ধর্ম, সমাজ, পুঁজি, ঈশ্বর

এ টি এম গোলাম কিবরিয়া 

এককালে দামেস্ক, বাগদাদ, ইস্তাম্বুল, কর্ডোবাতে সভ্যতার মশাল জ্বলেছিল। প্রফেটের শুরু করা রেভলিউশনটা মার্ক্সিস্ট অর্থে বিপ্লব ছিলোনা, কারণ উৎপাদন সম্পর্কের কোন পরিবর্তন তাতে হয়নি কিন্তু একটা নতুন সাম্রাজ্য তাতে কায়েম হয়েছিলো এবং তার অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছিলো খেলাফত। ওই সময়ে ইসলাম ছড়িয়েছিলো বলেই তাকে আমরা স্বর্ণযুগ বলি, কিন্তু খলিফাদের এসাসিনেশন এই ইঙ্গিতই দেয় যে সবকিছু আদতে ফুলেল ছিলোনা। বিশেষ করে উত্তরাধিকার ইস্যুতে শিয়া-সুন্নী বিরোধের বয়ান, ব্যাটল অফ কুফা এবং কারবালার বিষাদনামায় তা প্রস্ফুটিত। ভারতবর্ষে এবং পরে সেই সূত্রে চীনে বুড্ডিজম ছড়িয়েছিলো কারণ একজন সম্রাট অশোক ছিলেন তাদের জন্য। একই ভাবে ক্রিশ্চিয়ানিটি ছড়িয়েছিলো সম্রাট কন্সট্যান্টাইনের হাত ধরে। শাসকের অনুগ্রহ না পেলে ধর্ম ছড়াতে পারেনা সহজেই। রোমান সাম্রাজ্য এবং পরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে নিপীড়িত মানুষেরা ক্রিশ্চিয়ানিটিতে সাম্য দেখেছিলো, যেভাবে ভারতবর্ষের মজলুমেরা দেখেছিলো ইসলামে। সকল ধর্মপ্রচারকই বিপ্লবী কিন্তু সকল বিপ্লবী ধর্ম প্রচারক নয়। তাই সাংস্কৃতিক বিপ্লব বললে বোধ করি পাপ হবেনা। সাংস্কৃতিক অভিযোজন যেকোন নতুন ধর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তার ছড়িয়ে যাওয়া সহজ হয় তাতে। কনফুসিয়াসের দর্শন কিংবা তাওয়ের দর্শন না থাকলে বুড্ডিজম পূর্ব এশিয়াতে জায়গা করে নিতে পারতোনা। ভারতবর্ষের ইসলামের মামলাটা ঠিক ওরকম নয়, ভারতে ইসলাম এসেছিলো প্রথমত বনিকের হাত ধরে, পরে শাসকের সঙ্গী হয়ে। অটোম্যান সাম্রাজ্যের পত্তন কিংবা ইউরোপের মুসলিম সাম্রাজ্য চূড়ায় ওঠার পরে সিন্ধুর এইপারে ইসলাম এসেছিলো। ততদিনে রেনেসাঁ চলে এসেছে, মার্কেন্টাইল ক্যাপিটালিজমের চর্চা শুরু হয়ে গেছে পশ্চিম ইউরোপে। এই রেনেসাঁর কাছে মানব সভ্যতা ঋণী এবং রেনেসাঁ তুমুলভাবে ঋণী মুসলিম সভ্যতার কাছে। শাসকের তরবারীর সাথে জ্ঞানীর কলমের সেতুবন্ধন ঘটেছিলো মুসলিম নগরী গুলোতে। প্রাচীন গ্রীক টেক্সটগুলোর অনুবাদ হয়েছিলো আরবীতে। সভ্যতা যদি একটা ধারাবাহিক নাটক হয়ে থাকে তবে তার বিভিন্ন পর্বে একেকজন নায়ক থাকে; ইউরোপ যেটাকে মধ্যযুগ বলে সেই সময়কার নায়ক ছিলো মুসলিমরা। তাদের দর্শনচর্চা ও জ্ঞান – বিজ্ঞান চর্চা থেকে শিখেছিলো ইউরোপ। কিন্তু অচলায়তন ভাংতে চাননি মুসলিম