ফারাক্কা বাঁধের উপহার

ফারাক্কা বাঁধ  : কলকাতা বন্দরকে পলির হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ভারত কর্তৃক প্রায় ১৮ মাইল উজানে মনোহরপুরের কাছে নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশে বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক ও ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ভারত কর্তৃক গঙ্গার পানির একতরফা প্রত্যাহার বাংলাদেশের কেবল প্রতিবেশ ও পরিবেশ ব্যবস্থাই ধ্বংস করছে না বরং এ দেশের কৃষি, শিল্প, বনসম্পদ ও নৌযোগাযোগের মতো অর্থনৈতিক খাতগুলির ওপরও হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

ইতিহাস : ১৮৫৮ সালের প্রথম দিকে স্যার আর্থার কটন নামের একজন বৃটিশ প্রকৌশলী রাজমহালের কাছে গঙ্গার ওপর বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। কিন্তু তৎকালীন বাংলার গভর্ণর একে ”ডযরসরংরপধষ ধহফ সড়হবু-ধিংঃরহম’ স্কীম বলে অভিহিত করেন। পরে ১৯১৬ সালে আর একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। সে উদ্যোগও বিপুল ব্যয় সাপেক্ষ বলে পরিত্যক্ত হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির সময় বিষয়টি বৃটিশ কর্তৃপক্ষ ও হিন্দু নেতৃবৃন্দের নজরে ছিল। ফারাক্কার প্রকল্পটি ভারতের বহুদিনের পুরনো ভাবনার ফসল। ১৯৫১ সালে অক্টোবর মাসে ভারতের কয়েকটি সংবাদ পত্রে খবর প্রকাশিত হলো ভারত ফারাক্কায় বাঁধ নির্মাণ করে গঙ্গার পানি হুগলী নদীতে নিয়ে আসবে। হুগলী নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করে নৌচলাচলসহ কলকাতা বন্দরকে সচল করবে। এই বাঁধ নির্মিত হলে পূর্ব পাকিস্তানের কী ধরনের ক্ষতি হবে এসব বিষয় উল্লেখ করে একই বছরের ২৯ অক্টোবর পাকিস্তান সরকার চিঠির মাধ্যমে ভারতের এই পরিকল্পনার প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তান আমলে ভারত সরকার একাধিকবার ফারাক্কায় বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করে।

অপরদিকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের যশোহর, কুষ্টিয়া ও খুলনা জেলার ৮৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে সরকার গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়। এ ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এই পরিকল্পনার বিষয়টি জানিয়ে ভারতকে চিঠি পাঠায়। ১৯৬০ সালের দুই দেশের বিশেষজ্ঞগণ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানাবিধ প্রকল্পের বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান শুরু করে। ভারত শুধু ফারাক্কা প্রকল্পের মধ্যেই এগুলো সীমাবদ্ধ রাখে। গঙ্গার উজানে যেসব প্রকল্প ভারত ইতোমধ্যেই গ্রহণ করেছে, এগুলোর কোনোটির তথ্য দিতে অস্বীকার করে। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল নয়া দিল্লিতে ১৯৬০ সালের ২৮ জুন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহুর লাল নেহেরুকে চিঠি লিখেছিলেন ১৯৬১ সালের ২৭ মার্চ। নেহেরু একই বছরের ২৯ এপ্রিল চিঠির জবাব দিয়েছিলেন। এভাবে দুই দেশের মধ্যে ফারাক্কা নিয়ে অসংখ্যবার আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ বৈঠকটি বসেছিল দিল্লিতে ১৯৭০ সালের ১৬ জুলাই। বৈঠকটি ৬ দিন স্থায়ী ছিল। ১৯৫১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের মধ্যে উভয় দেশের বৈঠক বসেছে মোট ১০বার। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠক ছিল ৫টি এবং সচিব পর্যায়ে ছিল ৫ টি। মন্ত্রী পর্যায়ে কোনো আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় নি। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান হাইকমিশনারের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে একটি দলের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব দিলে ভারত তাতে রাজি হয় নি। আসলে ফারাক্কা নিয়ে ভারত প্রথম থেকেই চতুর কৌশলের আশ্রয় নেয়। কোনো বৈঠকে একটি তথ্য প্রদান করা হলে কৌশলে ভারত অন্য আরেকটি তথ্য চেয়ে বসে। উদ্দেশ্য তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে যতো বেশি প্রলম্বিত হবে তাতে ফারাক্কা কাজ এগিয়ে যাবে। হলোও তাই ১৯৭০ সালের মধ্যে ফারাক্কা বাধেঁর নির্মাণ কাজ শেষ হলো। যদিও সে সময় ফিডার খালটি খনন করা হয় নি।

