ফেমিনিস্ট ক্রিটিসিজম – কি, কেন, কার জন্যে?

একুশ শতকের গোঁড়ায় দাড়িয়ে আমাদের চিন্তা আজ আরও উন্নত, আমাদের লক্ষ্যগুলো যূথবদ্ধ ও স্থির। সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গীতে যাতে পক্ষপাত না থাকে, পাঠক- চিন্তক- লেখক- সমালোচক হিসেবে এটা আমাদের প্রধানতম concern । অনেকটা সেই লক্ষ্যে নিয়ে হাজার বছরের পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা চর্চার বিপরীতে ধীরে ধীরে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে- নিচ্ছে নারীবাদী ও সমকামীদের চিন্তাধারা (feminist and gay criticism), বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর রীতিনীতির বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের দর্শন, বৈশ্বিকতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিঅস্তিত্বের সংগ্রাম, ক্ষমতা কেন্দ্রীকরনের বিপক্ষে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, “Exotic Oriental” হিসেবে প্রাচ্যের রুপকল্প তৈরিতে প্রাতিচ্যের অন্যায় প্রচেষ্টার বিরোধিতা, ক্ষমতার অসম বণ্টনের বিপরীতে সচেতন মানুষদের নৈতিকতার লড়াই এবং ডমিন্যান্ট কালচারের ভালোমানুষির চেহারায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্যান্য সমাজ এবং সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। বৈশ্বিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এ লড়াই অসম এবং অনেকাংশেই নৈতিক, কিন্তু এ লড়াই এর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি – সচেতনতা। এ সমস্ত ইস্যুতে আমরা আজ সচেতন। আমাদের সচেতন করে তুলেছে ক্রমাগতভাবে কাজ করে চলা মানবতাবাদী চিন্তক ও দার্শনিকেরা।

৮ ই মার্চ পৃথিবীজুড়েই বিশ্ব নারীদিবস হিসেবে স্বীকৃত। প্রশ্ন তোলাই যায় বছরের একটি দিনকে পৃথিবীর নারীদের অধিকার আদায়ের দিবস হিসেবে, নারীদের পাওয়া- না পাওয়ার সুখ-দুখ আলোচনা পর্যালোচনার দিবস হিসেবে গ্রহন করা, মেনে নেয়াটা যথার্থ কিনা। নাকি এটাও বৈশ্বিক পুঁজিবাদের আরও একটি ষড়যন্ত্র মাত্র? প্রশ্ন উঠতে পারে, এই একটি দিনের সেলিব্রেশান – কতটুকু সক্ষম হয়েছে পৃথিবীকে নারীদের জন্যে একটি নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তুলতে, যেখানে নারীরা পুরুষদের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে নয় বরং পুরুষের সমকক্ষ হিসেবে, সমঅধিকার নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারছে। আসুন, চিন্তা করি। ভেবে বের করার চেষ্টা করি নারীদের নিয়ে, আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে – আমার আপনার মা, বোন, প্রেমিকা, স্ত্রী, সহপাঠী, সহকর্মী, বাসে-ট্রেনে-প্লেনে সহযাত্রী হিসেবে যে নারীরা আছেন তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কিভাবে বছরের ৩৬৫ দিনই বজায় থাকে।

সে যাক, আজ বিশ্ব নারী দিবস আমার মনে যে ইতিবাচক অনুরণন সৃষ্টি করেছে, তার জন্যে আমি দিবসটির প্রতি কৃতজ্ঞ। সকাল থেকে চেষ্টা করছি নারীবাদী দর্শন নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা করার। যে অদ্ভুত পৃথিবীতে আমরা বসবাস করি, সেখানে আপেক্ষিকতাবাদ সূত্রের আবিষ্কার হয়ে যাবার পরেও নারীদের ভোট দানের মত একটি ন্যুনতম মৌলিক মানবাধিকার বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা হয় নি। কাজেই বৈশ্বিক নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাস যে সবসময়ই কণ্টকাকীর্ণ ছিল, এবং এখনও আছে – তা বলাই বাহুল্য। এ প্রবন্ধটির লক্ষ্য নারীবাদী দর্শন, তথা ফেমিনিজমের ইতিহাস, ফেমিনিজম বলতে কি বোঝায় আর কি বোঝায় না ইত্যাদি আলোচনা করে ফেমিনিস্ট ক্রিটিসিজমের কিছু উদাহরণ এবং এ সংক্রান্ত কিছু চিন্তার সূত্র পাঠকের হাতে প্রত্যার্পণ। Remo
ফেমিনিজম এবং ফেমিনিস্ট ক্রিটিসিজমঃ

