ফিদেল ক্যাস্ট্রো: জনগণের নায়ক নাকি স্বৈরশাসক?

কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো বিশ্ব রাজনীতিতে একটি আলোচিত এবং বিতর্কিত চরিত্র। তার সমর্থকরা তাকে বলে আসছেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নায়ক; সমাজতন্ত্র, মানবাধিকার ও পরিবেশ রক্ষার সিপাহসালার। তার শত্রুরা তাকে বলে আসছেন একজন স্বৈরশাসক এবং তার বিরুদ্ধে করে আসছেন অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। এখন তিনি ভাল করেছেন না খারাপ করেছেন এটা নিয়ে নিশ্চিত জবাব দিতে না পারলেও বিশ শতকের কিউবার ইতিহাস যে তার হাতে রচিত হয়েছে এটা নিয়ে সন্দেহ নেই।ক্যাস্ট্রো ১৯৫৯ সালে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল বাতিস্তাকে হটিয়ে। সেই সময়ের স্বৈরশাসক বাতিস্তাকে হটানোর সেই কিউবান বিপ্লবে কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালন করেছিলেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো। সেই কমিউনিস্ট বিপ্লব ফিদেলকে ক্ষমতার মসনদে বসিয়ে দেয়। কথা ছিল তিনি জনগণের হাতে ক্ষমতা দেবেন কিন্তু ৪০ বছরেরও বেশি সময় গদিতে বসে থাকেন এবং একবারের জন্যও জনগণের মাধ্যমে সরাসরি নির্বাচিত হননি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বিপ্লবী হয়ে উঠা

ফিদেলের পুরো নাম ফিদেল আলেজান্দ্রো ক্যাস্ট্রো রাজ। একজন বিত্তশালী আখচাষীর অবৈধ ছেলে ছিলেন ফিদেল। বাবা এঞ্জেল ক্যাস্ট্রোই আরগিজ স্পেন থেকে কিউবাতে অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন। কিউবাতে আখ খামার করে অর্থ বিত্তের মালিক হন ওই ভদ্রলোক। ক্যাস্ট্রোর বাবা সেই সময় বিবাহিত হলেও এক কর্মচারীর সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে পাঁচটি সন্তানের জন্য দেন। লিনা রুজ গঞ্জালেজ নামে ওই কর্মচারীই ছিল ক্যাস্ট্রোর মা।

ক্যাস্ট্রো শৈশবে পারিবারিক খামারেই বড় হতে থাকেন এবং ক্যথলিক বোর্ডিং স্কুলে পড়াশুনা শুরু করেন। তিনি খেলাধূলায় খুব ভালো ছিলেন এবং রাজনীতি নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব হাভানার ল স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরপরই ছাত্র আন্দোলনের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। বিরোধি মতের ছাত্র সংগঠনের উপর সরকারের দমন নিপীড়নের ফলে তিনি বিপ্লবীতে রূপান্তরিত হয়ে পড়েন।

১৯৪৭ সালে ক্যারিবিয়ান লিজিয়ন নামে একটি গ্রুপে যোগ দেন। এই গ্রুপটির লক্ষ্য ছিল ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সকল স্বৈরশাসকদের হটানো। এর পরের বছর তিনি কলম্বিয়ার বগোতাতে ভ্রমণ করেন। সেখানে প্রত্যক্ষ গণ আন্দোলন পর্যবেক্ষণ করেন। জনপ্রিয় কলম্বিয়ান রাজনীতিবিদ হোর্হে এলিসার গাইতান গুপ্তহত্যার শিকার হন তখন দেশটিতে দাঙ্গা বেধে যায়। ক্যাস্ট্রো একটি রাইফেল হাতে তুলে নেন এবং দাঙ্গায় জড়িত হয়ে পড়েন।

কিউবাতে ফিরে ক্যাস্ট্রো একজন আলোচিত ছাত্র নেতায় পরিণত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি সরকার বিরোধি আন্দোলনের পুরোধা চরিত্রে পরিণত হন। ১৯৫০ এ ল স্কুল থেকে স্নাতক শেষ করেন এবং আইন পেশা শুরু করেন।

কিউবার দরিদ্র জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের চিন্তা ভাবনার কারণে রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ তীব্র হতে থাকে। ১৯৫২ সালে কিউবার পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্বাচন আর হয়নি। জেনারেল বাতিস্তা একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগের সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করে নেন এবং সকল ক্ষমতা নিজের কাছে নিয়ে আসেন।

