পুরুষের যৌন-হীনমন্যতাঃ একটি তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ

মাসুদ রানা

আমার ধারণা, অধিকাংশ পুরুষ যৌনসঙ্গমের ব্যাপারে স্বার্থপর, আনাড়ি ও  স্বৈরাচারী। আমি নারীবাদী বিভিন্ন লেখিকার লেখা পড়ে বুঝেছি যে, তাঁরা মনে  করেন পুরুষদের যৌনানুভূতি শিশ্ন-ভিত্তিক। নারীর মতো সমগ্র দেহ  যৌন-সংবেদনশীল নয়। আর তাই অধিকাংশ পুরুষ বস্তুতঃ যৌনসঙ্গমে স্বল্পায়ু ও সদা পরাস্ত।

যৌনসঙ্গমে পুরুষের এই পরাজিত মানসিকতাই  তাঁদেরকে কৃত্রিমভাবে যৌনতা-বিরোধী করে তোলে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয়  ডিফেন্স মেকানিজম। এটি পুরুষ-মানসিকতার একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। তাই সে একই  সাথে কামুক ও রক্ষণশীল। নারীর শরীর আবৃত করতে পুরুষের যতো দাবী, নারীর ততো  নয়। কারণ, পুরুষ ভীত – একদিকে হারবার ভয় ও অন্যদিকে হারাবার ভয়।

পুরুষ  নিজের দুর্বলতা ঢাকতে সমগ্র যৌনতাকেই ষ্টিগমাটাইজ করে ট্যাবু তৈরি করে।  তাই, মা ও মেয়ে যতো সহজে প্রজননতা তথা যৌনতা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, পিতা ও  পুত্র তা পারেন না।

পুরুষ শাসিত সমাজে সৃষ্ট  বিধি-বিধান পুরুষের পক্ষে যাবে, এটিই স্বাভাবিক। প্রতিটি ধর্মের অবতার  পুরুষ হওয়ার কারণে ধর্মের বিধি-বিধানও পুরুষের যৌন-হীনমন্যতা ঢাকতে তৎপর,  যদিও কোনো কোনো অবতার এ-বিষয়ে উৎসাহী ও যত্নশীল ছিলেন বলে পুরুষের যৌনসুখ  বৃদ্ধি-কল্পে কিছু-কিছু পরামর্শও দিয়ে গিয়েছেন।

আমি  তো মনে করি, প্রতিটি মানুষের উচিত উপযুক্ত বয়সে যৌনসঙ্গম উপভোগ করা।  প্রতিটি পরিপূর্ণ মানুষের উচিত যৌনসঙ্গমকে শিল্পের ও ক্রীড়ার নিপুনতায় রপ্ত  করা। মানুষের উচিত তাঁর পাওয়া একটি মাত্র জীবনের সীমিত সময়ের মধ্যে যতোদিন  পারে, ততোদিন যৌনসঙ্গমের মাধ্যমে দেহের সুখ অনুভব করা।

মানব  জাতির এহেন সুখের বিষয়কে কারা কবে কালিমালিপ্ত করেছে, সেটি গবেষণার বিষয়।  তবে, এই অঞ্চলে একসময়ে যৌনসঙ্গমের কলাকে যে শিক্ষণীয় মনে করা হতো, তার  সম্ভাব্য উজ্জ্বলতম প্রমাণ মেলে উড়িষ্যার কোনার্ক সূর্যমন্দিরে। কোনার্ক  সূর্যমন্দিরে নর-নারীর যৌনসঙ্গমের চমৎকার সমস্ত ভঙ্গির ভাষ্কর্য করা আছে।  এ-সমস্ত ভঙ্গি অতি শিল্পময় ক্রীড়ানৈপুন্যমণ্ডিত।

যৌনসঙ্গম একটি মহান  মানবিক কর্ম। এটি মানব সভ্যতার ধারক। সুখের উৎস। আনন্দের উৎস। পৃথিবীতে  একমাত্র যৌনসঙ্গমই সাম্যবাদী সুখ, যা কোনো বাড়তি উপকরণ ছাড়াই স্বাভাবিক  মানুষের অতিগুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় প্রবৃত্তি তৃপ্ত করতে পারে।

যৌনসঙ্গম  সংজ্ঞানুসারে অস্বার্থপর। এটি খাদ্যের চেয়ে মহত্তর। খাদ্য একক-ভোগ্য,  কিন্তু যৌনসঙ্গম যুগল-ভোগ্য। স্বাভাবিক যৌনসঙ্গম প্রকৃতিগভাবেই  সহযোগিতামূলক এবং সৃষ্টিশীল। যৌনসঙ্গম যা সৃষ্টি করতে পারে, অন্য কোনো  মানবিক ক্রিয়া তার চেয়ে মহান কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। আমরা জানি, সেই  সৃষ্টির নাম জীবন। মানব জাতির অস্তিত্বের জন্য এখনও পর্যন্ত যৌনসঙ্গম  অপরিহার্য।

সুতরাং প্রতিটি উপযুক্ত মানব-মানবীর উচিত যৌনসঙ্গমকে  উন্নত শিল্পবোধে ও সৌন্দর্যবোধে পরম উপভোগ্য রূপে তাঁর সঙ্গী বা সঙ্গিনীর  সাথে আনন্দ ও সুখ সহভাগের উদ্দেশে যত্নের সাথে উপভোগ করা। বাঙালীর উচিত হবে  যৌনসঙ্গমের ধারণা, আবেগ ও চর্চার ব্যাপারে হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হওয়া।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment