পুস্তক উপাখ্যান

পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম বলেছিলেন, “রুটি – মদ ফুরিয়ে যাবে/প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে/কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা, যদি তেমন বই হয়।” নিয়মিত কোনো না কোনো বই পড়ার চেষ্টা করি। পাশাপাশি বইগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতিমূলক কিছু কথা লিখে রাখতে চেষ্টা করি। এতে যদি একজন পাঠকও বই পড়তে উদ্ধুব্ধ হয়,তাতেই আমার কষ্ট স্বার্থক। তারই ধারাবাহিকতায় বিগত দুই মাসে পড়া বইয়ের রিভিউ এখানে তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। আশা করি, কেউ না কেউ অবশ্যই উপকৃত হবেন।

আগষ্ট মাসের পাঠ উপাখ্যান

১) লা নুই বেঙ্গলিঃ এ বইটি লিখেছেন মির্চা এলিয়াদ। এটি ব্রিটিশ ভারতের প্রেক্ষাপটে রচিত একটি বই, যার মূল আলোচ্য বিষয়বস্তু ভারতীয় ও ইউরোপিয়ান তরুণ- তরুণীর অসম প্রেম কাহিনী। ইউরোপিয়ান যুবক জীবিকার তাগিদে ভারতবর্ষে আসে। ঘটনাচক্রে তার ঠাঁই হয় এক প্রগতিবাদী ভারতীয় পরিবারে। পরিবারটি তাকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু সে এক কৃষ্ণকলির হৃদয়ের বন্ধনে বাঁধা পড়ে যায়, যে কিনা ঐ পরিবারেরই কন্যাসন্তান। পরবর্তীতে নানা ঘাতপ্রতিঘাতের পরে তাদের প্রেম আলোর মুখ দেখতে পায়না। নিকষ কালো অন্ধকারে পর্যবেসিত হয় তাদের প্রেম, সাথে তাদের পরবর্তী দিনগুলোও! এ বিষয়টির জন্য এটিকে একটি ট্রাজেডি প্রেমের উপন্যাস বললে বোধ হয় খুব একটা অত্যুক্তি হবেনা। সার্বিক বিবেচনায় তেমন খারাপ লাগেনি বইটি।

২) এখন তুমি কেমন আছঃ এ বইটি লিখেছেন হরিশংকর জলদাস। দ্বৈত প্রেমের গল্প নিয়ে রচিত এ বইটিতে দুই প্রজন্মের প্রেমের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর লেখা অন্যান্য গল্প-উপন্যাসের মত দুঃখ-দুর্দশা স্থান করে নিয়েছে এ বইটিতেও। তিনি মূলত দেখাতে চেয়েছেন, নরনারীর শাশ্বত প্রেমের গল্পে কীভাবে দারিদ্র বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া যুগের পরিবর্তনে তথা প্রজন্মান্তরে প্রেমের ধরণ, রীতিনীতি কীভাবে বদলে গেছে, তার একটি তুলনামূলক আলোচনাও তুলে ধরা হয়েছে এখানে। ভাষার নিখুঁত গাঁথুনি বইটিকে আলাদা মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।  সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়েছে, এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করার মত উপন্যাস।

৩) পঞ্চতন্ত্রঃ এ বইটি রচনা করেছেন বিষ্ণুশর্মা। এক রাজার পুত্রদেরকে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে পঞ্চতন্ত্র রচিত হয়। পাঁচটি ভিন্নধর্মী গল্পসমগ্রের সমন্বয়ে এটি রচিত হয়েছে। এসব গল্পের সবগুলোই নীতিকথার সমাহার। বাস্তবসম্মত ও জীবনধর্মী, শিক্ষণীয় গল্পকে কেন্দ্র এ বইটি লিখা। এ বইটির একটা লক্ষণীয় বিশেষত্ব হলো, গল্পগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে একটি গল্পের উপসংহার টানবার আগেই উক্ত গল্পের সারাংশ নিয়ে আরেকটি শিক্ষামূলক গল্পের সূচনা ঘটে। এভাবেই এগিয়ে গেছে গল্পগুলো। এ কারণে সবগুলো গল্প পড়া শেষ না করা অবধি জানার একটা আলাদা আগ্রহ মনের ভেতর রয়েই যায়। আমি মনে করি, এটি যেকোনো পাঠকের শুধু পড়ার আগ্রহ তৈরিতে নয়, বরং বৃদ্ধিতেও অনেকাংশে সহায়ক বটে। সবকিছু মিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছে বইটি। ছোট বয়সী পাঠকদের পাঠ উপযোগী করে লেখা এ বইটি সকল বয়সী পাঠকদের কাছেই সমাদৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

