প্রগতির পদাতিক: সোমেন চন্দ

সোমেন চন্দ একজন প্রজ্ঞাবান মার্কসবাদী এবং নিষ্ঠাবান সংগঠক। এই কমিউনিষ্ট এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী নেতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি একজন জীবনবাদী লেখক। যিনি তার কলমে ধারণ করেছিলেন মেহনতি মানুষের জীবনগাঁথা।প্রগতির জন্য আমৃত্যু কাজ করেছেন তিনি।

প্রগতির পদাতিক সোমেন চন্দ ১৯২০ সালের ২৪ মে তৎকালীন বৃহত্তর ঢাকা জেলার আশুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর বাবার নাম নরেন্দ্র কুমার চন্দ। মাতার নাম হীরণ বালা। সোমেন চন্দের পৈত্রিক নিবাস বর্তমান নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার বালিয়া গ্রামে। যদিও বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত জীবনী গ্রন্থমালায় ( হায়াৎ মাহমুদ সম্পাদিত) বলা হয়েছে সোমেন চন্দের জন্ম বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ে অবস্থিত জিন্জিরার ধীতপুর গ্রামে। সোমেন চন্দের মায়ের নাম অজ্ঞাত যিনি প্রসব ব্যাথায় মারা যান, বলে উক্ত বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সোমেন চন্দের বৈমাত্রেয় ভাই কল্যাণ চন্দের কাছ থেকে জানা যায়, সোমেনের মায়ের নাম হীরণবালা, যিনি কলেরায় মারা যান। সোমেনের বয়স তখন মাত্র চার।

সোমেনকে দেখা শোনার জন্য তার বাবা নরেন্দ্র কুমার চন্দ দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। ছোট মা সরোজহাসিনী বিশ্বাস তথা সরযূবালাকে নিজের মা হিসেবেই জানতেন। সোমেন তাকে এত ভালোবেসেছেন যে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসের পাভেলের মা’ র সাথে নিজের মাকে এক করে দেখেছেন। বাবা নরেন্দ্র কুমার চন্দ মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলের স্টোর কিপার ছিলেন। তাঁর বেতনের টাকায় টেনেটুনে সংসার চলত।

শৈশব থেকে জেদি সোমেনকে খাওয়ানোর সময় মামা- দাদিকে গল্প বলতে হতো। সপ্তম – অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন বাই- সাইকেলের বায়না ধরেছিল, যা তার বাবা পূরণ করেছিল। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এ সাইকেল ছিল তার সর্বকালীন সঙ্গী। ১৯ ৩৬ সালে পোগোজ স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাশের পর তাকে ভর্তি করানো হয় মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলে। যদিও তিনি ডাক্তারি পরতে রাজি ছিলেন না। পারিবারিক চাপেই তাকে মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হতে হয়েছিল। মাত্র একবছর পড়ার পর তিনি পরীক্ষা দিলেন না। তার বাবার সাথে পরামর্শ করে ডা. লিল্টন তাকে পাশ করে দিতে চাইলেন।কিন্তু তখন তার মনে একটাই ভাবনা, কিভাবে মেহনতি মানুষের মুক্তি মিলবে?

সোমেনের মনে বিপ্লবী চিন্তার বীজ বপন করেছিলেন তার বাবা নরেন্দ্র কুমার। স্বদেশী যুগের মানুষ নরেন্দ্র কুমারের কাছেই সোমেন জেনেছিল বিপিনচন্দ্র পাল,সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, চিত্তরন্জন দাশ, বিপ্লবী ক্ষুদিরাম সম্পর্কে। অফিস শেষ করে রাত করে বাড়ি ফিরতেন নরেন্দ্র কুমার। অফিসের পাশে অবস্থিত ঔষধের দোকানে পত্রিকায় দেশ – বিদেশের খবর পড়তেন, ব্যাখা করে অন্যদের শোনাতেন। তার দক্ষিণ মৈশন্ডির ভাড়া বাসা ছিল,বিপ্লবীদের নিরাপদ ঠিকানা। সরকারী চাকুরের বাসায় বিপ্লবীদের যাতায়াত ভাবা যায়! কিন্তু সোমেন উদ্বিগ্ন ছিল না। সে নিজেও বই পড়ার আগ্রহ থেকে বিপ্লবীদের সাথে মিশতে থাকে।

