পাঠ পরিক্রমা : “আয়াজ আলীর ডানা”

ঠিক যতটা আগ্রহ নিয়ে সাজিদ উল হক আবিরের ‘আয়াজ আলীর ডানা’ বইটি সংগ্রহ করেছি ততটা আগ্রহেই বিছানায় বসে বইটি নেড়ে চেড়ে দেখছিলাম। ভাললাগার সঞ্চয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বইটির প্রথম গল্প ‘চেত্রসংক্রান্তির রাতে’র দিকে চোখ বুলাচ্ছিলাম।
.
গল্পটির পরিধি এক পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ হলেও এটি নিয়ে কিছু একটা লেখার তাগিদ ভেতর থেকে আপনা আপনিই অনুভব করছিলাম।হয়তো একজন পাঠক হিসেবে নিজের বোধকে প্রকাশ করে দায়মুক্ত হবার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।


একটি ছোট্ট গল্পে জীবনের অপরিহার্য কোনো অংশ কখনো বা পুরোটা জীবনকে তুলে ধরার প্রয়াস পরিপক্ক হাতের কাজ- স্বীকার করতেই হয়।


প্রিয় মানুষটির সাথে বিচ্ছেদের মুহূর্ত যখন অতি নিকটে তখন মানুষের ভেতর একদিকে যেমন কামনার আগুন জ্বলে ওঠে অন্যদিকে বিষাদে ছেঁয়ে যায় আপাদমস্তক|এই কামনাকে যদি নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি তাহলে অনেক বেশী ভুল হবে আমাদের।
.
কেননা কামনার এই আগুন থেকে তৈরী উষ্ণতা অথবা শক্তি মনে জমানো সমস্ত দুঃখ,ক্ষোভ,না বলা কথা গুলো কিংবা দুর্বলতা- এ সব কিছুকে জ্বালিয়ে হৃদয়ের ভীতটাকে পরিপক্ক করে তোলে। যে পরিপক্কতা হয়তো বাকিটা জীবন তাকে একা চলার অনুপ্ররণা জোগানো,প্রিয় মানুষের স্মৃতিকে যত্ম সহকারে লালন করার সাহস সন্ঞ্চার করবে কিংবা দুটি হৃদয়কে শেষবারের মতো একাত্ব হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে না।
.
কামনা-বাসনা এসবই যেন প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম|আমরা চাইলেও সে নিয়মের বাইরে এসে জীবনযাপন করার ক্ষমতা রাখিনা| আমরা প্রকৃতিরই একটি অংশ,প্রকৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে চলেছি আজন্ম।
.
গল্পটিতে উল্লেখিত প্রাণী *টিকটিকি* কে আমার সময়ের প্রবাহমানতার প্রতীক রূপে মনে হয়েছে। সময় যেন মানুষ অথবা প্রকৃতির ইচ্ছা অনিচ্ছা কিংবা কর্মের নীরব স্বাক্ষী|বিস্ময়ের প্রকাশ ব্যতীত সময়ের কিছু করার থাকে না। ঐ যে প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম যা হৃদয়কে ভরে দেয় বিষাদের ছাঁয়ায় যে ছাঁয়া বেশ গভীর,যার অপর নাম মৃত্যু।
.
এবার গল্পের শিরোনামের দিকে দৃষ্টিপাত করবো|কেননা শিরোনামটি যথেষ্ট তাৎপর্য বহন করে। চৈত্রসংক্রান্তি বাংলা মাসের শেষ দিন আর রাত শোক,বেদনা,ব্যর্থতার প্রতীক।
.
আমরা এ গল্পে দেখতে পাবো কিভাবে একটি মৃত্যু সুখের সমুদ্রকে ক্রমশ শুকিয়ে দিতে চায়,কিভাবে ক্রমাগত একজন মানুষ হতাশার গহীনে তলিয়ে যায় অথবা কিভাবে সমাপ্তি ঘটে সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকতে চাওয়া একটি স্বপ্নের।
.
প্রিয় মানুষের সাথে এই বিচ্ছেদ তৈরী করে অনুভূতির প্রবলতা,যে অনুভূতি ক্রমশ তার চেতনাকে বাস্তবতার সংস্পর্শ থেকে দূরে সরিয়ে কল্পনার অনিয়ন্ত্রিত জগতে জায়গা করে দেয়|এজন্যই হয়তো গল্পকার তার গল্পের ইতি টেনেছেন এভাবে-
.
“যে পৃথিবীতে এখনও আলোয়,জোছনায় ডুবে মানুষ মানুষকে ভালবাসে এমন করে,সেখানে আর ক’টা দিন বেঁচে থাকলে কিইবা অমন ক্ষতি হত?”

-মাসুমা আখতার রুমা,
ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

About The Author

Add Comment