৪) লোকরহস্য ও মুচিরাম গুড়ের জীবনরহস্যঃ এটি লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ উপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ব্রিটিশ ভারতের প্রেক্ষাপটে রচিত এ বইয়ে পদবীপ্রেমী বাঙালির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিমায়। তৎকালীন সময়ে একশ্রেণীর লোকের দেখা মিলতো সমাজে, যারা নিজ দেশ-জাতি তথা ব্যক্তিস্বার্থের কথা ভুলে গিয়ে কেবলমাত্র কিছু নামসর্বস্ব পদবীর (যেগুলো অর্থহীন ও কোনো কাজে আসত না!) লোভে ব্রিটিশ সাহেবদের মোসাহেবি করতে দ্বিতীয় বারও ভাবত না। এ ধরনের মানুষকে সার্ফেক্সেল দিয়ে ধবল ধৌতকরণের কাজটি বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছেন তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র। ভাষাশৈলী বেশ ভালো লেগেছে। মাঝেমধ্যে হাসির উদ্রেক ঘটেছে বইটি পড়ে।

৫) আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরিঃ এটি আসলে জার্মান ভাষায় লিখিত একটি দিনপঞ্জির সংকলন। বাংলাতে এটির তর্জমা করেছেন এনায়েত করিম। মূল বইয়ের লেখক আনা ফ্রাঙ্ক নামক জার্মান কিশোরী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে এ বইটি লেখা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে জার্মানিতে হিটলার ও তার বাহিনী ইহুদি সম্প্রদায়ের উপরে নানাভাবে অত্যাচার করে। তাদের ভেতর বেশিরভাগই অত্যাচারের কারনে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এ বইটিতে এক জার্মান কিশোরী তার বন্দী জীবনের নানা গল্পের অত্যন্ত চমৎকার ভাষারূপ দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে এনেছেন। বন্দী সময়ে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার সরস বর্ণনার পাশাপাশি তার জীবনের স্বপ্ন, প্রেম, রোমান্স, অভিসার, দর্শন কী নেই সেখানে। খুবই অবাক লাগে এই ভেবে যে একজন ত্রয়োদশী কিশোরীর কলমের আগায় কী করে এমন সাহিত্যপ্রতিভা লুকায়িত ছিল! ব্যক্তিগত জীবনে আনা একজন সুলেখিকা/সাংবাদিক হয়ে সারা বিশ্বে নাম করতে চেয়েছিল। গেষ্টাপো বাহিনীর নির্মমতার বলি হবার কারণে তার এ ইচ্ছেটা অপূর্ণ-ই রয়ে গেছে। তৎসত্ত্বেও তার ডায়েরি তাকে পাঠকের মনে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল ধরে। বেঁচে থাকুক আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি, পাঠকের বুকে যুগ যুগ ধরে অক্ষত থাকুক তার নাম।

৬) যারা ভোর এনেছিলঃ এ বইটি লিখেছেন হালের বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। ইতিহাস নির্ভর এ বইটিকে ঠিক ইতিহাসের প্রামাণ্য কোনো গ্রন্থ বলে আখ্যা দেয়া চলে না। বরং এটিকে ইতিহাসের আশ্রয়ে রচিত একটি উপন্যাস বলাই অধিকতর শ্রেয়। পাশাপাশি এ কথাও অনস্বীকার্য যে এ বইটিতে ঐতিহাসিক সত্যকে যথাসম্ভব অবিকৃত রাখা হয়েছে। এখানে মূলত উপমহাদেশ ভাগ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলনের সময়কালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বাঙালিদের অবদান বেশি ছিল। পরবর্তীতে এসব বাঙালি নেতারাই বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মদানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এরাই আসলে এ দেশের স্বাধীনতার আলোক মশাল জ্বেলেছিল প্রতিটি বাঙালীর মনে। সবকিছু মিলিয়ে অনেক ভালো মানের বই। আশা করি, কেউই নিরাশ হবেন না বইটি পড়লে।

