ছফামৃত-আহমদ ছফার পেটের গল্প, পিঠের গল্প

আহমদ ছফার “যদ্যপি আমার গুরু” পড়ে যেমন জ্ঞানতাপস প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায় তেমনি নূরুল আনোয়ারের “ছফামৃত” পড়ে আহমদ ছফাকে কাছে পাওয়া যায়। জাতিকে যারা নগ্নভাবে ভালবেসেছিলেন তাদের মধ্যে আহমদ ছফা অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুর মহাত্মা গান্ধী আর ফকির লালন শাহকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন জাতির সাথে। ছফাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ড. সলিমুল্লাহ খান। সলিমুল্লাহ খান ছফাকে বলেছেন ‘মহাত্মা আহমদ ছফা’। তিনি আরো বলেছেন আহমদ ছফা “আমাদের কালের নায়ক”। মীর মশাররফ হোসেন আর কাজী নজরুল ইসলামের পর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে সার্থক মুসলিম সাহিত্যিক হিসেবে তিনি বিবেচনা করেছেন ছফাকে। মৃত্যুর আগে ছফা অবশ্য এই কথা শুনে মৃত্যুবরণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। ছফা কেঁদেছিলেন এ কথা ভেবে যে অন্ততপক্ষে একজন সাহিত্য সমালোচক তাকে নিয়ে কত বড় এক মন্তব্যই না করলেন! বাংলাদেশে জীবিত বুদ্ধিজীবীর চেয়ে মৃত বুদ্ধিজীবীরা সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। ছফার ভাগ্যে জীবদ্দশায় কোন বিখ্যাত পুরস্কার না জুটলেও মৃত্যুর পরে অবশ্য জুটেছিল। ২০০২ সালে ছফাকে সরকার “একুশে পদকে” ভূষিত করেছিল। ড. সলিমুল্লাহ খানের ভাষায়,” কালে প্রমাণ করিতেছে ইহা নিয়ম ছিল না।নিয়মের যম(অর্থাৎ অতিক্রম) হইয়াছে মাত্র”। জনাব খান তাঁর জীবদ্দশায় ছফার চেয়ে অসামান্য মানুষ দেখেন নি।

আহমদ ছফা কারো জীবনী পড়ে সন্তুষ্ট হতে পারতেন না কারণ জীবনীগ্রন্থে অতিরঞ্জনের বেসাতি থাকে, যা কাম্য নয়। চাষাভূষার ছেলে হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে ভালবাসতেন, গর্ববোধ করতেন যেন। এই চাষাভূষা পরিবার থেকে কেউ উঠে আসলে তাকে তিনি দারুণ সমাদর করতেন। ছফা বাংলার তিন জন ব্যক্তিকে নিয়ে গর্ব করতেন যারা হলেনঃ ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর ও শিল্পী এস এম সুলতান। ছফার হিন্দু হোস্টেলের হেডমাস্টার শ্রী বিনোদবিহারী দত্তের কাছ থেকে তিনটি বিশেষ গুণ রপ্ত করেছিলেনঃ সকালে শয্যাত্যাগ, মিথ্যা না বলা ও সবকিছু সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করা। ছফা বড় ভাইয়ের বিয়েতে গিয়ে প্রথম বিড়ি খাওয়া শেখেন। বিখ্যাত ব্যক্তিদের মাঝে এমন সব অদ্ভুত ব্যাপার থাকে যা সত্যিই ভাবিয়ে তোলে আর এই ভাবনার উস্কানি আসে মূলত তাঁর জীবনীগ্রন্থ পড়ার পর। ছেলেবেলা থেকে ছফা ছিলেন খুব ডানপিটে স্বভাবের। গাঁয়ের একটি দুরন্ত ছেলে যে বৈশিষ্ট্য ধারণ করে ছফা তার পুরোটাই পেয়েছিলেন। মিথ্যা কথা বলা আর চুরি বিদ্যা তিনি দারুণভাবে রপ্ত করেছিলেন।যদিও বিনোদ বাবু তাঁকে মিথ্যা বলা থেকে বিরত করতে পেরেছিলেন। তাঁর পকেটে সবসময় একটা দিয়াশলাই থাকতো যা দিয়ে তিনি ক্ষেতের বেড়া কিংবা খড়ের স্তুপে আগুন লাগিয়ে দিতেন এবং দূর থেকে মজা লুটে নিতেন। বিজ্ঞানী এডিসনের ছেলেবেলার কাহিনীর সাথে মিলে যায় যেন। এজন্য অবশ্য তাঁর বাবাকে অনেকবার ক্ষতিপূরণও দিতে হয়েছে।