বাতিস্তার বিরুদ্ধে ক্যাস্ট্রোর লড়াই

বাতিস্তার শাসনকালের শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে লড়ে আসছিলেন ফিদেল। প্রথম দিকে আইনগতভাবে আদালতের মাধ্যমে বাতিস্তাকে ক্ষমতা থেকে সড়াতে চেষ্টা করেন। এতে ব্যর্থ হয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধের মাধ্যমে বাতিস্তাকে হটানোর লক্ষ্যে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপ সংগঠিত করতে থাকেন।

১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই ক্যাস্ট্রো ১৬০ জনের একটি সশস্ত্র দল নিয়ে সান্তিয়াগোর মনকাদা ব্যারাকে আক্রমণ করেন। এটা ছিল একটি শক্ত মিলিটারি বেইস এবং ক্যাস্ট্রোর বাহিনী পুরোপুরি পরাস্ত হয় সেই প্রশিক্ষিত বাহিনীর হাতে। ক্যাস্ট্রো এবং তার ভাইকে আটক করা হয় ও বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

বিচারের কাঠগড়ায় একটি আবেগময় বক্তৃতা দেন ক্যাস্ট্রো। তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু মাত্র দুবছর পরপরই তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। কারণ বাতিস্তা মনে করেছিলেন ফিদেল তার জন্য বড় কোন হুমকি হবেন না! এই সময়ের মধ্যে বাতিস্তা আমেরিকার সমর্থন পেয়ে গিয়েছিলেন এবং ব্যবসায়িক গোষ্ঠি তার পেছনে ছিল। এবং তিনি কল্পনা করতে পারেননি কোন ছোট্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাকে টলিয়ে দিতে পারবে।

কারাগার থেকে বের হয়ে মেক্সিকোতে চলে যান ক্যাস্ট্রো। এবং পরের বছর বাতিস্তাকে হটানোর আন্দোলনের কাজ শুরু করেন। তাদের আন্দোলনের নাম করেন ‌‌‌‘২৬ জুলাই মুভমেন্ট’। মনকাদা ব্যারাকে হামলার দিনটিকে স্মরণ করে এই নামকরণ করা হয়েছিল। তাদের সামনে শুধু একটি লক্ষ্যই স্থির করা হয় এবং সেটা হলো বাতিস্তার পতন।

১৯৫৬ সালের ২ ডিসেম্বর কিউবার মাটিতে পা রাখেন ফিদেল ও তার ‘২৬ নভেম্বর মুভমেন্ট’ এর গেরিলারা। তাদের সামনে একটিই লক্ষ্য এবং সেটা হলো একটা বিপ্লব ও বাতিস্তার পতন। শক্ত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়ে ভয়ানক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হন এবং পাহাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় ক্যাস্ট্রোর বাহিনী। বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা হামলার প্রস্তুতি শুরু করেন।

পরবর্তী দুই বছর ক্যাস্ট্রোর বাহিনী এগিয়ে যায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে। কিউবার সাধারণ জনগণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিতে থাকে ক্যাস্ট্রোর গেরিলা দলে। এবং এরপর থেকেই একটার পর একটা শহর সরকারের হাত থেকে গেরিলাদের হাতে চলে যায়। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের হৃদয় ও মন জিতে ফেলেন ক্যাস্ট্রো এবং তারাই তাকে আশ্রয় ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে থাকেন। ওদিকে বাতিস্তা জনগণের সমর্থন হারিয়ে ফেলতে থাকেন। একের পর এক পরাজয়ের মুখোমুখি হয়ে কিউবা থেকে পালিয়ে যান ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি।

কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্যাস্ট্রো

ম্যানুয়েল ইউরিতাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাছাই করা হয় এবং সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব থাকে ক্যাস্ট্রোর হাতে। কিন্তু ১৯৫৯ সালে কিউবার নেতা হিসেবে ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে আসেন এবং পরবর্তী চার দশকের জন্য এটা ধরে রাখেন।

১৯৫৯ ও ১৯৬০ এর দিকে ক্যাস্ট্রো অনেকগুলো র‍্যাডিকাল পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি সকল শিল্প কারখানা জাতীয়করণ করেন এবং সমবায়ভিত্তিক কৃষি চালু করেন। তারই সাথে আমেরিকান মালিকানাধীন খামার ও ব্যবসার মালিকানা গ্রহণ করেন। এতে আমেরিকার সাথে সম্পর্ক অনেক তেতো হয়ে যায় কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে শক্ত সম্পর্ক ধরে রাখেন। বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে ক্যারিবিয় অঞ্চলে প্রথম কোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে কিউবাকে প্রতিষ্ঠা করেন ফিদেল।

সোভিয়েতের সাথে সম্পর্কের কারণে শুরু থেকেই আমেরিকা তাকে ক্ষমতা থেকে সড়িয়ে দিতে চাচ্ছিল।