৭) বঙ্গবন্ধুর অপ্রকাশিত চিঠিপত্রঃ বঙ্গবন্ধুর লেখা ও বঙ্গবন্ধুকে লেখা মোট ৯৫টি চিঠির অখণ্ড সংকলন গ্রন্থ এটি। সম্পাদনা করেছেন ড. সুনীল কান্তি দে। চিঠিপত্র মানুষের মানসিকতার পরিচায়ক। মানুষের দর্শন, জীবনবোধ, সমাজ, রাজনৈতিক আদর্শ প্রভৃতির ছাপ ফুটে ওঠে চিঠিতে। এ বইটিতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এ দিক বিবেচনায় ব্যক্তি শেখ মুজিবকে চিনতে হলে এ বইটি বেশ সহায়তা করবে বলে আমার ধারণা। বইটিতে প্রকাশিত বেশিরভাগ চিঠিই তৎকালীন পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনী কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ফলে বেশিরভাগ চিঠিই বেশ পর্যন্ত প্রাপকের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছায়নি আর। সবকিছু মিলিয়ে বেশ দারুণ একটি বই।কেউ বইটি পড়লে হতাশ হতে হবেনা।

৮) ঘরে-বাইরেঃ এ উপন্যাসের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বঙ্গভঙ্গ পরবর্তীকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এটি লেখা হয়েছে।বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ভারত উপমহাদেশে স্বদেশী আন্দোলনের সূচনা ঘটে। সে সময়ে এ আন্দোলনের পক্ষপাতীরা বিদেশী পণ্য বর্জন করে।কারো কাছে বিদেশী পণ্য পাওয়া গেলে তা লুট করে জ্বালিয়ে দেয়া হত। উক্ত ব্যক্তির উপরে নেমে আসত অত্যাচারীর খড়গ। এতে করে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ করে ক্ষতির সম্মুখীন হত। দেশি পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল।বিদেশি পণ্য পুড়িয়ে দেয়া হলে তার ক্ষতিপূরণ দেয়া হত না। এ কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়, যা তাদের দুঃখ-দুর্দশাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। এ ব্যাপারটিকেই তীব্র ব্যঙ্গোক্তির মাধ্যমে তুলিয়ে ধরা হয়েছে উপন্যাসটিতে। সবকিছু মিলিয়ে, বেশ ভালোই লেগেছে বইটি আমার। জানিনা,অন্যদের কেমন লাগবে!

সেপ্টেম্বরের রোজনামচা

 

) বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্রঃ বাংলা ভাষার অবহেলার ইতিহাস নিয়ে রচিত এ বইটির লেখক বাংলা সাহিত্যের প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে পৃথিবীতে একমাত্র বাঙালি জাতিকেই মাতৃভাষাকে সমুন্নত রাখবার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পরে ভাষার সম্মান রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি বিভিন্ন কারণে। শত চেষ্টা সত্ত্বেও নিজেদের সদিচ্ছার অভাবে সর্বত্র আমরা আজও বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারিনি। এছাড়া বিদেশী ভাষার ব্যবহারে  নিজেদের মর্যাদা বাড়ে— এ রকম মনোভাব আমাদের মাঝে প্রচলিত আছে। এসব ব্যাপারগুলোই হুমায়ুন আজাদের লেখনীতে উঠে এসেছে। বিভিন্ন পত্রিকাতে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে তিনি এসব ব্যাপারগুলো তুলে ধরেছেন পাঠকদের সামনে। সার্বিক বিবেচনায় মন্দ লাগেনি বইটি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এটি আমার পঠিত হুমায়ুন আজাদের প্রথম বই, যেখানে অশ্লীলতার কোনো প্রয়োগ নেই।