২০১৬ সালে বসে আমরা ফেমিনিজম নিয়ে যা কিছুই বলি, তা ১৯৬০ সালের নারীদের শুরু করা প্রত্যক্ষ আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, ওটা আমাদের শুরুয়াদের জায়গা। যদিও ১৯৬০ সালের আন্দোলনকে আমরা ফেমিনিজমের তাত্ত্বিক উৎপত্তির জায়গা বলতে পারি না। ফেমিনিজমের তাত্ত্বিক উৎপত্তির জন্যে সকল নারীবাদী তাত্ত্বিককে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে কিছু ক্লাসিক টেক্সটের ওপর যেগুলি সমাজে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণগুলি জনসমক্ষে তুলে ধরেছিল আরও আগে। তারমধ্যে আছে – মেরী ওউলস্টোনক্র্যাফটের এ ভিনডিকশন অফ দা রাইটস অফ ওমেন (১৭৯২) যেখানে জন মিলটন, অ্যালেকজান্ডার পোপ এবং রুশোর মত ক্লাসিক রাইটারদের লেখায় নারীর উপস্থাপন নিয়ে আলোচনা- পর্যালোচনা করা হয়। আছে অলিভ স্ক্রেইনারের ওমেন অ্যান্ড লেবার (১৯১১), ভার্জিনিয়া উলফের এ রুম অফ ওয়ানস অউন (১৯২৯) যেখানে উলফ শিক্ষাসহ জীবনের আরও অসংখ্য আনুসাঙ্গিক বিষয়ে সমাজ কর্তৃক নারী- পুরুষের বিষম আচরণের বর্ণনা উঠে এসেছে। আছে সিমন দ্য বুভুয়ার দা সেকেন্ড সেক্স যে পুস্তকের একটা বড় অংশে উঠে এসেছে ডি এইচ লরেন্সের উপন্যাসে নারী চরিত্র চিত্রায়ন থেকে নিয়ে ভিক্টোরিয়ান চিন্তক জন স্টুয়ার্ট মিলের – দা সাবজেকশন অফ ওমেন (১৮৬৯) এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের দা অরিজিন অফ ফ্যামিলি (১৮৮৪) পর্যালোচনা। এই আলোচনা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, ফেমিনিস্ট ক্রিটিসিজম বা নারীবাদি সাহিত্য সমালোচনা ছিল একদম প্রথম থেকেই সাহিত্যমুখী, এই অর্থে যে – ফেমিনিস্ট ক্রিটিকদের কাজই ছিল ফিকশনাল ও নন ফিকশনাল বিবিধ সাহিত্যকর্মে নারীদের উপস্থাপন পর্যালোচনা করা।

বিবিধ সাহিত্যকর্মে নারীর উপস্থাপন এবং সামাজিকীকরণকে বোঝার জন্যে আমাদের তিনটি টার্মের ব্যাপারে ধারনা রাখতে হবে। তা হল – ফেমিনিস্ট (feminist), ফিমেল (female) এবং ফেমিনিন (feminine)। তাত্ত্বিক টরিল মোই বলেন – এরমধ্যে প্রথম পরিচয়টি (ফেমিনিস্ট) রাজনৈতিক, দ্বিতীয় পরিচয়টি (ফিমেল) বায়োলজিক্যাল বা শারীরতাত্ত্বিক এবং সর্বশেষ পরিচয়টি (ফেমিনিন) সামাজিকভাবে নির্দিষ্টকৃত কিছু আচার ব্যাবহারের সমষ্টি। যেকোন লেখায় নারীর উপস্থাপনকে পর্যালোচনা এবং জাচাই বাছাই করতে হবে এই তিনটি পয়েন্ট থেকেই।