আহমদ ছফাকে অনেকে নাস্তিক, অনেকে আস্তিক আবার অনেকে মৌলবাদী বলে গলা ফাটিয়েছেন। তবে মোদ্দাকথা হল ছফা কোনভাবেই নাস্তিক ছিলেন না। এমনকি তিনি বিভিন্ন ধর্ম প্রবর্তকদের খুব সম্মান করতেন। ছফার ডায়েরির ২২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, ” বুদ্ধের যে ইতিহাস, খ্রীস্টের যে বর্ণনা, মুহম্মদের(সা.) যে কাহিনী জানতে পারি, পড়ে, শুনে, দেখে মনে হয়, তাঁরা মন  এবং মুখ এক করে ফেলেছিলেন। এটি আমাকে অন্তত চেষ্টা করে দেখতে হবে। নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন যদি না আনতে পারি, অন্য সবাইকে পরিবর্তিত হতে বলার কোন অর্থই থাকে না”। ছফা ভাল শিক্ষার্থী বলতে যেমন বোঝায় তেমনটি ছিলেন না। তাঁর বাহ্যিক জ্ঞানের সীমা-পরিসীমার তল খুঁজে পাওয়া ছিল ভার কিন্তু তিনি পরীক্ষার খাতায় একেবারেই দাপুটে ছিলেন না। লেখকের মতে,” সার্টিফিকেট থেকে জানা যায়, ঊনিশ শ’ সাতান্ন সালের মার্চে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন সমাপ্ত করেন এবং তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন”।এমনকি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুনকে খুব একটা তোয়াক্বা করতেন না। লেখকের মতে,” তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ককে ‘গ্র্যান্ডফাদারের নাতি’র সাথে তুলনা করেছেন। অভিমান করে ড. আহমদ শরীফের ক্লাস পরিহার করেন এবং খেসারতস্বরূপ তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় অংশ করতে হয়েছিল।

১৯৭০ সালে ছফা পিএইচডি করার জন্য মনস্থির করলেন। অন্যান্য অনেক শিক্ষার্থীর মত সাক্ষাৎকারের কার্ড ও তিনি পেয়েছিলেন। ভাইভা দিতে গিয়ে খেলেন হোঁচট। ভাইভা বোর্ডে হাজির তিন বোদ্ধা শিক্ষকঃ ড. এনামুল হক, ড.  আহমদ শরীফ ও ড. মুনীর চৌধুরী। তখন ছফার এমএ পাশ হয় নি অথচ তিনি পিএইচডি করার জন্য ভাইভা দিতে হাজির এমনটা খুব বেশি ভাবিয়ে তুলেছিল ড. এনামুল হককে। ড. হকের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন ছফা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে। তিনি বলেছিলেন,” চারু বন্দ্যোপাধ্যায় এমএ পাশ না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। মোহিতলাল মজুমদারও এমএ পাশ ছিলেন না, তথাপি এখানে শিক্ষকতা করেছেন। আমি তো এমএ পাশ করবই, দু’চার মাস এদিক ওদিকের ব্যাপার”। পিএইচডি করার জন্য তিনি অনুমতিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তবে জ্ঞানতাপস প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সংস্পর্শে আসার পর তা অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়। ছফার পিএইচডি ডিগ্রি হয় নি বলে তিনি অনুতপ্ত ছিলেন না বরং প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের ছহবত তাঁর জীবনকে বর্ণিল করেছিল। তাঁর মতে,” প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিচিত হওয়া আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহের একটি। দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নির্মাণে, নিষ্কাম জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে, প্রচলিত জনমত উপেক্ষা করে নিজের বিশ্বাসের প্রতি স্থির থাকার ব্যাপারে প্রফেসর রাজ্জাকের মত আমাকে অন্যকোন জীবিত বা মৃত মানুষ অতটা প্রভাবিত করতে পারেনি। প্রফেসর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসতে পারার কারণে আমার ভাবনার পরিমন্ডল বিস্তৃততর হয়েছে, মানসজীবন ঋদ্ধ এবং সমৃদ্ধতর হয়েছে।” তিনি রাজ্জাকের দ্বারা কতটুকু প্রভাবিত হয়েছিলেন তার নমুনা পাওয়া যায় ছফার অনেক লেখায়। যেমন এক জায়গায় তিনি বলেছেন,” রাজ্জাক সাহেবের কাছ থেকে যখন আসতাম কোন কোন সময়ে মনে হত আমার মেরুদণ্ডটি তিনি হীরে দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছেন। আমাকে তিনি হীরের মত কঠিন এবং দীপ্তিমান করে সৃষ্টি করেছেন। আমার জীবনে উত্থান-পতনের পরিমাণও অল্প নয়। এমনও সময় গেছে চারপাশের লোক আমাকে দেখলে ধিক্কারধ্বনি উচ্চারণ করত এবং ছি ছি করত। সে সমস্ত অবহেলা, অপমান, অসম্মান, দুঃখ-যন্ত্রণা তুচ্ছজ্ঞান করে নিজের মেরুদণ্ডের উপর থিতু হয়ে দাঁড়াবার একমাত্র প্রেরণা ছিলেন প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক। আমি কিছু কাজ-কর্ম করেছি। আমার লেখালেখি হয়ত লোকে পড়ে। কিন্তু সেসবের মধ্যে গর্ব করার মত কোন কিছু খুঁজে পাইনে। কিন্তু একটা গর্ব আমি কিছুতেই ছাড়ব না, ছাড়তে পারব না সেটি হল – আমি আবদুর রাজ্জাকের ছাত্র। এটা এমন একটা অনুভূতি আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে যিনি আসেন নি তাঁর পক্ষে এই অনুভূতির ঘনত্ব এবং গাঢ়ত্ব উপলব্ধি করা কোনদিনই সম্ভব হবে না।”