কিউবার অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়ার লক্ষ্যে একটি টোটাল বাণিজ্য অবরোধ ঘোষণা করা হয় ১৯৬২ সালে। যুক্তরাষ্ট্রে কোন কিউবান পণ্য বিক্রি বন্ধ করা হয় এবং কিউবার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সকল ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করা হয়। এবং আমেরিকান জনগণকে কিউবা ভ্রমণ করা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়। ক্যাস্ট্রোকে হত্যা করার জন্য বছরের পর বছর আমেরিকা কয়েকশত প্রচেষ্টা চালায় এবং প্রত্যেকটি প্রচেষ্টাই নাটকীয়ভাবে ব্যর্থ হয়।

১৯৬২ সালে সোভিয়েতকে কিউবায় ক্ষেপনাস্ত্র স্থাপনা করতে অনুমতি দেন ক্যাস্ট্রো। এর উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেয়া। তখন আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরমে। কিউবাতে সোভিয়েতের সেই স্থাপনা নির্মাণের ব্যাপারটি আমেরিকার নজরে পড়ে যায়। মার্কিন নৌবাহিনী কিউবার চারপাশে নৌ অবরোধ আরোপ করে এবং রাশিয়ার মালামাল সরবরাহ ঠেকিয়ে দেয়। এর ফলে সোভিয়েত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এই সংকটকে কেন্দ্র করে বড় কোন যুদ্ধ লেগে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এই সংকটকে ‘কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস’ হিসেবে পাঠ করা হয়। ১৩ দিন পর সোভিয়েত পিছু হটে এবং ক্ষেপনাস্ত্র স্থাপনা সড়িয়ে ফেলে।

পরবর্তী চার দশকে কিছু কিউবান ক্যাস্ট্রোর শিক্ষা ও ভূমি সংস্কারের সুফল ভোগ করলেও বেশিরভাগ কিউবান খাদ্য স্বল্পতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাবে ভোগে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে শত শত কিউবান আমেরিকায় পালিয়ে যান। একমাত্র সোভিয়েত সাহায্যে নির্ভরশীলতার কারণে ১৯৯১ সালে সোভিয়েতের পতনের পর কোনঠাসা হয়ে পড়েন ফিদেল। আমেরিকার চলমান দীর্ঘস্থায়ী  অবরোধের কারণে ১৯৯০ এর দশকে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে কিউবা।

২০০৬ সালে ক্যাস্ট্রোর খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজ শুরু করতে হয় তাকে। ছোট ভাই রাউল দায়িত্ব বুঝে নিতে থাকেন। এর পরের দুবছর ক্যাস্ট্রো শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিদিনকার কাজ দেখাশুনা করেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে ২০০৮ সালে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেন এবং রাউলের কাছে পুরোপুরি দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। তারপর থেকে তিনি শুধু একজন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। কোন ধরণের সরকারি দায়িত্ব পালন না করলেও এই আজন্ম বিপ্লবী বর্তমানে কিউবার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত সারা বিশ্বে। জন সমক্ষে আর তেমন বের না হলেও বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধান ও মেহমানরা তার সাক্ষাত প্রার্থনা করেন।

ক্যাস্ট্রোর পরিবার

ফিদেল ক্যাস্ট্রো দুবার বিয়ে করেন এবং তিনি বর্তমানে ছয়টি বৈধ সন্তানের পিতা। রমণীমোহন হিসেবে পরিচিত ফিদেল আরও অজানাসংখ্যক অবৈধ সন্তানের পিতা। ক্যাস্ট্রোর প্রথম স্ত্রী ছিল তার কলেজ প্রিয়তমা মির্তা দিয়াজ- বালার্ত। সে ছিল একটি বিত্তশালী ও অভিজাত পরিবারের মেয়ে। ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে বিয়ে করেন তারা। কিন্তু ১৯৫৫ সালেই তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। তাদের গর্ভে ফিদেলিতো নামে একটি ছেলের জন্ম হয়। ক্যাস্ট্রো তার দ্বিতীয় স্ত্রী দালিয়া দেল ভাল কে ১৯৮০ সালে বিয়ে করেন। বিয়ে করার আগে তাদের গর্ভে পাঁচটি সন্তানের জন্ম হয়। ক্যাস্ট্রোর দুজন অবৈধ সন্তান বর্তমানে আমেরিকাতে বসবাস করছেন। ক্যাস্ট্রোর বোন জুয়ানিতাও আমেরিকাতে বসবাস করছেন।

লরা লারিমার ও স্কট বার্নেস এর লেখাটি প্রকাশিত হয় ইতিহাস ও রাজনীতির সাময়িকী ডামিজ ডট কমে। তরজমায় সাবিদিন ইব্রাহিম

Related Posts

About The Author

Add Comment