সত্তরের আগে (১৯৭০) বিবিধ সাহিত্যকর্মে তথা গল্পে উপন্যাসে নারীর যে উপস্থাপন আমরা দেখি, তাতে লক্ষ্য করা যায় যে সে সময়ের নারীরা নেহায়েত ঠ্যাকায় না পড়লে কাজ করতে ঘরের বাইরে পা ফেলে না এবং তাদের জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য হচ্ছে নিজের জন্যে একজন ধনী, সুদর্শন এবং হৃদয়বান জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া (প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস, জেন আয়ার,উইদারিং হাইটস)। প্রাসঙ্গিকভাবে বলে রাখি, ব্যাপারটা দুঃখজনক হলেও সত্য যে সমকালীন বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসগুলিতে নারীর উপস্থাপন দেখলেও মনে হয় যে ঘরকন্না করা, প্রেম করা এবং সর্বোপরি বিয়ে করা ছাড়া বাঙ্গালী মেয়েদের আর কোন কাজ নাই। সে যাই হোক, অবস্থাদৃষ্টে এবং তৎকালীন সময়ের পর্যালোচনায় বলা চলে – প্রকৃতার্থেই সে সময়ে সমাজে নারীর কার্যক্রমের গণ্ডি সীমাবদ্ধ ছিল, ফলে গল্প উপন্যাসে তাদের এ উপস্থাপনে শুধু পুরুষ লেখকেরা নয় বরং হাতে গোনা যে ক’জন নারী লেখিকা ছিলেন, তাদেরও সম্মতি ছিল বা তারা এ বর্ণনা ব্যাবহার করেছেন।

১৯৭০’র পর নারীবাদী সমালোচনার মোড় বদলে যায়। নারীরা ক্রমশ নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে, ফলে সে সময়কার সমালোচনাগুলোতে থাকে বিবিধ সাহিত্যকর্মে নারী চরিত্র উপস্থাপনে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব চিহ্নিত করা এবং পুরুষদের “কালচারাল মাইন্ডসেট” যার ডমিনেট করার মানসিকতার ফসলে নারীরা নিগৃহীত হয়, বঞ্চিত হয় নিজের প্রাপ্য অধিকার থেকে – তার স্বরূপ উদ্ঘাটন। বিশেষ নজর দেয়া হয় পুরুষ লেখকদের বিখ্যাত বইগুলোতে, যাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রভাব ব্যাপক।

‘৮০র পর পৃথিবী জুড়েই সমালোচনার আঙ্গিকে আমূল পরিবর্তন আসে। তারই সাথে তাল মিলিয়ে নারীবাদী সমালোচনার ধরন ধারনও বদলে যায়। যেমন, প্রথমত, নারীবাদী সমালোচনা বিদ্যমান প্রধান সব ক্রিটিসিজমের স্কুলগুলোর (যেমন- মার্ক্সিজম, স্ট্রাকচারালিজম, লিঙ্গুইস্টিক্স ইত্যাদি) তত্ত্বের সাথে নিজেদের আদর্শিক অবস্থান মিলিয়ে সমালোচনা শুরু করে; দ্বিতীয়ত, পুরুষদের প্রচলিত সামাজিক ধ্যানধারণা ও মানসিকতার সমালোচনা করা কমিয়ে দিয়ে তারা অধিক মনযোগী হয়ে ওঠে পৃথিবী ও বিদ্যমান সমাজ ব্যাবস্থা নিয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীর সৃষ্টি ও এর প্রচার-প্রসারে; তৃতীয়ত, সাহিত্যের ইতিহাস নারী সাহিত্য সমালোচকেরা নতুন করে বিনির্মাণে আগ্রহী হয়। যে সকল নারী সাহিত্যিক বা লেখক পুরুষতান্ত্রিক সাহিত্যের ইতিহাসে তাদের যথার্থ মর্যাদা পায় নি বলে তাদের ধারণা হয়, তারা চেষ্টা করে উক্ত নারী সাহিত্যিকদের তাদের মর্যাদার স্থল ফিরিয়ে দিতে। খুব সংক্ষেপে আধুনিক নারীবাদী সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করেছেন নারীবাদী তাত্ত্বিক এলাইয়েন শ’ল্টার। তিনি বলেন – আধুনিক ফেমিনিজমের লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে Androtexts তথা পুরুষকর্তৃক রচিত বইয়ের বদলে চলে আসে নারীকর্তৃক লেখিত বই, বা Gynotexts. তিনি Gynocritics নামক শব্দটির প্রচলন করেন, যার অর্থ হচ্ছে – “The Study of Gynotexts”। সে যাই হোক, Gynocriticism শব্দের অর্থ অবশ্য আরও ভিন্ন এবং ব্যাপক।

