পড়া কি, পড়া কেন

“পৃথিবীতে কিছু ব্যাধি আছে যার ওষুধ নেই। যেমন ক্যানসার, পাঠব্যাধি। পাঠব্যাধিতে আক্রান্তজনকে কিছু না কিছু পড়তেই হবে। পড়ার কিছু না থাকলে মনে হবে, মরে যাই। অতি অল্প বয়সে আমি এমন এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলাম। প্রচণ্ড পড়ার ক্ষুধা।”

বলপয়েন্ট, হুমায়ূন আহমেদ

আমরা আগে ‘পড়া’ নিয়ে বাতচিত করি চলেন- আগে প্রশ্ন করি, পড়া কি?

পড়া কবে থেকে শুরু? আমি মনে করি মানব সভ্যতা এবং পড়া পিঠাপিঠি করে বড় হয়েছে, আজকের জায়গায় এসে পৌছেছে। আমাদের আদি পিতা মাতারাও এর সাথে পরিচিত ছিলেন। এই যে ধরুন আকাশ মেঘলা থেকে বুঝতে পারা এটাও তো পড়ার অন্তর্ভুক্ত। পড়া ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে বেশি ফারাক নাই এবং এটা সৃষ্টির আদিতে আরও কম ছিল।

আরও এগিয়ে গিয়ে যদি বলতে চাই তাহলে আমি বলবো অনেক আগে থেকেই মানুষ বই লিখে আসছে, বর্ণমালা সৃষ্টির অনেক আগেই। এই যে গুহাবাসী আমাদের পূর্বপুরুষরা বিভিন্ন আঁকাআঁকি করেছেন পাহাড়ের গায়ে, গুহার অন্ধরে এ সবই তাদের মনের কথা প্রকাশের একটি ভাষা, হউক বা সেগুলো অনেক কাঁচা, অসম্পূর্ণ বা অপূর্ণ। এখনকার গবেষকরা, প্রত্নতত্ত্ববিধরা সেই সব গুহাচিহ্ন থেকে, পাথরখন্ড থেকে, হাতিয়ারের ধ্বংসাবশেষ থেকে ইতিহাস লিখছেন। আমরা পড়ছি সেই সব পূর্বসুরীদের কথা।

পড়া বলতে আমরা কি বুঝি?

পড়া বলতে আমরা কোন বই পড়াকে বুঝাতেই থাকতে হবে আলোচনা ছোট রাখার জন্য। তা না হলে এটা অনেক বড় হয়ে যাবে, অনেক দূর প্রশস্ত হয়ে যাবে। এখনকার দিনে পড়া অনেক বিস্তৃত হয়েছে। এই যে একটা সিনেমা দেখা সেটা কেন পড়ার অন্তর্ভুক্ত হবে না? একটা নাটকের পারফর্মেন্স দেখা সেটা কেন অন্তর্ভুক্ত হবে না? কিছু গেমস আছে যেখানে আপনাকে পড়তে হয়। আছে ইন্টারনেট, ব্লগ, ওয়েবসাইটস্, কিন্ডল, ইবুক, পিডিএফ।

পড়া আবার পরিচয় ও বটে। পড়ার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন অজানা ও বৈচিত্র্যময় জগতের সাথে আসলে পরিচয় লাভ করি। পড়ার মাধ্যমে আমরা অভ্রমণযোগ্য অতীতে ভ্রমণ করতে পারি আবার সুদূঢ় ভবিষ্যতেও গমন করতে পারি। পড়া যেন একটা টাইম মেশিন। সেই টাইম মেশিনে করে আমরা বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন যুগে ভ্রমণ করতে পারি, দেখতে পারি সেই সব যুগের মানুষের জীবনাচার, সভ্যতার রূপ।

পড়তে হবে কেন?   

Why we need to read?

To have a deep knowledge about the past, better understanding of the present and to have a deep insight about the future we need to read.

অতীতের গভীর জ্ঞান, বর্তমানের ভাল বুঝ এবং ভবিষ্যতের গভীর ইনসাইট লাভ করার জন্য আমাদেরকে পড়তে হবে। পৃথিবীর তাবৎ অভিজ্ঞতা বইয়ে লিপিবদ্ধ আছে। আমরা বই পড়ার মাধ্যমেই পৃথিবীর সাথে আমাদের সম্পর্ক গড়তে পারি এবং আমাদের অবস্থান নির্ণয় করতে পারি এবং সে অনুযায়ী আমাদের কাজ সম্পাদন করতে পারি এবং পৃথিবীতে আমাদের স্বাক্ষর রেখে যেতে পারি।

Reading is like taking bath in a fountain which cleanse and purifies one’s mind and soul.

We need to read to increase our experience and expertise on the world we are living. We need to develop our experience so that we can do well to the world and to ourselves.

পড়তে হবে জানার জন্য, জানতে হবে করার জন্য, করতে হবে ভালোর জন্য। নিজের জন্য, দেশের জন্য,মানুষের জন্য, মানবতার জন্য।

Read to know, know to act, and act to be better. Better for you, your country, and your people.