এরপর স্বাধীন বাংলাদেশ। বন্ধু রাষ্ট্র ভারত। সেখানকার প্রধানমস্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এলেন ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ। সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সরদার শরণ সিং, মুখ্য সচিব পি.এন. হাকসারসহ অনেকেই। সরকারি অতিথিশালায় রাত্রে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের সেচমন্ত্রী ড.কে.এল.রাও ঢাকায় এলেন। একই বছর ২৬ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত। তিনি ঢাকায় অবস্থান করে তদানীন্তন বাংলাদেশের সেচ মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে প্রস্তাবিত যৌথ নদী কমিশন গঠন সংক্রান্ত আলোচনা করলেন। এর পর যৌথ কমিশন গঠন করলেন। প্রতি বছরে চার বার যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৩ সালের ১৬-১৭ জুলাই দিল্লিতে দুইদেশের সেচ মন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। বৈঠকে মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক এবং ভারতীয় মন্ত্রী সরদার শরণ সিং এর মধ্যে আলোচনায় ফারাক্কার বাঁধটি চালুর আগেই উভয় দেশের মধ্যে গ্রহণযোগ্য একটি অবস্থায় উপনীত হওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৭৪ সালের ১২-১৬ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করলেন। বৈঠক হওয়া পর্যন্ত শেষ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গ বন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে ফারাক্কা চুক্তির বাস্তব কোন সুরাহ হয় নি। ১৯৭৭ সালে ৫ নভেম্বর ঢাকায় মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে গঙ্গা চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। একইভাবে ১৯৮৮ সালের ৩১ মার্চ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মোট ৮টি শুষ্ক মৌসুম অতিবাহিত হয়েছে গঙ্গার পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোন প্রকার চুক্তি না করেই। ভারত এই সময় একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যহার করে সুবিধা জনকভাবে নিজের কাজে লাগিয়েছে। এর মাঝে ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ সাধারণ অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেমগ খালেদা জিয়া ফারাক্কা প্রশ্নসহ গঙ্গার পানি ভারত কতৃক একতরফাভাবে প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন। এই বিষয় নিয়ে ভারতীয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের সাথে তিন বার বৈঠক করেন বেগম জিয়া। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নি। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের ১৭ নভেম্বর ইটালির রাজধানী রোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব খাদ্য শীর্ষ সম্মেলন চলাকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়ার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌজন্যে সাক্ষাতকার অনুষ্ঠিত হয়। আন্তরিকতাপূর্ণ এই সাক্ষাতকারটির মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের ২৭ নভেম্বর পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ৬ দিনের সফরে আসেন ঢাকায়।

৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই প্রথম বাংলাদেশ সর্বনিম্ন পানি পেয়েছে

শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধ পেরিয়ে এতো কম পানি আর কখনই বাংলাদেশের ভাগ্যে জোটেনি। এমনকি গঙ্গা চুক্তি যখন ছিল না; সেই সময়টাতে পানি নিয়ে এমন দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়নি বাংলাদেশকে।

দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ২১ থেকে ৩১ মার্চ ওই ১০ দিনে ভারত বাংলাদেশকে ১৫ হাজার ৬০৬ কিউসেক পানি দিয়েছে। যা ছিল স্মরণকালের সর্বনিম্ন পানির রেকর্ড।