৮০র পর থেকে যে নারীবাদি সাহিত্য সমালোচনার প্রাদুর্ভাব, তার মূল বৈশিষ্টই হল এর বিস্তৃত পরিসরে ফেমিনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গীতে যেকোনো সিঙ্গুলার লিটেরারি টেক্সট থেকে ডমিন্যান্ট লিটেরারি ক্যানন পর্যন্ত নারীর উপস্থাপন খুঁটিয়ে দেখা।
আধুনিক ফেমিনিজমের অভ্যন্তরীণ ভেদ- বিভেদঃ

৮০র পর ফেমিনিস্ট ক্রিটিসিজমে বিভেদ তৈরি হয় মূলত তিনটি পয়েন্টে-

১। তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গী

২। ভাষার ব্যাবহার

৩। সাইকোঅ্যানালাইসিস

১। তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিভাজনঃ

কোন ধরনের তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি হবে এই নিয়ে মতবিরোধের ফলে বেশ কয়েকটি ফেমিনিস্ট স্কুল দাঁড়িয়ে যায়।

অ্যাংলো অ্যামেরিকান স্কুলের ফেমিনিস্টরা সর্বাধুনিক ক্রিটিকাল থিওরির বয়ান- ব্যাপ্তি ও ব্যাবহারের ব্যাপারে বেশ “স্কেপটিক্যাল”। তারা ট্র্যাডিশনাল বা প্রচলিত সমালোচনার ছুরি-কাঁচি যেমন – লেখার বিষয়বস্তু (থিম/ কন্টেন্ট), আঙ্গিক বা কাঠামো ( স্ট্রাকচার) এবং চরিত্র চিত্রণ ( ক্যারেক্টারাইজেশন) এর ওপর নির্ভর করেই তাদের সমালোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী।

অপরদিকে ফ্রেঞ্চ ফেমিনিস্ট স্কুলের আগ্রহ পোস্ট স্ট্রাকচারালিস্ট এবং সাইকো অ্যানালাইটিক ক্রিটিসিজমে। তারা অনেকটাই থিওরিটিক্যাল এবং তাদের তাত্ত্বিক বেইজ দাঁড়িয়ে আছে লেকান- ফুঁকো এবং দারিদার মত মেজর পোস্ট স্ট্রাকচারালিস্ট প্রদিত থিওরিটিক্যাল ফ্রেমওয়ার্কের ওপর। ফ্রেঞ্চ ফেমিনিস্ট ক্রিটিকরা বেশীরভাগ সময়ই জোর দেয় লিটারেচারের বাইরের বিষয়াবলীতে, যেমন – ভাষা, উপস্থাপন, এবং টেক্সটের সমাপনী বক্তব্যে পৌঁছানোর পেছনে উক্ত সাহিত্যিককে প্রভাবিত করেছে এমন সকল প্রাক্তন বা সমকালীন দর্শনের ব্যাখ্যা।

ব্রিটিশ নারীবাদী সমালোচকেরা কার্ল মার্ক্সের ফিলসফি তথা কালচারাল ম্যাটেরিয়ালিজম সাথে সাযুজ্য রেখে নিজেদের বলতেন সোশ্যালিস্ট ফেমিনিস্ট। কাজেই তাদের আলোচনা- সমালোচনাও বহুলাংশেই তত্ত্ব নির্ভর।

২।ভাষার ব্যাবহারঃ

ভাষার কি নারী- পুরুষ আছে? ইনহ্যারেন্টলি, বা অন্তর্গতভাবে ভাষা কি ম্যাসকিউলিন তথা পুরুষালি বা ফেমিনিন তথা নারীবাচক হতে পারে?

ভার্জিনিয়া উলফ, তার এ রুম অফ ওয়ানস অউনে বলেন, পুরুষ ও নারীর ভাষা প্রয়োগে স্পষ্ট পার্থক্য আছে। তিনি বলেন – একজন নারী একটি উপন্যাস বা গল্প লিখতে বসলেই দেখতে পায় যে তার ব্যবহার উপযোগী কোন পূর্ব নির্ধারিত ভাষার আঙ্গিক বা কাঠামো নাই। উলফের ভাষায় –

“the language use is gendered, so that when a woman turns to novel writing she finds that there is no ‘common sentence’ ready for her use”

