নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ

★★বই রিভিউ★★
বই: নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ
লেখক: হুমায়ুন আহমেদ
প্রকাশনী: অন্য প্রকাশ, একুশে বইমেলা ২০১২
পৃষ্ঠা: ৮৩
মূল্য: ২০০ টাকা
.
হুমায়ুন আহমেদ যখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকার মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছেন তখন তার দিনলিপি ও অনুভূতি নিয়ে বইটা লেখা। এটা অনেকটা ডায়েরির মত। নিউইয়র্ক শহরে তিন রুমের একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে হুমায়ুন আহমেদ, তার স্ত্রী শাওন, দুইপুত্র নিষাদ নিনিত আর প্রকাশক মাযহারসহ মোট ৫ জন থাকছেন। ক্যামোথেরাপির মত মারাত্নক যন্তনাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন লেখক। প্রায় প্রতিদিনই তাকে দেখতে বিভিন্ন মানুষজন আসে। তার সময় কাটছে বিভিন্ন লেখকদের বই পড়ে, লিখালিখি আর ছবি এঁকে। বইটিতে উঠে এসেছে তার অতিতের অসংখ্য অভিজ্ঞতার কথা, পারিবারিক ঘটনাবলি আর ভবিষ্যত ইচ্ছা ও পরিকল্পনার কথা। তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনাতে একটি স্কুল বানানো হতে শুরু করে ছোটবেলায় বাবার পকেট থেকে চুরি করে লুকিয়ে প্রথম সিগারেট খাওয়ার রোমাঞ্চকর ঘটনা। বলা হয়ে থাকে মানুষ যখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে আসে তখন তার চোখের সামনে পুরো জীবন টা একটা ছবিরমত ভেষে উঠে। তিনি লিখেছেন বেঁচে থাকলে বাংলাদেশে একটি আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ করবেন, যাতে আমাদের দেশের মানুষের উচ্চ চিকিৎসার জন্যে বাইরে যেতে না হয়। তার প্রিয় লেখক এলান পো আর হারুকি মুকারমীর কথাও এসেছে বইয়ে।


অনেকে অবশ্য বইটির সমালোচনাও করেছেন এই বলে যে হুমায়ুন আহমেদ পরোক্ষভাবে মানুষের কাছে তার চিকিৎসার জন্যে টাকা সাহায্য চাইছেন বইয়ের বিভিন্ন অংশে।

বইটির পাতায় পাতায় লেখকের চিরন্তন আক্ষেপের কথা দেখা গেছে। যেমন তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়ের কবি উপন্যাসের উদ্বৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন “জীবন এত ছোট কেন?” হুমায়ুন আহমেদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে অনেকসময় অনেক ধোয়াশা ও অস্পষ্টতা তৈরি হয়। অনেক বইয়ে তিনি স্রষ্ঠা ও ধর্মের পক্ষে কথা বলেছেন, আবার অনেক বইয়ে ধর্মকর্মের নিরর্থকতার প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে এই বইয়ে আমরা তাকে একটু বেশি মাত্রায় আস্তিকরূপে পাই। বইটির ফ্ল্যাপে তিনি লিখেছেন “নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ বইটি এই তরুনির জন্য (শাওন)। যে করুনা, মমতা এবং ভালবাসা সে আমাকে দেখিয়েছে, পরম করুণাময় যেন তা বহুগুণে তাকে ফেরত দেন।” জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে এসে এক অজানা, অনিশ্চিত ও অন্ধকার জগতের স্বরন করেও এমনটা হয়ে থাকতে পারে।
বইটিতে একটি ছোটগল্পও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ যেন গল্পের ভেতর গল্প। গল্পের নাম রুম নম্বর ২১৭। গল্পের নায়ক গিয়াসুদ্দিন আখন্দের ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পরেছে। শেষে এক পতিতার ঝাড়ুশলার ঝাড়ফুঁকে তার ক্যান্সার ভাল হয়। অবাক হচ্ছেন? এর উত্তর লেখক এভাবে দিচ্ছেন “গিয়াসুদ্দিন বিদায় নিল। স্বাস্থ্যে, সৌন্দর্যে এবং আনন্দে সে ঝলমল করছে। তার এই আনন্দের পেছনে ঝাড়ুর পাঁচটি কাঠির কোন ভূমিকায় আছে কি? জগৎ রহস্যময়। থাকতেও পারে।”


গল্পের সেই গিয়াসুদ্দিনের ক্যান্সার ভাল হলেও আমাদের প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের ক্যান্সার ভাল হয়নি। আমাদের সবাইকে এক বিষাদের সাগরে ডুবিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন তিনি। এক দমে পুরো বইটা কিভাবে যে পড়ে ফেলেছি টেরও পাইনি। সম্ভবত বইটির সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা আর স্বতঃস্ফূর্ততাই এর কারন।

 

Writer : Atiqur Rahman Shifat

13043784_699189040222103_3549367108490137141_n

Related Posts

About The Author

Add Comment