) তুমিও জিতবেঃ এটি লিখেছেন ভারতীয় লেখক শিব খেরা। মূল বইয়ের নাম “You can win”, যার বাংলা রূপ দিয়েছেন শ্রী একে সামন্ত। অনুপ্রেরণাদায়ক এ বইটিতে জীবনে সাফল্য অর্জনের বিভিন্ন দিক অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিবৃত করা হয়েছে। একজন সফল মানুষের আচার-ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত, সে ব্যাপারেও আলোকপাত করা হয়েছে বেশ ভালোভাবেই। এক কথায়, নিত্যনতুন অনেক কিছুই শিখতে পেরেছি বইটি পড়ে। এছাড়া নিজের আত্মবিশ্বাসও অনেকটাই বেড়ে গেছে আগের তুলনায়। উল্লেখ্য যে, বইটি আগে থেকে পড়া হয়নি বলে জাতি কি আমাকে মেনে নিবে কিনা, সে ব্যাপারে দ্বিধায় আছি। যা হোক, সব মিলিয়ে দারুণ লেগেছে আমার কাছে।

) নিষিদ্ধ লোবানঃ এ বইটির রচয়িতা সৈয়দ শামসুল হক। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে এ বইটি রচিত হয়েছে। লোবান শব্দের অর্থ লাশ। (আমি নিশ্চিত নই। ভুল হতে পারে।তবে পুরোপুরি সঠিক না হলেও কাছাকাছি কোনো অর্থ হবে।) মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকবাহিনী পশুহত্যার মত বাঙালি নিধন করে। শুধু নির্মম অত্যাচার আর নির্বিচারে বাঙালি নারী-পুরুষ,আবালবৃদ্ধবনিতা হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি; তাদের সৎকার্যটুকুও অন্যদেরকে করতে পর্যন্ত দেয়নি, নিজেরা করা দূরে থাক! বিহারী যুবাদের সহায়তায় তারা নিশ্চিত করেছে যে কেউ যেন এসব লাশ দাফন বা দাহ না করতে পারে। রাতের আধারে শেয়াল-কুকুরেরা টেনে নিয়ে গেছে মৃতদেহগুলো। শকুনের ঠোকরে খুবলে গিয়েছে তাদের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সৈয়দ শামসুলের সুনিপুণ তুলির আঁচড়ে খানসেনাদের এসব বর্বরতার চিত্রগুলোই (যা মধ্যযুগীয় ও নাৎসিদের বর্বরতাকেও হার মানায়!) উঠে এসেছে বইটির শ্বেতশুভ্র ক্যানভাসে। এছাড়া সকল ভয়,উদ্বেগ, নির্মমতা, জীবনের প্রতি পিছুটানকে ছাপিয়ে অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ববোধ স্বীয় মর্যাদার আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছে নিজ যোগ্যতাবলে।  সবকিছু মিলিয়ে বেশ ভালোই লেগেছে। সবচেয়ে ভালো লাগার ব্যাপার হচ্ছে, ইতিহাসের উপাদান ব্যবহার করা হলেও এ দেশীয় বিভিন্ন ইতিহাসভিত্তিক বইয়ের ন্যায় ইতিহাসের বিকৃতি ঘটেনি কোথাও। আশা করি, অন্যান্য পাঠকেরাও অনেক উপকৃত হবেন বইটি পড়লে।

৪) The rape of Bangladesh: এ বইটি লিখেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখক Anthony Mascarenhas. পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় ভাষান্তর করেছেন রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী। ভারত উপমহাদেশ বিভক্তিকাল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, ২৪ বছরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বেশ চমকপ্রদ ভাষায় বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে। নরহন্তক পাকবাহিনীর নৃশংসতার চিত্র এখানে সেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়নি। বরঞ্চ তৎকালীন পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার চিত্র ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এ লেখক। বিদেশী লেখক হলেও তার লেখাতে ইতিহাসের অপব্যাখ্যা বা ইতিহাস বিকৃতির মত তেমন কিছু চোখে পড়েনি খুব একটা। এছাড়া কোনো বিশেষ পক্ষের প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক কিছু খুঁজে পাইনি বইটির কোথাও। সবকিছুর সমন্বয়ে যে কারো পড়ার মত ভালো একটি বই ছিল।

