পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ই সফলতার মূলমন্ত্র

কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের কাছে পৃথিবীর কোন সাধনাই ব্যর্থ নয়। সফলতম একজন ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সবার প্রথমে প্রয়োজন পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের দৃঢ় মানসিকতা। কিন্তু আমরা যদি ব্যক্তির প্রতিভাকে আগে মূল্যায়ন করি তবে প্রথমেই আমাদেরকে ভুলের ফাঁদে পড়তে হবে। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় না থাকলে প্রতিভাও ধীরে ধীরে ব্যক্তির থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। আসলে প্রতিভা বলে কিছু আছে বলে আমার মনে হয়না, কেননা মানব সভ্যতাকে আলোকিত করতে যে মানুষগুলো অবদান রেখেছেন তারা প্রত্যেকেই কঠোর পরিশ্রমী, অধ্যবসায়ী এবং প্রচুর প্রাণশক্তির বিনিময়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন। বিখ্যাত সুরকার বেটোভেন নিরলস ভাবে সুর সাধনা করে গেছেন বলে বিখ্যাত হতে পেরেছিলেন। প্রথম দিকে তার সুর করা গানগুলো শুনে অন্য সুরকারেরা হাসতেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হল ঐ মানুষগুলোই বেটোভেনকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন কেননা তিনি যে, ততদিনে সাধারণ মানুষের মন জয় করে নিয়েছিলেন।

আপনারা এখন যে বিদ্যুৎ বাতি জ্বালিয়ে ঘরকে আলোকিত করছেন প্রতিদিন, সেই বাতি আবিষ্কারে বিজ্ঞানী এডিসন কমপক্ষে দশ হাজার বার অসফল হয়েছিলেন। তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিলো জীবনে তিনি কতবার ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেছিলেন কমপক্ষে দশ হাজার বার। প্রশ্নকর্তা আবার জিজ্ঞেস করলেন- ‘এতবারই যদি ব্যর্থ হন তবে সফল হলেন কিভাবে?’ তখন তিনি বললেন, “আমি যখনই ব্যর্থ হই তখনই নতুন কিছু আইডিয়া আমার মাথায় আসে এবং আমি আবার নতুন করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কাজ শুরু করি এবং সফল হই। আমি দশ হাজার বার ব্যর্থ হয়েছি তার মানে দশ হাজারটি নতুন আইডিয়া আমার মাথায় এসেছে”।

তিনি যদি তাঁর কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়কে থামিয়ে দিতেন তাহলে পৃথিবী আজ এতো আলোকিত হতো না। আসলে আমরা যখন একজন মানুষকে সফলকাম হতে দেখি তখন তাকে বলি প্রতিভাবান, এতে করে কি তার পরিশ্রম আর অধ্যবসায়কে অবজ্ঞা করা হল না? যারা পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত আলো দেখিয়ে চলেছেন তাদের জীবনীগুলো পড়ে দেখুন, দেখবেন তাদেরকে অনেকটা সময় অমেধাবী ছাত্র/ছাত্রী হিসেবেই গণ্য করা হয়েছিল। তাহলে এখানে প্রতিভার অবদান কি রইলো বলতে পারেন?

আমেরিকার বিখ্যাত উপন্যাসিক জ্যাক লন্ডন এর নাম আপনারা হয়তো শুনে থাকবেন। এই ব্যক্তিটি জীবন চালাতেন ভিক্ষাবৃত্তি আর ভবঘুরেপনা করে। একদিন এক পুলিশ তার এই কাজের জন্য এক মাস তাকে জেলে পুরে দিলেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে এই ভবঘুরে ব্যক্তিটিই ছয় বছর পরে আমেরিকার সাহিত্যে একজন জরুরি ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেন। তিনি কী করেছিলেন জানেন? জেল থেকে ছাড়া পাবার পর ভুল বশত একটা পাবলিক লাইব্রেরীতে প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানে ভুল বশত ইংরেজী সাহিত্যের ডিফোর উপন্যাস রবিনসন ক্রুসো পড়েছিলেন। এই উপন্যাসটি পড়ার পরে তার আগ্রহ এতটাই বেড়ে গেল যে চার বছরের কোর্স মাত্র তিন মাসেই শেষ করে ফেললেন। তারপর তিনি বিখ্যাত উপন্যাসগুলো বারবার পড়তে লাগলেন এবং লিখতে লাগলেন দিনে পাঁচ হাজার করে শব্দ। তিনি ‘দ্য কল অব দ্যা ওয়াইল্ড’ লিখে রাতারাতি বিখ্যাত হয়েছিলেন। সাহিত্যচর্চা শুরু করার মাত্র ১৮ বছর পর তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর বইগুলোর কদর এখনো আমেরিকায় যথেষ্ট রয়েছে। তাঁর বাৎসরিক আয় ছিল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এর চেয়ে দ্বিগুণ! পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় না থাকলে কি তিনি সার্থক হতে পারতেন, আপনারাই বলুন?

আচ্ছা মেনে নিচ্ছি প্রতিভা বলে কিছু আছে কিন্তু পরিশ্রমীদের কাছে এরাও পরাজিত হন কেননা প্রতিভাবানরা এক ঘন্টায় যে কাজ করেন পরিশ্রমীরা সেই কাজ করেন তিন ঘন্টায় যার ফলে পরিশ্রমীদের কাছে শ্রমের সার্থকতার মূল্য বেড়ে যায় বহুগুণ। অন্যদিকে কম পরিশ্রম করে সফলতা পাওয়ার কারণে প্রতিভাবানরা শ্রমবিমুখ হন, যার ফলে তারা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পরিশ্রমীদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েন এবং আফসোস করে বলেন, “আমি যদি আরো একটু পরিশ্রম করতাম তাহলে আমার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো”।

কিন্তু জীবনের ক্রান্তি লগ্নে পৌঁছে এ ভাবনা কেবল হতাশার পাল্লাই ভারি করতে থাকে। সুতরাং একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য ভাগ্য এবং প্রতিভার অযুহাত ছেড়ে যত তাড়াতাড়ি কঠোর পরিশ্রম, সাধনা এবং নিরলস অধ্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করা যাবে তত দ্রুতই সোনালি ভবিষ্যতের পথ আমাদের জন্য মসৃণ হবে।

 

লেখক : Nirupam Niru

             University of Comilla

 

Related Posts

About The Author

Add Comment