এদিকে, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ কেন এতো কম পানি পেল, এ নিয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কিম্বা যৌথ নদী কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি। ভারতের কাছে আপত্তি তোলা হয়নি- কেন বাংলাদেশকে এই শুষ্ক মৌসুমে ধারাবাহিকভাবে কম পানি দেয়া হলো। যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) তথ্যানুযায়ী, ইতোপূর্বে ২০০৮ সালে ১১ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ওই ১০ দিনে ফারাক্কা পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন পানি পাওয়ার রেকর্ড ছিল ১৭ হাজার ৫১৯ কিউসেক। চলতি শুষ্ক মৌসুমে চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ মাত্র ৪ বার ৩৫ হাজার কিউসেক করে গঙ্গার পানি পেয়েছে। এছাড়া ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিনওয়ারি হিসাবে প্রতিটিতে বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

জেআরসি’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি শুষ্ক মৌসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত) প্রতি ১০ দিনওয়ারি হিসাবে ১ থেকে ১০ জানুয়ারি পানি পেয়েছে ৩৫ হাজার কিউসেক, ১১ থেকে ২০ জানুয়ারি পেয়েছে ৩১ হাজার ৩৯৪ কিউসেক, ২১ থেকে ৩১ জানুয়ারি ৩১ হাজার ১৪ কিউসেক। ১ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ২৯ হাজার ৭৩৩ কিউসেক, ১১ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২৮ হাজার ৮২০ কিউসেক, ২১ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পেয়েছে ২৬ হাজার ৮৬৫ কিউসেক পানি। মার্চের প্রথম ১০ দিনে অর্থাৎ ১ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত পেয়েছে ২৫ হাজার ৪১৯ কিউসেক, ১১ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত পেয়েছে ৩৫ হাজার কিউসেক, ২১ থেকে ৩১ মার্চ এই ১০ দিনে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৫ হাজার ৬০৬ কিউসেক পানি। যা স্মরণকালে সর্বনিম্ন রেকর্ড। ১ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পানি পেয়েছে ৩৫ হাজার কিউসেক, ১১ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত পেয়েছে ১৮ হাজার ২৮২ কিউসেক এবং ২১ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পেয়েছে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি।

সংকট ভারত কর্তৃক শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির ব্যাপক প্রত্যাহার বাংলাদেশের গঙ্গা-নির্ভর এলাকার জনগণের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। মনুষ্যসৃষ্ট এই দুর্বিপাক দেশের সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিদারুণ আঘাত হেনেছে। ভারত কর্তৃক বছরের পর বছর শুষ্ক মৌসুমের মূল্যবান পানি সম্পদ প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশকে আজও কৃষি, মৎস্য, বনজ, শিল্প, নৌপরিবহণ, জলসরবরাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের এসব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরোক্ষ ক্ষতি হিসাবে আনলে এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