ছফা তাঁর সময়ের সবচেয়ে সেরা পাঠকদের একজন ছিলেন। নিজে পড়তেন আর ভাইপো নূরুল আনোয়ারকে পড়ার তাগিদ দিতেন। লেখক নূরুল আনোয়ার তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিবেন কিন্তু পরীক্ষার পূর্ব রাত্রে চাচার নির্দেশ অনুযায়ী তাকে রবী ঠাকুরের “গল্পগুচ্ছ” পড়তে হবে। আনোয়ার পরীক্ষা থাকার কারণে তা পড়তে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। তার সাথে সুর মিলিয়েছিলেন ড. হারুন-অর রশীদ। তিনি বলেছিলেন, “ছফা ভাই, বইটা কি এখন না পড়লে নয়?” ছফা তাঁকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন,”হাজারটা পরীক্ষায় ফেল করলেও আমার আপত্তি নেই, কিন্তু একটা ভাল বই পড়ার সুযোগ নষ্ট করা কখনওই উচিত নয়।” এজন্যই তো ছফা অনন্য!

রাষ্ট্র নিয়ে হাতেগোনা যে কয়জন ব্যক্তি ভাবতেন সেই সীমিত সংখ্যার একজন ছফা। অধ্যাপক মনসুর মুসার মতে,” সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন উপলব্ধির একটি ষষ্ঠ-ইন্দ্রিয় তাঁর ছিল।” ছফার “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস” দারুণভাবে সাড়া ফেলেছিল। ছফার কলমের শক্তি ও মুখের শক্তি সমান তালে চলেছে। “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস” গ্রন্থে তিনি বলেছেন,” বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন শুনলে  বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এখন যা বলছেন শুনলে বাংলাদেশে সমাজ-কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না। আগে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্থানি ছিলেন বিশ্বাসের কারণে নয়–প্রয়োজনে। এখন অধিকাংশ বাঙালি হয়েছেন— সেও ঠেলায় পড়ে।”

ড. আহমদ শরীফ ছফার খুব শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মধ্যে বেশ মতবিরোধ কাজ করলেও  তারা একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ড. শরীফ “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস” বইয়ের প্রচ্ছদে লিখেছিলেন,”আজকের বাঙলাদেশে এমনি এক পষ্ট ও অপ্রিয়ভাষী আরও কয়েকজন ছফা যদি আমরা পেতাম, তাহলে শ্রেয়সের পথ স্পষ্ট হয়ে উঠত।” ছফার মেধার প্রতি ড. শরীফের সম্মান, ভক্তি আর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ মেলে যখন আমরা দেখি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর পদমর্যাদায় উপনীত হওয়ার জন্য তাঁর দরখাস্তের সাথে তিন জন ব্যক্তির মতামত সংযুক্ত করেছিলেন। এঁদের একজন ছফা ও বাকী দুইজন হলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. মুহম্মদ এনামুল হক। ছফার কথার উদ্ধৃতি থেকে আরো স্পষ্ট হবে বিষয়টি। তিনি বলেছেন,” আমার অবস্থাটি বুঝে দেখুন। এমএ-র রেজাল্ট বের হওয়ার আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি পিএইচ-ডি  করার অধিকার শর্তসাপেক্ষে আদায় করে নিয়েছি। এখন দেখতে পাচ্ছি, আমার ছাত্র জীবন শেষ হওয়ার পূর্বে একজন শিক্ষককে প্রফেসর হওয়ার সুপারিশও আমি করতে পারি।”