শাসকেরা, খলিফা আল মামুনের মত কিছু ব্যাতিক্রম বাদে। মুতাজিলাপন্থী শাসকেরা বাগদাদ শাসন করেছিলেন তিরিশ বছরের ও বেশী সময়। তারা ওহী বাদে সকল কিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন, অনেকে ওহীকে ও করেছিলেন। এধরনের আলোচনাকে তারা উৎসাহিত করতেন। এমনকি ভারতবর্ষে প্রথম যে দুজন জেসুইট পাদ্রী এসেছিলো তাদেরকে সম্রাট শাহজাহান চার্বাকপন্থী এবং মুসলিম ইমামের সাথে বাহাসে বসিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ক্রিশ্চিয়ানিটির মত ক্লারগি কিংবা ধর্মতাত্ত্বিকদের কারনে শাসকেরা পারেননি এই চর্চা জারি রাখতে। অনেকে পুরো ব্যাপারটাকে স্পিরিচুয়ালি হ্যান্ডেল করতে চেয়েছিলেন, সূফীদের মতন। কিন্তু সম্ভবত ইমাম গাজ্জালীর পর থেকেই তার প্রভাব মুসলিম বিশ্ব এড়াতে পারেনি। ব্লাসফেমি একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় যেহেতু মুসলিম আইন তখন নিজের পায়ের উপর দাঁড়াচ্ছে। সাম্রাজ্যের অমুসলিম অংশটুকুর ধর্মীয় অনূভূতি কিভাবে মোকাবিলা করা হবে সেই চিন্তা থেকেই নিবর্তনমূলক আইনের সূত্রপাত। এই ধরনের ইস্যুগুলো সেটেল করার জন্য ক্রিশ্চিয়ানিটি অনেক সময় পেয়েছিলো। তারা রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও গ্রীক অর্থোডক্স চার্চের মধ্যকার বিরোধটুকু মেটানোর সময় ট্রিনিট্রি, রিভিলেশনের মত স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আমলে নিয়েছিলো। নাইসিন ক্রিড একারনেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম পায়নি কারণ ইসলাম আবির্ভাবের পরের এক শতকের মধ্যেই ছড়িয়ে গিয়েছিলো প্রবলভাবে। সেক্টরিয়ান বিরোধগুলোর তাই হয়তো সেভাবে সমাধান হয়নি। অনেকে বলেন ইউরোপের ভূমিব্যবস্থা এবং অটোম্যান সাম্রাজ্যের ভূমি ব্যবস্থায় পার্থক্য ছিলো বলেই মধ্যবর্তী শ্রেণী তৈরী হয়নি, এটা একটা কারণ। পুঁজিপ্রবাহের জন্য বাহকের দরকার ছিলো, যেটা মুসলিম সাম্রাজ্য তৈরী করতে পারেনি। রাস্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার জন্যই সেক্যুলারিজমের উদ্ভব এবং পুঁজিবাদ পরবর্তীতে তার অনুগামী হয়েছে নিজচরিত্রগুনে। মুসলিমেরা সেই ট্রেন মিস করেছিলো পুস্তক থেকে মুখ ফিরিয়ে তথা মুক্তবুদ্ধিকে আক্রমন করে। ইউরোপিয়ান রেনেসাঁর বিখ্যাত তাত্ত্বিকেরা অনেকেই একই সাথে পাদ্রী ও প্রকৃতি বিজ্ঞানী ছিলেন, মুসলিম রেনেসায় তা ছিলোনা। আরিয়ান ইনভেইশনের পর থেকে শঙ্করাচার্য পর্যন্ত ভারতবর্ষের হিন্দুইজম সেভাবে দানা