ন মানুষ হত্যায়, দুটি ভয়াবহ পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে এই ‘মহাপতঙ্গ’ কিন্তু তার সাথে মানবজাতির মিলিয়ন বছরের আকাশে উড়ার স্বপ্ন বা স্মৃতি জড়িত রয়েছে। বিমানের মাধ্যমে আকাশে উড়ার প্রযুক্তি আসার সাথে সাথে তথ্য-প্রযুক্তি সেক্টর একটি বড় উল্লম্ফন দিয়েছে। খুব দ্রুতই এটা উন্নততর ও বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টা দেখা গেছে। এই বিমান চালু হওয়ার প্রথমদিকে যারা বিমান চালাতেন তারা ছিলেন সমকালের সুপারস্টার। প্রথমদিকে বেশি বিমান দুর্ঘটনা হওয়ার কারণে বিমান চালনার পেশাতে যারা আসতেন তাদেরকে দু:সাহসী হিসেবেই দেখা হতো। এখনকার সময়ে মহাকাশে যারা কয়েকমাস বা বছরব্যাপী থাকেন তারা যেমন বড় তারকা হিসেবে স্বীকৃত হন তখন বিমানের পাইলটদের ব্যাপারটি এমন ছিল।

আতোঁ দে সেইন্ট একঝুপেরি হচ্ছেন প্রথমদিককার এমন একজন পাইলট। আর বিমান চালনা এবং আকাশযান বিষয়ক গল্প সমকালে বেশ জনপ্রিয় ছিল এখন যেমনটা সাইন্স ফিকশন এবং নভোজান বিষয়ক গল্প, সিনেমা জনপ্রিয়। দ্য লিটল প্রিন্স স্রেফ বিমান সম্পর্কিত গল্প হওয়ার কারণেই এত জনপ্রিয় নয়। এর সাথে রয়েছে দর্শন, কাব্য, রহস্য ও অভিযানের মসলা।

দ্য লিটল প্রিন্স যার বাংলা হতে পারে ‘ছোট্ট প্রিন্স’ ‘ছোট্ট যুবরাজ ’, ‘ক্ষুদে যুবরাজ  ’ এমন। এটাকে মূল ফরাসী ভাষায় ‘লে পেতি প্রিন্স’ Le Petit Prince বলা হয়। ১৯৪৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনূদিত বইয়ের তালিকায় এর অবস্থান চতুর্থ। প্রায় ২৫০ টি ভাষা ও উপভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। এমনকি এর ব্রেইলি রূপও রয়েছে (দৃষ্টি প্রতিবন্ধিদের জন্য)। বিশ শতকে ফ্রান্সের সেরা বই হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে এ বইটি। এখন পর্যন্ত ১৪০ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে এবং প্রতিবছর আরও দুই মিলিয়ন কপি করে বিক্রি হচ্ছে। মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইয়ের একটি হিসেবে একে বেশ সমীহ করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আমেরিকাতে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে শিল্প-সাহিত্যের প্রায় সবকটি মাধ্যমেই রূপান্তরিত হয়। যেমন অডিও রেকর্ডিং, রেডিও নাটক, ফিল্ম, টেলিভিশন, ব্যালে ও অপেরা। এই ২০১৬ সালেও কুংফু পান্ডার পরিচালকের হাত ধরে এনিমেশন মুভি মুক্তি পেয়েছে। ২০১৬ তে আবার ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ তার ভক্তদের কাছে সাড়া জাগিয়েছে।

এই নভেলাটি ফরাসী ভাষায় সবচেয়ে বেশি পঠিত ও বেশি অনূদিত বই হিসেবে স্বীকৃত।  বিশ শতকে ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ বইটি একই সাথে নৈতিক অ্যালিগরি আবার আধ্যাত্মিক আত্মজীবনী। মোহনীয় বর্ণনায় আমরা দেখি কিভাবে একটি ছোট্ট ছেলে দূরের কোন গ্রহ থেকে পৃথিবীতে পতিত হয়। হিন্দি ‘পিকে’ মুভিটিতো দেখেছেন, তাই না? সেরকম আর কি। দূর কোন গ্রহ থেকে একজন এই পৃথিবীতে চলে এসেছে যে এই পৃথিবীর চালচলন কিছু বুঝে না। একজন বয়স্ক বৈমানিক তাকে বিভিন্ন রূপকে এই মানবসমাজের সাথে সেই ছোট্ট ছেলেটিকে পরিচিত করিয়ে দেয়। সেই ছোট্ট শিশুটি আমাদের ‘লিটল প্রিন্স’ যেন বড়দের দুনিয়া ও অভিজ্ঞতার জগতে অডেসিয়ান জার্নিটি দেন।

আতোঁ দে সেইন্ট একঝুপেরি ফ্রান্সের লিওন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটকাল থেকেই অভিযানের নেশায় পেয়ে বসেছিল তার। নৌবাহিনীতে প্রবেশ পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর বিমানসংস্থায় যোগ দেন। ১৯২১ সালে ফরাসী সেনাবাহিনীর বিমান বিভাগে যোগ দিয়ে বিমান চালনার অভিজ্ঞতা নেন। পাঁচ বছর পর সেনাবাহিনী ছেড়ে একটি বাণিজ্যিক সংস্থায় কাজ শুরু করেন যার কাজ ছিল সাহারা মরুভূমির আশেপাশে বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় মালামাল সরবরাহ করা।