ছফা অকৃতদার ছিলেন, যেমন ছিলেন তাঁর গুরু প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি নারীর ব্যাপারে দোদুল্যমান অবস্থায় ছিলেন। কোন রকম সিদ্ধান্তে আসা তাঁর পক্ষে ছিল বেশ শক্ত। বিয়ের ব্যাপারে তাকে কেউ তাগিদ দিলে তিনি বলতেন যে, আহমদ ছফাকে ধারণ করার মত নারীর খোঁজ মেলেনি। লেখক আনোয়ারের একটি মন্তব্য বেশ ভাবিয়ে তোলার মত। তিনি লিখেছেন,” তিনি নারীদের প্রতি যতটা দুর্বল তার চেয়ে কঠিন এবং যতটা কঠিন তার চেয়ে অধিক তরল।” ঋতু পরিবর্তনের মত তাঁর মনের আকাশ কখনও মেঘাচ্ছন্ন, কখনও সাদা মেঘের ভেলায় প্লাবিত, কখনও নীল রংয়ের নিত্য খেলায় মত্ত। তাই তাকে বোঝা পাঠকের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য।  শামীম শিকদার, শ্যামা,’র’, সুরাইয়া খানমসহ অনেকেই ছফার জীবনে এসেছিল কিন্তু ভালবাসার জালে ছফাকে তারা কেউ ধরতে পারে নি।  তাঁর ডায়েরি ও “অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী” উপন্যাসে তাঁর ভালাবাসার ঝুমঝুমির আওয়াজ পাওয়া যায়। ছফা খুব রগচটা ও জেদি মানুষ ছিলেন। তিনি মনে করতেন তাঁর চেয়ে জেদি মানুষ পৃথিবীতে নেই। তাঁর ভাষ্য,” যতগুলো মানুষ দেখেছি আমার চাইতে দুঃসাহসী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও জেদি কোন মানুষ এ পর্যন্ত দেখিনি”।

শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে ছফা খুব কষ্টে ছিলেন। তবুও মুজিবকে নিয়ে তিনি অনেক উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। তাঁর এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন,” আজ থেকে অনেকদিন পরে হয়ত কোন পিতা তার শিশুপুত্রকে বলবেন, জান খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিল যাঁর দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হল মানুষটির সাহস আর জ্যোৎস্নারাতে রূপালি কিরণধারায় মায়ের স্নেহের মত যে বস্তু আমাদর অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তোলে তা হল তাঁর ভালাবাসা। জান খোকা তাঁর নাম? শেখ মুজিবুর রহমান”। ছফা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কখনও বঙ্গবন্ধু বলতে রাজি হন নি বরং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে তাকে মূল্যায়ন করতেন। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া কম্বলটি জড়িয়ে তিনি রাতে ঘুমাতেন। জাসদের রাজনীতি করতেন ছফা। নিয়মিত লিখতেন জাসদের মুখপত্র “দৈনিক গণকন্ঠ” পত্রিকায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াল থাবায় ছফার জীবন ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৪ই আগস্ট রাতে। এর একদিন পরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর ছফার খুশি হওয়ার কথা ছিল কিন্তু খুশি না হয়ে বরং তিনিই প্রথমে এই বর্বরোচিত হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি ‘হলিডে’ পত্রিকায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন অথচ আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ তখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিল। ছফার মত নির্লোভ সাহসী তরুণের পক্ষে এটা সম্ভবপর হয়েছিল।

এখানেই শেষ নয় ছফা আরো অনেক ক্ষেত্রে অনন্য। বাংলাদেশের প্রথিতযশা অনেক সাহিত্যিকের প্রথম বই ছফার হাত ধরে প্রকাশিত হয়েছিল। নামের ফিরিস্তি বড় না করে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হলেন হুমায়ূন আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ। তসলিমা নাসরিনের সাথে একসময় ছফার সুসম্পর্ক ছিল কিন্তু তসলিমার লেখায় একসময় তিনিএতটাই অতীষ্ঠ হয়ে ওঠেন যে তাদের সম্পর্ক দা-কুমড়ার সম্পর্কের পর্যায়ে চলে যায়।

ছফার জীবন বেশ বৈচিত্র্যময়। শুধু মানুষের জন্যই করেছেন নিজস্ব দায়বদ্ধতার আঙ্গিকে, পুরস্কারের নেশা তাকে আকৃষ্ট করেনি, কুরেকুরে খায়নি তাঁর হৃদয়। লেখক নূরুল আনোয়ার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ করে ও নিজের অভিজ্ঞতা ও চাচা ছফার সাহচর্যে তাকে যেভাবে দেখেছেন সেভাবে তাকে ফুটিয়ে তুলেছেন “ছফামৃত” বইটিতে। বইটি আহমদ ছফার উপর লেখা সবচেয়ে সেরা তথ্য নির্ভর বই। বইটি পাঠকের চিন্তাচেতনাকে সমৃদ্ধ করবে আশারাখি।

 

 

 

Related Posts

About The Author

One Response

Add Comment

Leave a Reply to Mehadi Arif Cancel reply