৫) দেশে-বিদেশেঃ এটি সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত একটি ভ্রমণ কাহিনী। ভ্রমণ কাহিনী হলেও এখানে শুধু কোনো স্থানে ঘুরাঘুরির গল্পই বর্ণিত হয়নি; এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতি ইত্যাদি ব্যাপারগুলোও উঠে এসেছে লেখনীতে। ব্যক্তিগত জীবনে লেখক অনেক দেশে গিয়েছেন বিভিন্ন কারণবশত। এ বইটিতে আফগানিস্তান ভ্রমণের ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে। এ দেশের বিভিন্ন ব্যাপারগুলি লেখকের অসাধারণ লেখনশৈলীর মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বইটির পাতায় পাতায় ঠাঁই পেয়েছে। সার্বিক বিবেচনার এটি আমার দেখা সৈয়দ মুজতবার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম। আশা করি, অন্যদেরও ভালো লাগবে বইটি।

৬) সূর্যমুখীঃ এ বইটি লিখেছেন শাম বারিকপুরী। জন্মসূত্রে ভারতীয় এ লেখক উর্দুভাষায় সাহিত্য রচনা করতেন। পরবর্তীতে এ বইটির বাংলা ভাষারূপ প্রদান করেছেন অরণ্য আপন।  আমাদের সমাজে বিদ্যমান অসঙ্গতিসমূহ এ গ্রন্থের মূল আলোচ্য বিষয়বস্তু। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কত না অসঙ্গতি! এগুলোর জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। আমাদের নিজেদের কিছু ছোট ছোট ভুলের কারণে এক সময় বড়সড় মাশুল গুণতে হয়। অথচ চাইলেই আমরা আগে থেকেই এ ব্যাপারে সতর্ক হতে পারি, যাতে এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপারগুলোর পুনরাবৃত্তি না ঘটে বারংবার। এককথায় অসচেতন মানুষকে সচেতন করে তোলাই এ ধরনের বই রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য।  এদিক থেকে লেখক সার্থক বলে আমার বিশ্বাস। সবকিছু মিলিয়ে বেশ দারুণ লেগেছে আমার! আশা করি, বাকি পাঠকেরা কেউ পড়লে নিরাশ হতে হবেনা।

৭) দর্শনঃ এ বইটির রচয়িতা আহমেদ লিপু। নাম দেখলেই এ বইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে অনুমান করা যায় খুব সহজেই। দর্শনশাস্ত্রের নানা নীতিকথা ঠাঁই পেয়েছে এ বইটিতে। এর মধ্যে কোনোটি কয়েক লাইন মাত্র, আবার কোনোটি কয়েক পেজ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে। এগুলোর প্রত্যেকটি অনেক বেশি বাস্তবসম্মত, যা জীবন চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে। বইটি আকারে বেশ ছোট আকৃতির হলেও (মাত্র ৪৭ পেজ) পাঠ্যসূচির গুরুত্বের দিক দিয়ে এটি মোটেও হেলাফেলার কোনো কিছু নয়। সবকিছু মিলিয়ে মন্দ লাগেনি বইটি আমার। তবে যারা তাত্ত্বিক কথাবার্তা কম পছন্দ করেন বা একেবারেই পছন্দ করেন না, তাদের কাছে এটি ভালো নাও লাগতে পারে।

৮) কুয়াশায় শাদা মেঘঃ এ বইটি লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে এক ছেলের জবানিতে পুরো উপন্যাসের গল্পটি সাজানো হয়েছে। উপন্যাসটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এক সংগ্রামী বাঙালি নারীর জীবনের গল্প, যাকে বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতির পাশাপাশি নিজের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথেও নিয়ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। একটা সময়ে একজন নারী জয়ী হয়, কিন্তু পুরস্কার ভোগ করবার সময় পায়না। আজীবন সংগ্রামের ফসল ভোগ করে তার নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানেরা। এদের একটা অত্যন্ত সাধারণ মানের সাদামাটা স্বপ্ন থাকে, যা তাদের বেঁচে থাকার ফুয়েল হিসেবে কাজ করে। এসব স্বপ্নপূরণে কখনো কখনো তৃতীয় কোনো পক্ষের ভূমিকা দরকারি হয়ে উঠে। এসব অত্যন্ত বাস্তবিক ব্যাপারগুলো এ বইটিকে স্বতন্ত্র মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে, বেশ ভালো লেগেছে বইটি। আশা করি, বাকিরাও সন্তুষ্ট হবেন বইটি পড়ে।