সেইন্ট একঝুপেরি নিশ্চয়ই এমন কাজই চাচ্ছিলেন যার প্রতি মুহূর্তে বিপদ, ঝুঁকি, মৃত্যুর হাতছানি। কারণ অভিযানপিয়াসী মন তো এমন মৃত্যুভয়ের সাথেই পাঞ্জা লড়তে চান! তখন বিমানচালনা ছিল অনেক ঝুঁকির কাজ, এখনকার মতো নিরাপদ ককপিট, সবল ও একাধিক এঞ্জিনের বিমান ছিলনা। বিমানচালকের মাথার উপরের অংশ ছিল খোলা, তার উপর সাহারা মরুভূমিতে নিয়মিত মরুঝড় উঠে। ভয়ানক সেই ঝড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ের সাথে আছে কোন উপজাতি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। নিশ্চয়ই এরকম বহুমুখী মৃত্যুভয়কে খুব ভালোবেসেছিলেন একঝুপেরি! সাহারার আকাশে বিমানচালনার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই তাকে বিমান চালনার প্রতি ভালোবাসাকে নিয়ে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে একঝুপেরি ফরাসি বিমান বাহিনীতে আবার যোগ দেন। ১৯৪০ সালে হিটলারের নাৎসী বাহিনী ফ্রান্স দখল করে ফেললে একঝুপেরি যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রে একজন ফাইটার পাইলট হিসেবে যোগ দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু বয়সের কারণে সুযোগ পাননি। নিজেকে শান্তনা দেয়ার জন্য সাহারা মরুভূমিতে তার বিমান দুর্ঘটনার ঘটনাটি নিয়ে একটি বই লেখা শুরু করেন। বইয়ের মধ্যে আঁকা ছবিগুলোও তিনি করেন। নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে হতাশাজনক অবস্থাতেই তিনি তার শ্রেষ্ঠ লেখাটি লিখতে শুরু করেন যেটা তার দেশেরও সেরা বই হিসেবে স্বীকৃত হবে। ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত রহস্যময় ও মোহনীয় ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ নামের এই ছোট বইটি দশকের পর দশক ধরে শিশু-বুড়ো সব পাঠককেই আকৃষ্ট করে আসছে।

গল্পে দেখা যায় একজন পাইলট সাহারা মরুভূমিতে পতিত হয় যেখানে একজন ক্ষুদে যুবরাজের সাথে দেখা হয় যে মহাবিশ্বের দূর কোন দেশ থেকে এসেছে। সেই ছোট প্রিন্সের উদ্দেশ্য ছিল জীবনের অর্থ উপলব্ধি অর্জন করা।  বইয়ে দেখা যায় সেই ছোট প্রিন্স জীবনের সত্যিকারের অর্থ খুঁজে পায়। জীবনে বন্ধুত্ব, সম্পর্ক ও ভালোবাসার মূল্য অনুধাবণ করতে পারে। গল্পের শেষে আমরা দেখতে পারবো পাইলট তার বিমানটি ঠিক করতে পারেন এবং নিজ দেশে ফেরত আসেন। আর ক্ষুদে যুবরাজও চলে যায় অচেনা কোন গ্রহলোকে। শেষটা বেশ রহস্যজনক। ক্ষুদে যুবরাজ কি মরা গেলো নাকি ফিরে যেতে পেরেছিল তার ছোট্ট গ্রহে, তার ভালোবাসার গোলাপের কাছে? সাহিত্য সমালোচক থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠক সবাই একেকভাবে শেষটা ব্যাখ্যা করার সুযোগ পায়। এখনো দ্য লিটল প্রিন্স ভক্তদের কাছে ধাঁধাঁ তার কি হলো? একেক পাঠক একেক ব্যাখ্যা দাড় করাতে পারে। সেরা সাহিত্যকর্মের এটাই বৈশিষ্ট্য যে পাঠক তার অংশ হয়ে যেতে পারে, লেখককে দূরে রাখতে পারে। ‘লেখক মৃত’ এই ফর্মূলাকে জোরদার উপস্থিতি দেয়।

বইটি লেখা হয়েছে লেখকের স্মৃতিচারণার ভঙ্গিতে। ক্ষুদে যুবরাজের সাথে সাক্ষাতের ছয় বছর পর স্মরণ করেছেন সেসব কথা, স্মৃতি, সেসব অভিজ্ঞতা।

বইটি শেষ করার পরপরই সেইন্ট একঝুপেরির মনের আশা পূরণ হয়। দেশের হয়ে উত্তর আফ্রিকায় দেশের হয়ে যুদ্ধবিমান চালানোর সুযোগ পান। ১৯৪৪ সালের ৩১ জুলাই সেইন্ট একঝুপেরি একটি মিশনে যাত্রা করেন। দুঃখের বিষয় হলো এরপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

লেখকের সেরা সৃষ্টির নায়কের মতো তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে সেটা নিয়ে আজও রহস্য। বিমান দুর্ঘটনায় তিনি কি মারা গিয়েছিলেন নাকি তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন তা নিয়ে আজও প্রশ্ন উঠে। লেখক ও লেখকের সৃষ্টি যেন এক সূত্রে মহাকালের সোনালী পাতায় গাঁথা হয়ে গেলো।

Related Posts

About The Author

Add Comment