বাঁধেনি, বিভিন্ন অঞ্চলে তার বিভিন্ন সাবলীল ফর্ম ছিলো। আব্রাহামিক রিলিজিওনের মতই শঙ্করাচার্য পূর্ববর্তী মহামানবদের আত্তীকরণ করেন, যেমন বুদ্ধকে তিনি অবতার বানিয়ে নেন। পরবর্তীতে পাশ্চাত্য প্রভাবিত ব্রাহ্মধর্মের মোকাবিলায় বিবেকানন্দ তার আধুনিকায়ন করেন। ব্রাহ্মধর্ম এবং তার প্রভাবে কেশবচন্দ্রের জন্ম না হলে নিউ হিন্দুইজম কিংবা বিবেকানন্দের জন্ম হয়তো হতোনা। এটাকে কলোনিয়ালিজমের প্রভাব থেকে বাঁচতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জিহাদ বলা যেতে পারে, যেটাকে সফল ভাবে বিশ্বায়িত করেছিলেন বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র যার মানসসন্তান এবং সেই সূত্রে এন্টাই-কলোনিয়াল হিন্দু ন্যাশনালিজমের পুরোধা। রাস্ট্রবাসনার সাথে ধর্ম অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত, সে ধর্মের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে উন্মুখ শিশু পুঁজিবাদই হোক কিংবা রিভাইভালিস্ট স্পিরিটের প্রলেপ মাখা জাতীয়তাবাদী ইউটোপিয়াই হোক, ধর্ম সবখানেই প্রবলভাবে উপস্থিত। কারণ ধর্মের থেকে বড় কোন সামাজিক পুঁজি নেই আদতে। পুঁজিবাদ নিজেই এখন সবচেয়ে বড় ধর্ম হয়ে যাওয়ার কারনে হয়তো এই সামাজিক পুঁজি পশ্চিমে দিনদিন কোনঠাসা হচ্ছে আবার মুসলিমপ্রাচ্যে ঘটছে উল্টোটা। এই ইফেক্ট দুটো কোনভাবেই মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ না , তবে সম্পর্কিত বটে। এটাকে ইন্ডিভিজুয়ালিজম বনাম কনভেনিয়েন্ট যৌথতার লড়াই ও বলে থাকেন অনেকে, যে লড়াইয়ের কারনে সভ্যতা আদতে সামনে আগানোর কিংবা পেছনে যাওয়ার রসদ পায়। সাম্প্রতিককালে ভারতে শ্যমাপ্রসাদ মুখার্জীর উত্তরপুরুষদের বিজেপিশংসা, ইউরোপে ডানপন্থী জাগরণ ও পলিটিক্যাল ইসলামের উত্থানের সাথে নিও লিবারেল পুঁজি ব্যবস্থার বাসর হয়তো ভবিষ্যতের ভিন্নতর কোন ইঙ্গিত দেয়। উনবিংশ শতকের সায়াহ্নে ফ্রেডরিখ নিটসে বলেছিলেন, ঈশ্বরের মৃত্যু হয়েছে; একবিংশের দার্শনিক জর্জিয়ো আগামবেন বলছেন, না, মৃত্যু হয়নি, তিনি শীতঘুমে গিয়েছিলেন। জন্মান্তর হয়েছে তাঁর!! হি ওয়াজ ট্রান্সফর্মড ইনটু মানি!! পুঁজিই কি তবে বেহেশতী শৃঙ্খলাকে প্রতিস্থাপিত করছে এই নতুন গ্লোবালায়িত পৃথিবীতে? অর্থের মাঝেই কি লুকায়িত আমাদের নয়া ঈশ্বর?

(সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায় পূর্বপ্রকাশিত ভিন্ন শিরোনামে, জুন ২০১৪ তে লিখিত)

Related Posts

About The Author

Add Comment