নেপোলিয়নের যুদ্ধজয় এবং সান জু’র ৩ টি নীতি

নেপোলিয়ন আমাকে ছোটবেলা থেকেই আকৃষ্ট করেছে। একেবারে সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ হয়ে যাওয়া সমকালে বিস্ময়কর ছিল, এখনো বিস্ময় জাগায় এবং ভবিষ্যতেও জাগাবে! একজন সাধারণ মানুষ কল্পনায় যা যা দেখেন তা বাস্তবে করে দেখিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে মনে করেন আমেরিকান চিন্তক এমারসন।

এ কারণেই হয়তো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নেপোলিয়ন ভক্তদের দেখা মেলে। আমাদের এখানে নীরদ সি চৌধুরী পরিবার ছিল নেপোলিয়নের পাড় ভক্ত। তাদের পরিবারকে কাছের জন ‘বোনাপার্তিয়ান’ বলে ডাকতো। আমাদের আহমদ ছফাও তার ডায়রীতে নেপোলিয়নের প্রতি তার ভালো লাগা বা আগ্রহের কথা লিখেছেন।

napoleone (1)

এই যে স্থলযুদ্ধে সর্বকালের একজন শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ছিলেন নেপোলিয়ন। তার যুদ্ধে অসাধারণ সফলতার পেছনে কারণ কি? সমরবিদরা, মনোবিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন মতামত জানিয়ে রেখেছেন। অতি সম্প্রতি একজন মনোবিজ্ঞানীর কাছ থেকে জানলাম নেপোলিয়নের যুদ্ধে সফলতার অন্যতম প্রধান কারণ তার ফোকাস। তিনি শত্রুপক্ষের কোন একটা নির্দিষ্ট অংশকে টার্গেট করতেন সাধারণত সবচেয়ে দুর্বল মনে হতো যে জায়গাটা সেখানটাতে। তারপর সেখানে একের পর এক আক্রমণে একেবারে তছনছ করে দিতেন। তারপর ওই দুর্বল জায়গাটার পথ ধরে শত্রুপক্ষের ভেতরে ডুকে গিয়ে শত্রুর পরাজয় নিশ্চিত করে দিতেন। আর নেপোলিয়ন অপ্রত্যাশিত আক্রমণ করতেন। অস্ট্রিয়ার সাথে যুদ্ধে অস্ট্রিয়ার জানু জানু সেনাপতিরা বেশ বিরক্ত ও ভীতশ্রদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তরুন সেনাপতি নেপোলিয়নের প্রথাবিরোধি আক্রমণে। ইউরোপীয় সেই সাম্রাজ্যগুলো যে প্রক্রিয়া ও প্রথা অনুসরণ করে আগে যুদ্ধ করতো নেপোলিয়ন তার অনেককিছুই ভেঙ্গে দেন। আগে উত্তরাধিকার সূত্রে সেনাবাহিনীর উচ্চপদে আসীন হতেন অভিজাত পরিবারের সন্তানরা। কিন্তু নেপোলিয়ন এসে যোগ্যতাগুণে প্রমোশনের ব্যবস্থা করেন। এজন্য সাধারণ সেনাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অনেক জনপ্রিয় এবং একাধিকবার কামানের মুখে জীবন দিয়ে নেপোলিয়নকে রক্ষা করেছিলেন তার সৈন্যরা।

এই যে নেপোলিয়ন শত্রুপক্ষের একটা দুর্বল পয়েন্টকে টার্গেট করে আক্রমণ শানাতেন এটা সান জু’র ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ এর মধ্যে পড়ে। সানজু’র একটা নীতি হচ্ছে- ‘তোমার শত্রুকে জানো, তোমাকে জানো এবং শত যুদ্ধেও তুমি পরাজিত হবে না।’

তোমার শত্রুকে জানো, তোমাকে জানো এবং শত যুদ্ধেও তুমি পরাজিত হবে না।

আরেকটা নীতি হচ্ছে ‘শত্রুর শক্ত অবস্থান এড়িয়ে চলো, শত্রু যেখানে দুর্বল সেখানে আক্রমণ শানাও।’

শত্রুর শক্ত অবস্থান এড়িয়ে চলো, শত্রু যেখানে দুর্বল সেখানে আক্রমণ শানাও।

আর ‘অপ্রত্যাশিতটাই করো’।

অপ্রত্যাশিতটাই করো

তো নেপোলিয়নের সামরিক সাফল্যকে আমরা সানজু’র এ কয়েকটি নীতির মধ্যে সুন্দর করে ফেলে দিতে পারি। নেপোলিয়ন হয়তো সানজুর যুদ্ধনীতি জানতেন বা জানতেন না। কিন্তু বিশ্বের যেকোন যুদ্ধের ফলাফলকে সান জ’র যুদ্ধনীতির ছাঁচে ফেলে দেওয়া যায়। আলেক্সান্ডার থেকে শুরু করে ভিয়েতনামের জেনারেল ভন গিয়েপ অবধি সব সমরবিদের সামরিক সাফল্যকে আমরা সান জু’র ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ এর নীতির মধ্যে ফেলে দিতে পারি। ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ এর শুরুর দিকেই সান জু বলে দিয়েছেন (১৫)- ‘যে সেনাপতি তার পরামর্শ শুনবে সে জয়ী হবে আর যে শুনবে না সে পরাজিত হবে’। এটা আমাদের কাছে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস মনে হতে পারে কিন্তু গত আড়াই হাজার বছরে শত শত যুদ্ধে জয় পরাজয়ের ক্ষেত্রে সান জু’র নীতি কার্যকর হয়ে এসেছে।

আমরা বিশ্ব ইতিহাসের কয়েকটি আলোচিত যুদ্ধের দিকে যদি মনোযোগ দেই তাহলে আমরা সেসব যুদ্ধে জয় পরাজয়ের ক্ষেত্রে সান জুর নীতির কারযকারিতা দেখতে পারবো। আমরা পরবর্তী লেখাগুলো সান জু’র ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবো।

art of war

Related Posts

About The Author

Add Comment