পুরনো ঢাকার সংস্কৃতি

 

সমাজবিজ্ঞানের যতগুলো শাখা প্রশাখা আছে, তার মধ্যে কথা বলা কঠিন যে বিষয়টি নিয়ে, তা হল – সংস্কৃতি। কঠিন এই কারণে যে – সংস্কৃতি ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কঠিন, তরল বা বায়বীয় কোন পদার্থের মত পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে সংস্কৃতির রস আস্বাদনও করা যায় না। এমতাবস্থায় সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলাটা আসলে অন্ধের হাতি দর্শনের মতই। শুধুমাত্র চেতনাসম্পন্ন মানুষেরাই সংস্কৃতির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারেন। শুধুমাত্র উপলব্ধিতেই সমাধান নয়, সংস্কৃতিতে সমস্যা আছে আরও। সংস্কৃতি নিয়ে যতই আলোচনা পর্যালোচনা করা যাক – সংস্কৃতি নিয়ে দু’জন মানুষের ধারণা কখনও হুবহু এক হবে না। এই সবকিছু মাথায় রেখেই আমাদের আলোচনা অগ্রসর হোক।
সংস্কৃতি নিয়ে হুট করে কিছু বলা না গেলেও পুরনো ঢাকার সংস্কৃতির ব্যাপারে অনেক কিছুই বলা যায়। কারণ, আমার জন্মের পর থেকে নিয়ে পরবর্তী ২৫ টি বছর আমাকে পুরনো ঢাকায় কাটাতে হয়েছে। পুরনো ঢাকার সংস্কৃতি নিয়ে আমি যা ই বলব – তা বহুলাংশেই এমপেরিক্যাল, বা অভিজ্ঞতপ্রসূত।
পুরনো ঢাকার সংস্কৃতি থেকে নেয়া আমার প্রথম পাঠ হল – মহল্লাভিত্তিক জীবন। ছোট ছোট এলাকায় বিভক্ত জীবন। আমার বড় হওয়া পুরনো ঢাকার এক সরকারী কলোনিতে। পুরনো ঢাকার মহল্লাভিত্তিক জীবন ব্যাবস্থাটা ছিল অল ইনক্লুসিভ, অ্যাবজরভিং। সবাইকে নিয়ে এক সাথে এগিয়ে যাওয়া। সুখ-দুঃখ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়া। একজনের সমস্যা কিভাবে দশজনের মধ্যে ভাগ হয়ে গেলে দিনের শেষে আর কোন সমস্যাই মনে হয় না – সে শিক্ষা আমার পুরনো ঢাকায় কাটানো পঁচিশ বছরে পেয়েছি। কারো বিয়ে, কারো সন্তানের জন্ম, কারো পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া – পুরো মহল্লা মিলে একসাথে তা সেলিব্রেট করা। তাও আন্তরিকতার সাথে। তাতে কোন দেখালেপনা নেই। আবার বন্ধু-বান্ধব পাড়া প্রতিবেশীদের কারও পরিবারের কেউ মারা গেলে সপ্তাহখানেকের জন্যে পুরো মহল্লাই হয়ে যেত তার বা তাদের পরিবার। আমার অনেক বন্ধুর পরিবারই ছিল অনেক ধনী, অর্থ সম্পত্তির মালিক, কিন্তু তাদের এই পরিচয়টি অন্তত তাদের আচরণে আমরা কখনও বুঝি নি। একই সাথে হেসে খেলে বড় হয়েছি। সে ছিল আশ্চর্যজনক এক সময়।
ধর্মীয় উৎসব এবং পালাপার্বণে খুব অর্থবিত্তের খরচ না করেও, অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমকের আয়োজন ছাড়াই কিভাবে অত্যন্ত হৃদ্যতার সাথে পালন করা যায়, তা আমি দেখেছি পুরনো ঢাকায়। সবাই মিলেমিশে ঈদ- পূজা- পহেলা বৈশাখ এবং শাকরাইন উৎযাপন। ঈদের নামাজ পড়ে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাই সবার সাথে কোলাকুলি করছে, আবার শারদীয় দুর্গোৎসবে সনাতন ধরমালম্বি বন্ধুদের সাথে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দর্শন করছে মুসলমানের ছেলে। এ ওর বাড়ি যাচ্ছে, দাওয়াত খাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে। এ এক অসামান্য আন্তরিকতার দৃশ্য।