আমাদের পড়তে হবে অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্য। মানুষ কি বয়সে আসলে বড় হয়? হ্যা বয়সে শারীরিকভাবে বড় হয়। কিন্তু মানসিকভাবে বড় হয় বেশি অভিজ্ঞতা লাভের ফলে। আশে পাশের জীবন দেখে মানুষ বড় জোড় অল্প বিস্তর অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। কিন্তু বিস্তৃত অভিজ্ঞতা লাভ করতে গেলে, এই যে ধরেন চার হাজার বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গেলে বইয়ের কাছে যেতেই হবে। বইয়ের মধ্যেই চারহাজার বছরের ইতিহাস পাওয়া যাবে।

যে যত বেশি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সে তত বেশি জ্ঞানবান। এবার সে অভিজ্ঞতা, সে জ্ঞান কি মানুষের কল্যানে না অকল্যাণে ব্যবহার করা হবে সেটা ভিন্ন ডিসকোর্সের আলোচনার বিষয়। এই যে অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বললাম এটা নিয়ে একটা মজার কথা শুনুন জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের কাছ থেকে। তিনি বলছেন, ‘অভিজ্ঞতা হলো অনেক ভালো স্কুল, কিন্তু এর ফি অনেক চড়া।’

‘Experience is a good school, but the fees are high’.—Heinrich Heine

কিছু দার্শনিক প্রশ্ন সব যুগের ভাবুক-চিন্তকদের ভাবিয়েছে। এমন কয়েকটা প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আমি কে?’ ‘এই বিশ্ব চরাচরে আমার অবস্থান কোথায়’, ‘আমি কোথায় যাচ্ছি বা যাবো’, মানুষের আল্টিমেট পরিণতি কি’ ইত্যাদি। এরূপ প্রশ্ন ধর্ম ও দার্শনিকতা সব ক্ষেত্রেই এসেছে এবং সেই সৃষ্টির শুরু থেকে শুরু করে মানুষ এখন পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে বেড়াচ্ছে। একেকজন একেকভাবে সেই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়েছে আবার উত্তর খোঁজতে গিয়ে হয়তো অনেকে হারিয়েও গেছে গোলকধাঁধায়।

সভ্যতাকে যদি আমরা একটা বিশাল অট্টালিকা কল্পনা করি তাহলে আমাদের অবস্থান সেখানে কোথায়? আমরা কি অট্টালিকার ইট, শুরকি না পিলার, বিম মেরুদণ্ড? আমাদের একটা না একটা অবস্থান তো আছেই। এখন সেটা খোঁজার জন্যও পড়তে হবে। What is my place in eternity? What is my place in the edifice called civilization?

“No, the real history of man is not in prices and wages, nor in elections and battles, nor in the even tenor of the common man; it is the lasting contributions made by geniuses to the sum of human civilization and culture.”

(The Great Minds and Ideas, Will Durant, page 6.)

বিভিন্ন ধর্ম ও দার্শনিক চিন্তায় বলা হচ্ছে আমরা একটা গ্রান্ড ডিজাইনের একটা অংশ। এই যে ধরুন স্টিফেন হকিংয়ের ‘দ্য গ্রান্ড ডিজাইন’ নামে বই ও বের হয়েছে। প্রশ্ন হলো সেই গ্রান্ড ডিজাইনে আমার অবস্থান কোথায়? সেই প্রশ্ন আস্তিকতার ভেতর থেকেও তোলা যায়, নাস্তিকতার ভেতরে থেকেও।

We are a part of a grand design. We need to find what place we belong to.

আমরা জ্ঞানী হওয়ার জন্য, পণ্ডিত হওয়ার জন্যই শুধু পড়ি না। আমরা আমাদের অজ্ঞতার স্বরূপ উন্মোচন করার জন্যও পড়ি। আমরা যখন পড়ি তখন আমরা এটাও বের করতে পারি যে আমাদের অজ্ঞতা কত বিশাল, এটা কত অসম্ভব যে একজন ব্যক্তি সবকিছু জানবে!

We read not merely to learn and be a knowledgeable man or wise man. We can also read to unveil our ignorance! When we read we also can explore how vast is our ignorance, how immensely impossible to learn a few things rather than all things!

I thought I’ll be a knowledgeable man if I read. And I’ll be respected as a wise person in the society. Yes. I’m a wise person now! Coz I can say with the expression of Socrates, ‘How utterly ignorant I’m’! Through reading we can explore the abysmal ignorance we live in.

পড়াশুনার মাধ্যমে আমরা এাও জানতে পারি কি অজ্ঞতার অতল গহ্বরে আমাদের বসবাস!

এই জ্ঞান বা জানা কি?

জ্ঞানগুরু কনফুসিয়াস অনেক সুন্দর আবার অনেক জটিল ভাষায় কথাটি বলেছেন। কথাটা এমন-‘To know that we know what we know, that we do not know what we do not know, that is true knowledge.’– Confucius

 

সহজ তাফসির করলে হয় এমন, ‘আমরা যেই বিষয়গুলো জানি এটা জানতে পারা এবং আমরা যেসব বিষয় জানিনা সেটা জানা; এটাই সত্যিকারের জ্ঞান।’

পড়তে হবে কেন বা পড়ে কি করতে হবে এর জবাবে ফ্রান্সিস বেকন বলেন, ‘Read not to contradict and confute; nor to believe and take for granted; nor to find talk and discourse; but to weigh and consider.’

Francis Bacon

একটা ভালো বই হচ্ছে একটা ঝর্ণাধারা যেখানে পাঠক স্নান করে পরিশুদ্ধ হয়ে উঠেন।আবার একটা ভালো বই পড়া মানে অমরত্ত্বের পানি পান করা।আমাদের মনের অমরতা দান বা মনের সুস্থ্যতার জন্য বই সবচেয়ে বড় টনিক!

ছবিতে: শিশির

Related Posts

About The Author

One Response

Add Comment

Leave a Reply to Mumin Cancel reply