খুব অল্প বয়সেই সোমেন বিশ্বসাহিত্যের অনেক নামী লেখকের বই পড়ে ফেলে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দস্তয়েভস্কি,হেমিংওয়ে,কডওয়েল,বার্নাডশ,মানেকশ প্রমুখ। ১৯৩৭ সালে তিনি লিখেন তার ছোটগল্প’ শিশু তপন’ যেটি সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এবছরই তিনি বন্যা নামে তার একমাত্র উপন্যাস লিখেন। তার লেখা ছোটগল্পের সংখ্যা ২৫ টি,নাটক ২ টি,কবিতা চারটি (সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে)। সোমেন চন্দের ইঁদুর নামক ছোট গল্পটি বহুভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর এ ছোটগল্পটি বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়।

সোমেন চন্দের লেখায় অনুপ্রাণিত হয়েছে, বাংলাসাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’  এবং সেলিনা হোসেনের ‘নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি’ উপন্যাসে সোমেন চন্দকে তুলে ধরা হয়েছে।তাঁর মৃত্যু পর কলকাতা বাংলা একাডেমী সোমেন চন্দ পুরস্কার চালু করে। কমিউনিষ্ট পাঠচক্রের( গোপন) সূত্রে সোমেন চন্দের পরিচয় হয়,আন্দামান ফেরত বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশীর সাথে। তার কাছে পাঠ নেন মার্কসীয় দর্শনের। ক্রমেই পরিচয় হয় রণেশদাশ গুপ্তসহ বামপন্থি বিপ্লবী নেতাদের সাথে। কমিউনিষ্ট পাঠচক্রের প্রকাশ্য শাখা প্রগতি পাঠাগার, যেটি জোড়পুল লেনে ছিল। সেখানেই সোমেন পড়তেন। বিপ্লবী করৃনকান্ডের অংশ হিসেবে স্থাপিত হয় বিপ্লবী লেখক সংঘ, সোভিয়েত সুহৃদ সংঘ। সোমেন রেল শ্রমিকদের ইউনিয়নে তাদের জন্য কাজ করতে থাকে। কখনো কখনো ঢাকার পাশ্ববর্তী গ্রামে গিয়ে অসহায় মানুষদের খোজ নিতেন। গুরু সতীশ পাকড়াশী সোমেনকে বলেছিল,বিপ্লব কেবল আন্দোলন করেই হয় না। লেখালেখির মাধ্যমেও বিপ্লব আনা যায়। সোমেন গুরু কথা অনুযায়ী গণসাহিত্য রচনা করেছিল।প্রাত্যহিক আড্ডায় তা পড়ে শুনাত।

১৯৪২ সালে ৮ মার্চ রেলশ্রমিক নিয়ে ফ্যাসিবাদ বিরোধী মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিল সোমেন চন্দ।সুত্রাপুরের সেবাশ্রমের নিকট কমিউনিষ্টদের আরেক দল ষন্ডারা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে।তাকে মাথায় আঘাত করা হয়,চোখ উপরে নেয়া হয়,নাড়ীভুঁড়ি ছিটিয়ে দেয়া হয়। মাত্র ২১ বছর ১৫ দিনের মাথায় প্রগতির পদাতিক সোমেন চন্দের জীবনাবসান হয়,সেদিন তার রক্তাক্ত হাতে ছিল,কমিউনিষ্টদের লাল পতাকা।

লেকচার নোট

১১৩ তম পাবলিক লেকচার।

বক্তা: মো: নুরুন নবী মিল্লাত, শিক্ষার্থী দর্শন বিভাগ, ঢা. বি.।

 

 

Related Posts

About The Author

Add Comment