নির্বাক কামরুলের এক গুচ্ছ কবিতা

সে ও সময়

শ্রাবণের ঘোর লাগা সন্ধ্যায়
খামচে ধরা আস্তিনের মত
গুটিসুটি বসে বারান্দায় ।

ভুলের চোখে আঙুল দিয়ে
দেখার মত স্পষ্ট অন্ধকার
নির্মোহ দৃষ্টির কাছে পরাজিত প্রচ্ছন্ন

ভাবনাগুলোও মিথ্যে ছিল না
দৃষ্টিসীমায় ছিল না সে
কখনো সুলোচনা ।

ভাবছো- কেউ নিশ্চয় পাশে আজ ।

নেই ।

অদৃশ্য তার মূর্তি খুঁজি বারে বার
বেঁচে থাকার স্বপ্ন ঠুকি অন্ধ তিমিরেই ।

আমি যদি হতাম

l201302141800

আমি যদি হতাম ফুটপাতে শুয়ে থাকা কুষ্ঠ রোগীর দগদগে ক্ষতে

অনবরত উড়তে থাকা মাছির ডানা

আমি যদি হতাম তিনদিন ধরে উপোস করা

গিন্নীটির আধোয়া ডেগচির নিচে জমাট বাঁধা কালি,

তার ভাঙা চূড়িতে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষুধার্ত শিশুর অশ্রুর দাগ

আঙুলের টোকায় যদি আমি শূণ্যে আমি ডিগবাজি খেতাম

নর্দমায় কিলবিল করে যে পোকাটি প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে চলেছে মানুষের দুর্গন্ধ

তার মতোন

আমি যদি হতাম ফেরিওয়ালা সেই কিশোরীর

কপোলে চিকচিক করা ঘামের বিন্দু

আট নম্বর বাসে আচার বেচতে গিয়ে

এক নষ্ট পুরুষ যার বুকে হাত দিয়েছিল,

যদি আমি হতাম অর্ধ উলঙ্গ সেই উন্মাদের অপরিচ্ছন্ন নাকের পিছুটি

যার গায়ে এক কুকুর বদ্ধ শীতের রাতে প্রস্রাব করে দৌড় মেরেছিল,

আমি যদি হতাম ক্ষুধার্ত কাকের চোখে বুভুক্ষু নগরীর

উচ্ছিষ্ট লেজহীন মড়া মুরগীর ঠ্যাং,

জন্মে আমার চিরকালীন ঘৃণা

তবু আমি যদি হতাম

প্রসূতির প্রসব যন্ত্রণায় আরশভেদী কান্নার অনুরণন

আমি যদি হতাম সারারাত চিৎকার করা এক মাতাল কবির

বিষাক্ত সময়ের একটি রাত

তবে,

স্বার্থপর ঈশ্বরের মুখে মূত্র বিসর্জন করতে

প্রেমিকার উদ্ধত বুকে সশব্দে থু থু ছিটাতে

টিকটিকির সভ্যতাকে দু পায়ে জোঁকের মতো পিষে ফেলতে

আমি একটু হলেও সন্দিগ্ধ হতাম।

স্পর্শ

The-Journey-Landscape-Painting-by-John-Fernandes-Water-colour-on-Paper

আমার এই খড়খড়ে পায়ের চামড়া শুঁকে দ্যাখো,

কাদা মাটির কাঁচা ঘ্রাণ এখনো জীবন্ত।

পামিস্টের মতো দৃষ্টি মেলে দ্যাখো,

এই হাতের তালুর রেখায় রেখায়

কাস্তে ধরার কড়া চিহ্ন পাথরের মত স্পষ্ট।

আমার শরীরের উষ্ণতা মাপতে গিয়ে

থার্মোমিটার বহুবার মার্জনা চেয়েছে,

কেননা উন্মত্ত এ ধমনীতে কোটি বাঙালির রুধির ধারা

ভিসুভিয়াসের লাভার মত

প্রতিনিয়ত টগবগ করে ফুটে ওঠে।

দীঘির প্রশান্ত জলে পা ডুবিয়ে নখ ঢেকেছিলাম শ্যাওলায়,

হাঁটতে হাঁটতে সেখানে আবার জমেছে

ব্যস্ত নগরীর পদপিষ্ট ধূলো।

দ্যাখো, এখনো আমার ছিণ্ন জামার আস্তিনে

সোনালি সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে

শরৎ মঞ্জরীর রেণু।

বিশ্বাস করো, আমি বাংলাদেশ।

তোমরা আমাকে মেরো না।

বিরূপ মুখোশ

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

সময়ের অসঙ্গত দাবি দাওয়া মেটাতে মেটাতে আমি ভীষণ পরিশ্রান্ত,

শতাব্দীর ইতিহাস আমি লেন্স লাগিয়ে পড়তে যাই না,

চোখ বন্ধ করে যখন জীবনের পৃষ্ঠা উল্টাই

ক্রুদ্ধ শরীর তখন অনবরত জ্বলতে থাকে হতাশার আগুনে,

দুর্দান্ত বেগে একদিন ছুটিয়েছিলাম যে মল্ল ঘোড়া,

তার খুর ভাঙা, অর্ধমৃত, খোঁড়া হয়ে পড়ে আছে ইটের খোয়ায়

পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র তুমিই হয়ত জানো,

তোমার স্মৃতিরা কতটা পথের বাধা

আজ

মাঝ রাস্তায় চিংড়ির মত লাফাতে লাফাতে লাফাতে

উন্মাদের মত ছুটতে ছুটতে ছুটতে

কণ্ঠনালীতে রক্ত না আসা পর্যন্ত

চিৎকার করতে করতে করতে

পুরো পৃথিবীকে জানিয়ে দিবো,

একদিন তোমাকে খুব ভালবেসেছিলাম।

আবার

খয়েরি অলিন্দের যে অংশটায় তোমার অস্তিত্ব,

চাকু দিয়ে সেই অংশ বিচ্ছিন্ন করে

আপাদমস্তক তার ছিলকে পড়া রক্ত মেখে

সেই মৃত প্রত্যঙ্গটি মূষ্ঠিতে ধরে

ইউকন হতে দেশাই,

সানজিউলান হতে সিউল

সমগ্র পৃথিবীর প্রান্তর বোল্টের মত দৌড়াবো,

যাতে সাতশ কোটি মানুষ, বাতাস, ইথার, বায়ুমণ্ডলের উড়ন্ত ধুলোরা জানে

তোমার জন্য সঞ্চিত আমার কত তীব্র ঘৃণা।

অন্ধ মানবী!

ব্যর্থ তোমার জন্ম,

তোমার চোখে আজও আলো ফুটল না।

-লেখক :

নির্বাক কামরুল

সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

About The Author

Add Comment