পুরনো ঢাকার পোশাকে এখন আর কোন আলাদা ঐতিহ্য দেখা যায় না। সাদা লুঙ্গী আর সাদা পাঞ্জাবী পড়ে পান চিবুতে চিবুতে ঢাকাইয়া কুট্টি পরিভাষায় কথা বলার মত মানুষের আজ বড় অভাব। তবে পুরনো ঢাকার সংস্কৃতির একটা বড় অংশ এখনও জীবিত আছে আমাদের পথখাবারের মাঝে। নান্না, হাজীর বিরিয়ানি, কোলকাতা কাচ্চিঘর, বিউটির লাস্যি, ঘরোয়ার ভুনাখিচুড়ি, অলিতে গলিতে তেহারি, নেহারি, রমাজানে চকবাজারের ইফতার, পূর্ণিমার জিলাপি- এগুলোর অনেক অনেক ব্রাঞ্চ এখন খোলা হচ্ছে নূতন ঢাকার গুলশান বনানীতে। কিন্তু খাবারের সেই স্বাদ, সেই ছোট একটা দোকানে গাদাগাদি করে বসে বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেয়া আর খাওয়া- তার যে প্রাণবন্ততা, সেটা কি গুলশান বনানীর কোন এসি শপে বসে পাওয়া যাবে?
পুরনো ঢাকার সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে কেন? কেন পুরনো ঢাকার সংস্কৃতি পাঠ করতে হবে? কারনটা সহজ। সামন্ত যুগে আমাদের এই বাংলাদেশ অখণ্ড ছিল না। এই অঞ্চলে, এই ভূখণ্ডের মানুষদের মাঝে কোন একক ঐক্যচেতনা বা জাতীয়তাবোধ ছিল না। ১৬৬৬ সালে মুঘলেরা চট্টগ্রাম জয় করলে পরে পুরো বাংলা একটি একক শাসনের অধীনে আসে। তাতেও ছিল মুঘল ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রভাববলয়ে আটকা পড়ার একটি অলাতচক্র। ব্রিটিশরা এলে ব্রিটিশ সংস্কৃতির প্রভাবে আক্রান্ত হই আমরা। ঢাকার সংস্কৃতি বলতে যা কিছু, তা গড়ে উঠেছে পুরনো ঢাকায়। তা আমরা ধারন করতে না পারি, সে সম্বন্ধে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। যারা এখনও নিজেদের ঢাকাইয়া দাবি করে তাদের সুযোগ সুবিধা, তাদের নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
পুরনো ঢাকার সংস্কৃতির বাইনারি হিসেবে যে সংস্কৃতি এখন নূতন ঢাকায়, তথা গুলশান- বনানী- ধানমণ্ডি এলাকায় তৈরি হচ্ছে কফিশপ কালচার, স্টেক কালচার, হ্যালোইন কালচার, কমিকন কালচার, পুল পার্টি কালচার, ডিজে নাইট কালচার – এটা আমাদের সংস্কৃতি না। এটা পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আমাদের জন্যে ভালো না মন্দ সে আলোচনায় গেলে আলোচনার মোড় ঘুরে যাবে, কিন্তু যা না বললেই নয় তা হল – সংস্কৃতি প্রকৃত অর্থে কখনও আদান প্রদান হয় নি পুব এবং পশ্চিমে। আর্যেরা এসেছে, তুর্কিরা এসেছে, মুঘলেরা এসেছে, ব্রিটিশেরা এসেছে – আমরা ওদের কাছ থেকে নিয়েছি কেবল। আমরা ওদের থেকে প্রভাবিত হয়েছি কেবল। এখন তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে গুলশানে, বনানীতে , ধানমণ্ডিতে, বেইলি রোডে, উত্তরায়, খিলগাঁও এ, মিরপুরে, মোহাম্মদপুরে, রামপুরায়। এ সবকিছুর মধ্যে একটি দুর্বল কিন্তু স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরনো ঢাকা। পুরনো ঢাকার সংস্কৃতি। বহতা নদীর মত এই সংস্কৃতি এগিয়ে যাক নিজের গতিতে, তবে পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ অনুকরনে নয়। ফ্ল্যাট কালচারে নয়, একাকীত্বের জীবনে নয়, স্বার্থপরতার মধ্যে নয়, পাশ্চাত্যের প্রোপ্যাগান্ডামূলক আধুনিক ও উত্তর আধুনিকতার খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিজেকে রক্তাক্ত করার মধ্য দিয়ে নয়। নিজেদের সমস্যাকে আমাদের নিজেদের স্থানিক ও জৈবিক উপকরণ দিয়ে মোকাবিলা করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। পুরনো ঢাকার কৃষ্টি- সংস্কৃতি হোক আমাদের সে আন্দোলনের কেন্দ্র।
({4}�}�I�U�

Related Posts

About The Author

Add Comment