লবণাক্ততা  ফারাক্কা-উত্তর বছরগুলিতে খুলনায় অত্যধিক লবণাক্ততার আক্রমণ আশঙ্কাজনক ও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অঞ্চলের লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, কেন্দ্রীকরণ ও মেয়াদ সর্বাধিক মাত্রায় নির্ভর করে এই অঞ্চলে বাহিত নিম্নমুখী প্রবাহের পরিমাণ ও মেয়াদের ওপর। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহে হ্রাসমান প্রবণতার কারণে এ সময়ে গড়াই -মধুমতি খুব কম পানি পাচ্ছে। ফলে লবণাক্ততা ও জোয়ার সীমা দেশের অভ্যন্তরভাগে প্রবেশ করছে। ১৯৮৩ সালে ৫০০ মাইক্রো-mho (লবণাক্ততা) রেখা কামারখালির প্রায় ১৩ কিমি উত্তরে এবং পসুর নদীর মোহনা থেকে ২৪০ কিমি পর্যন্ত ভিতরে এসে পৌঁছেছে। খুলনায়ও ১৭,১০০ মাইক্রো-mho লবণাক্ততা দৃশ্যমান হয়। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ খুলনা এলাকায় রূপসা নদীর জলের উপরিভাগে ৫৬৩.৭৫ মিগ্রা/১ ক্লোরাইড কেন্দ্রীভবনের কথা উল্লেখ করেছেন। স্বাদুপানির প্রবাহ হ্রাস নদী প্রবাহের লবণাক্ততার ওপর কি প্রভাব বিস্তার করে এটি তা ইঙ্গিত করে। শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানির সরবরাহ হ্রাসের কারণে ভূগর্ভস্থ পানিস্তরে লবণ পানির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। হ্রাসমান পৃষ্ঠপ্রবাহ অথবা এই অঞ্চলে জলের উপরিভাগে লবণ পানির অনুপ্রবেশ, পুনঃসঞ্চারণ, প্রত্যাহার ও প্রাকৃতিক অবমুক্তির বেগবান ভারসাম্যকে ক্ষুন্ন করবে। এই অঞ্চলের বর্তমান লবণাক্ততা এখানকার কৃষি, মৎস্য চাষ, রসায়ন ও শিল্প-কলকারখানাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কৃষি  সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে কৃষি। ফারাক্কা-উত্তর বছরগুলিতে গঙ্গার পানির সীমারেখা দ্রুত নেমে যাওয়ায় এ অঞ্চলের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের পাম্পমেশিন চালানো দুরূহ হয়ে উঠেছে। ঐ প্রকল্পের প্রত্যক্ষ এখতিয়ারে ১,২১,৪১০ হেক্টর জমির সেচ নির্ভর করে। গঙ্গার প্রবাহ অত্যধিক নেমে যাওয়ায় প্রকল্পের পাম্পগুলি হয় কর্মহীন অবস্থায় পড়ে আছে নয়ত সামর্থ্যের চেয়ে অনেক কম শক্তিতে চলছে। এছাড়া, মাটির আর্দ্রতা ও মাটির লবণাক্ততার ওপর অত্যধিক চাপ এবং নতুন ভূগর্ভস্থ জলের অভাব সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কৃষি কাজকে দারুণভাবে ব্যাহত করছে।

মৎস্য সম্পদ  মূল গঙ্গানদী ও এর শাখানদীসমূহে পানির সংকট মাছের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় আদর্শ প্রবাহ, স্রোত অবক্ষেপ, দ্রুতি, মোট দ্রবীভূত ঘনবস্ত্ত ও লবণাক্ততার মাত্রাকে ব্যাহত করেছে। গাঙ্গেয় জলব্যবস্থায় দুই শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ও ১৮ প্রজাতির চিংড়ি লালিত হয়। কিন্তু আজ ঐ অঞ্চলে ধৃত মাছের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। ফলে হাজার খানেক জেলে ও মৎস্যজীবী এর ফলে বেকার হয়ে পড়েছে।

নৌপরিবহণ  ফারাক্কা-উত্তর আমলে গঙ্গার প্রবাহ সংকট নৌপরিবহণ খাতকেও আঘাত হেনেছে। এখন শুষ্ক মৌসুমে ৩২০ কিলোমিটারের বেশি প্রধান ও মধ্যম নৌপথ বন্ধ রাখতে হয়। যার ফলে শত শত মাঝি মাল্লা কর্মহীন হয়ে আছে।

ভূগর্ভস্থ পানি  ফারাক্কা বাঁধের ফলে গঙ্গা-নির্ভর এলাকায় ক্ষীয়মাণ ভূগর্ভস্থ পানি অধিকাংশ স্থানে ৩ মিটারের বেশি নেমে গেছে। মোট দ্রবীভূত ঘনবস্ত্ত, ক্লোরাইড, সালফেট ইত্যাদির ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির গুণগত মানও কমে গেছে। ফলে বিশাল এলাকার কৃষিকাজ, কলকারখানা, গার্হস্থ্য ও পৌর জল সরবরাহ এবং মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জনগণ ১২০০ mg/l TDS (total dissolved solids) পানীয় জল পান করতে বাধ্য হচ্ছে- যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পানীয় জলের জন্য অনুমোদিত সীমা মাত্র ৫০০ mg/l। জনসাধারণের সার্বিক স্বাস্থ্যের মান এ কারণে হ্রাস পাচ্ছে।

লেখক : এ.এস.এম ইউনুছ

লেখক ও গবেষক

PHOTO_20160514_131912

Related Posts

About The Author

Add Comment