৯) আবদুল্লাহঃ বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এ বইটি লিখেছেন কাজী ইমদাদুল হক। প্রথম ৩০ পরিচ্ছদ লিখবার পরে কাজী ইমদাদুল হক মাত্র ৪৪ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। পরে ১৯৩৩ সালে এটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। জাতিগতভাবে আমরা যারা একই সাথে বাঙালি ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা, তারা অনেক বেশি ধর্মভীরু। যথাযথভাবে ধর্মপালনের ব্যাপারে আমরা এত বেশি  আগ্রহী যে আগ্রহভার সইতে না পেরে কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি হরহামেশাই। একদল লোক মানুষের ধর্মভীরুতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেকে এটির উপরে ভর করে সমাজে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়। এর বাইরেও একদল লোক পাওয়া যায়, যারা সময় ও সমাজ সচেতন। তারা কখনই ধর্মব্যবসায়ীয়ের মত ধর্মকে মানবতার উপরে স্থান দেয়না। “মানুষের জন্যেই ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়” — এটা তাদের মূল দর্শন। এসব ব্যাপারগুলিই এ সামাজিক উপন্যাসটিতে তুলে ধরা হয়েছে। উপন্যাসটির নাম চরিত্রের মধ্য দিয়ে একজন প্রতিবাদী যুবকের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাহিত্যকর্মের চরিত্রের দিক দিয়ে এ চরিত্রটি কেবল “আনোয়ারা” উপন্যাসের নুরুল ইসলামের সাথেই সমানভাবে তুল্য।সবকিছু মিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছে বইটি আমার।আশা করি, কেউ নিরাশ হবেন না।

১০) প্রণয় পঙক্তিঃ এ বইটির রচয়িতা বুলবুল সরওয়ার। কাব্যিক ভঙ্গিমায় রচিত এ বইটিকে প্রচলিত অর্থে ঠিক কাব্যগ্রন্থ বলাটা বোধহয় সমীচীন হবেনা তেমন। চার লাইনের প্রায় দুইশয়ের মত ছোট ছোট পঙক্তিমালা নিয়ে এ বইটি লেখা। মূলত প্রেমের সাথে মানবদেহের পারস্পরিক সম্পর্ক এখানে ফোকাস করা হয়েছে। এককথায়, এ বইয়ের আলোচিত বিষয় আত্মিক প্রেম নয়, দৈহিক প্রেম। আলোচ্য বিষয়বস্তু বিতর্কিত ইস্যু হলেও বইটির সাহিত্যরস ও রচনাশৈলী বেশ ভালো মানের,যা চলতি বিতর্ককে অতিক্রম করে যেতে সক্ষম। পুরো বই জুড়েই ছন্দকারের আপন মনের গোপন ছন্দটি বেজে চলেছে নিত্যতালে। এসব কিছু মিলিয়ে বেশ ভালো মানের তথা পড়বার মত একটি বই।আশা করি, খারাপ লাগবেনা কারোরই।

১১) ব্রহ্মপুত্রের পাড়েঃ এ বইটি লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের সমসাময়িক কালের নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন। বইটিতে মূলত দুই সহোদরার অতীত স্মৃতিচারণ অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পূর্ববঙ্গে প্রবাহমান ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে ধাবিত হয় এ দুই বোনের শৈশব-কৈশোরের গল্পগুলি। পাশাপাশি, জগত সংসারে একজন বাঙালি নারীকে কী পরিমাণে লড়াই-সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়, সে ব্যাপারটিও বাদ পড়েনি এ লেখনীতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, খোলামেলা শব্দচয়ন ও অশ্লীলতার জন্য তসলিমা নাসরিন যে একজন বিতর্কিত লেখিকা, এ সম্পর্কে আমরা সকলেই কম/বেশি অবগত। তার প্রায় সকল বইতেই এর সত্যতা মেলে। এতদসত্ত্বেও তুলনামূলক বিচার করা হলে এ বইটিতে এরকম কোনো কিছু আমার চোখে পড়েনি। সার্বিক বিচারে বইটির গল্প ও ভাষাশৈলী অনেক বাস্তবসম্মত ও ভালো মানের বলে প্রতিভাত হয়েছে আমার কাছে। জানিনা, বাকিদের কাছে কেমন লেগেছে (বা লাগবে)!

