নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী: দক্ষিন এশিয়ার একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র

নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী ছিলেন দক্ষিন এশিয়ার প্রথম মহিলা নবাব। উনবিংশ শতকের নারী সমাজের অন্ধকার যুগে নবাব ফয়জুন্নেছা ছিলেন একটি আলোকবর্তিকার নাম। যার আলোয় আলোকিত হয়েছিল সমাজ রাষ্ট্র তথা এই ভারতীয় উপমহাদেশ। তিনি তার সমকালিন সময়ে এবং পরবর্তীকালীন সময়েও নারী শিক্ষা ও সমাজ সংস্কৃতির উপর প্রভাব বিস্তারকারী একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি নারী। আমরা নারী জাগরনের পথিকৃৎ হিসেবে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতকেই জানি কিন্ত বেগম রোকেয়ার জন্মের প্রায় ৫০ বছর পূর্বে কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাও এলাকায় ১৮৩৪ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী জন্মগ্রহন করেন। নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী ছিলেন জমিদার আহমদ আলী চৌধুরী ও আরফান্নেছা চৌধুরানীর প্রথম কন্যা। রক্ষনশীল পরিবারে জমিদার বাড়ীর কঠোর পর্দাপ্রথার অন্তরালে বেড়ে ওঠা ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর কোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা। তারপরেও তিনি বাংলা আরবি ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষায় অসাধারন পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

নবাব ফয়জুন্নেছা ছিলেন একজন সত্যিকারের জ্ঞানপিপাসু ও সাহিত্যনুরাগী। তিনি ছিলেন বৃটিশ ভারতের প্রথম কবি। তাঁর রচিত রূপজালাল আত্নজীবনীর ছাচেঁ লেখা অসামান্য একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। এ কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও ফয়জুন্নেছার সঙ্গীতসার ও সঙ্গীত লহরী নামে দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত সুধাকর ও মুসলমান বন্ধু পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

সামগ্রীকভাবে বিবেচনা করলে নবাব ফয়জুন্নেছার স্থান বাংলা কাব্য বিশেষত মধুসূধন, বিহারীলাল ও সুরেন্দ্রনাথের পাশাপাশি। এবং তাকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের সমসাময়িক লেখক হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে সাহিত্য সাধনায় ফয়জুন্নেছার পথ ধরে বেগম রোকেয়ার আগমন ঘটেছে। বাংলার নারীদের সাহিত্যে অবদানে নবাব ফয়জুন্নেছা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশে তিনিই একমাত্র নারী যিনি সর্বপ্রথম চিন্তা করেছিলেন আধুনিক শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলে নারীরা সমাজে পিছিয়ে পড়বে। তাই দুঃসাহসিক উদ্যোগ নিয়ে মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর আগে ১৮৭৩ সালে কুমিল্লা শহরের বাদুড়তলায় প্রতিষ্ঠা করেন ফয়জুন্নেছা উচ্চ ইংরেজী বালিকা বিদ্যালয়। যা বর্তমানে ফয়জুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর সোনিয়া নিশাত আমিন তাঁর ‘The World of Muslim Women in Colonial Bengal,1876-1903 গ্রন্থে বলেছেন, “At the time when sporadic efforts were taking place to develop the condition of education in this part of the world , a Muslim woman came forward with a daring plan to set up a school for PURDANASIN girls in comilla.”

১৯০১ সালে লাকসামে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন যা বর্তমানে লাকসাম নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারী কলেজ হিসেবে পরিচিত। তিনি লাকসাম পশ্চিমগাঁওয়ে বিএন হাইস্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন। নারী স্বাস্থ্য সেবায় তিনি ১৮৯৩ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা মহিলা ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নবাব ফয়জুন্নেছা ১৮৯৯ সালের দেশের ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের নির্মাণ কাজে তৎকালীন সময়ে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেন। শিশুদের শিক্ষা বিস্তারে তিনি নবাব ফয়জুন্নেছা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে পশ্চিমগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে চালু রয়েছে। তাছারাও তিনি একটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। নবাব ফয়জুন্নেছার জনহিতকর কাজ দানশীলতা ও মহানুভবতার কথা মহারানী ভিক্টোরিয়া জেনে তাকে ১৮৮৯ সালে নবাব উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯০৩ সালে এই উপমহাদেশ থেকে এক অসামান্য উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিচ্যুতি ঘটে।

নবাব ফয়জুন্নেছার জীবদ্দশায় তিনি তার কর্মের মূল্যায়ন পাননি। ২০০৪ সালে তাকে যৌথভাবে মরণোত্তর একুশে পদক দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে স্মরন করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রী হলের নাম করন করা হয় নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজেও একটি ছাত্রী হল রয়েছে নবাব ফয়জুন্নেছার নামে। বাংলার নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথিকৃৎ – নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী উপলব্ধি করেছিলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যতীত নারীদের কোন ভবিষ্যৎ নেই। তৎকালিন সময়ের তুলনায় নবাব ফয়জুন্নেছার চিন্তা ছিল আনেক বেশি আধুনিক ও ভাবনাসঞ্চারকারী। সত্যিই তিনি নারী জাগরনের বিস্মৃত প্রায় আরেক অগ্নিকন্যা।

তথ্যসূত্র:

১. উইকিপিডিয়া

২.বিভিন্ন ওয়েবসাইট

৩.সোনিয়া নিশাত আমিন-‘The World of Muslim Women in Colonial Bengal,1876-1903

Related Posts

About The Author

Add Comment