১২) শ্রেষ্ঠ গল্পঃ আবদুস শাকুর রচিত গল্পসমূহের মধ্যে বাছাইকৃত ১০টি গল্প নিয়ে এ বইটি সাজানো হয়েছে। গল্পগুলোর সুনির্দিষ্ট কোনো একক বিষয়বস্তু নেই। নানা ঢঙের, নানা রসের গল্পগুলো আলাদা ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে। এর মধ্যে কোনোটি সমসাময়িক কাল নিয়ে লেখা, কোনোটিতে রয়েছে প্রতারিত হবার গল্প। আবার কোনোটিতে তুলে ধরা হয়েছে পারিপার্শ্বিকতার দরুন ব্যর্থতার শিকার হওয়া মানুষের গল্প। শুধু তাই নয়, নরনারীর প্রণয়োপাখ্যানের গল্প পর্যন্ত বাদ পড়েনি এ তালিকা হতে। এসব কিছু মিলিয়ে বেশ দারুণ একটা বই। তবে হলফ করে বলা যেতে পারে যে জগাখিচুড়ির সৃষ্টি হয়নি কোথাও।

১৩) জীবন যে রকমঃ এ গ্রন্থটির লেখিকা আয়েশা ফয়েজ। লেখিকা হিসেবে তার তেমন কোনো পরিচিতি না থাকলেও তাঁর গর্ভজাত সন্তানেরা স্ব স্ব জায়গায় খুব ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত। তার লেখা দিনপঞ্জিকার উপরে ভিত্তি করে এ বইটির পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা হয়েছে। বইটিতে লেখিকা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তার তিনজন জনপ্রিয় সন্তানের শৈশব-কৈশোরের নানা অজানা তথ্য স্থান করে নিয়েছে বইটির প্রতিটি পাতায় পাতায়। উল্লেখ্য যে, তাঁর স্বামীর মধ্যেও লেখালেখির ঝোঁক বেশ প্রবল ছিল, যা বংশানুক্রমে তার তিন ছেলের উপর বর্তেছে। বইটির ভাষার গাঁথুনি বেশ সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ছিল। পাশাপাশি পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখবার একটা প্রকৃতিপ্রদত্ত ব্যাপার ছিল।একনাগাড়ে না পড়ে পারিনি। সবকিছু মিলিয়ে, বেশ ভালোই লেগেছে আমার কাছে।

১৪) ময়ূরকণ্ঠীঃ এটি লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা রম্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলী। ছোট-বড় অনেকগুলো গল্পের সার্থক সম্মেলন এ গল্প সংকলন। বিভিন্ন স্বাদের ও বিভিন্ন ধাঁচের একেকটি গল্প পাঠককে দিবে আলাদা অভিজ্ঞতার সুযোগ। মূলত গল্পগুলোতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সমাজ,সংস্কৃতি,ঐতিহ্য,ভাষা,সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়গুলোর তুলনামূলক তথ্যবহুল আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। বলতে কোনো দ্বিধা নেই, গল্পগুলো নিছক কোনো গল্প নয়, বরঞ্চ অনেক বেশি তথ্যবহুল। এ কারণে একজন পাঠক বইটি পড়লে আনন্দলাভের পাশাপাশি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সমাজ ও সংস্কৃতির অনেক বিষয়েই যে জ্ঞানলাভ করতে সক্ষম হবেন, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এছাড়া উক্ত লেখকের লেখনীর মানের ব্যাপারে কিছু বলবার মত ক্ষমতা আমার মত অতি ক্ষুদ্রজ্ঞানীর ভাণ্ডারে নেই। শুধু বলবো, লেখকের স্বভাবজাত লেখনী সবকিছুকে ছাপিয়ে বইটিকে আলাদা সৌন্দর্য দান করেছে, যা তাকে করে তুলেছে অনন্য। যা হোক, বইটি আমার কাছে দারুণ লেগেছে। আশা করি, বাকিদেরও ভালো লাগবে অনেক।

Related Posts

About The Author

Add Comment