ব্যক্তিগত অনুভূতি অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আমিও একমত হই উলফের সাথে। নিজের সাহিত্য চর্চার অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে – প্রাথমিকভাবে ভাষার আঙ্গিক অনুকরণ করতে হয়, নতুবা তৈরি করে নিতে হয়। যেমন, বাংলা ভাষায় যখন প্রথম উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেন বঙ্কিমচন্দ্র, তখন তিনি নিজস্ব কোন স্টাইল তৈরির বদলে ইংরেজি নভেলের স্টাইল কপি করার চেষ্টা করেছিলেন। আবার রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের ব্যাপারে আমরা বলি – বাংলা ছোটগল্পের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের সম্মুখে কোন আদর্শ ছিল না অনুকরণীয়। বরং তাকে তৈরি করে নিতে হয়েছে বাংলা ছোটগল্পের আদল। ঠিক একই জায়গা থেকে যদি বলি, নারীরা যখন প্রথমবারের মত গোষ্ঠীবদ্ধভাবে সচেতন হচ্ছেন নিজেদের একটি সাহিত্য- সাহিত্যের ভাষা নির্মাণে, তারা সামনে তাকিয়ে দেখেন যে ভাষাগতভাবে তাদের অনুকরণীয় কোন আদর্শ নেই।

ফ্রেঞ্চ ফেমিনিস্ট থিয়োরিস্ট হেলেন সিক্সাস তো আরও এক কাঠী এগিয়ে গিয়ে বলেন –

“Women must write through their bodies, they must invent the impregnable language that will wreck partitions, classes, and rhetoric, regulations and codes, they must submerge, cut through, get beyond the ultimate reserve-discourse, including the one that laughs at the very idea of pronouncing the word ‘silence’…” (Marks and de Courtivron, P.256)
অর্থাৎ একজন নারী লেখক বা তাত্ত্বিককে নিজের নারীত্ব পরিভাষাকে শব্দের দ্যোতনায় বাঙময় করে লিখতে হবে, ভেঙ্গে ফেলতে হবে পুরুষতান্ত্রিক শব্দ প্রয়োগের সকল নিয়মনীতি। হেলেন সিক্সাসের প্রবন্ধ – দা লাফ অফ মেডুসাতে ব্যাবহৃত “এক্রিচার ফেমিনিন” টার্মটি নারীর ভাষা তৈরি নিয়ে এই তাত্ত্বিক অবস্থানকে পরিপূর্ণরূপে ধারন করে। যাই হোক, সিক্সাসের ভাষাভিত্তিক এই তত্ত্ব ত্রুটিমুক্ত নয়। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় – যদি “ফেমিনিটি” বা নারীত্ব অথবা নারীবাচক বৈশিষ্ট্যাবলী সামাজিক বিনির্মাণের ফসল হয়, তবে নারীদের জন্যে একটি সার্বজনীন লেখ্য ভাষা তৈরি করা যাবে কিভাবে, যেখানে সামাজিক রীতিনীতি একদেশ থেকে আরেকদেশ এমনকি একই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন? ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে নারীত্বের আঙ্গিক, বা সামাজিক রূপরেখাও ভিন্নভিন্ন হবে। ফলে একটি একক ও অভিন্ন নারীর ভাষার বিনির্মাণ সম্ভবপর হবে না।

 

৩।সাইকোঅ্যানালাইসিস এবং ফেমিনিস্ট ক্রিটিসিজমঃ

সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের সাইকোঅ্যানালাইটিক ইন্টারপ্রিটেশন শুধুমাত্র সাইকোলজির ফিল্ডকেই নাড়া দেয় নি, একদম ভিত থেকে নাড়া দিয়ে গিয়েছে আরও অনেক আনুসাঙ্গিক তাত্ত্বিকদেরও। আধুনিক ফেমিনিজম নিয়ে কথা বলতে গেলে যাকে ঊহ্য রেখে দুটো কথা বলার কোন সুযোগই নেই – তিনি হলেন কেইট মিলেট। তার সেক্সুয়াল পলিটিক্স(১৯৬৯) বইয়ে কেইট স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন ফ্রয়েড তার সাইকোঅ্যানালাইটিক থিওরিতে যে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব দেখিয়েছেন তার বিরুদ্ধে লড়াই করা নারীবাদী লেখক-দার্শনিকদের অবশ্য কর্তব্য। কেইটের উক্ত মতবাদের ব্যাপক প্রভাব বর্তমান ফেমিনিস্টদের মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও ফ্রয়েডের সাইকোঅ্যানালাইসিসকে শত্রু ভেবে এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই, এমনটাও বলেছেন অনেক নারীবাদী তাত্ত্বিক। বরং সাইকোঅ্যানালাইসিসকে ব্যাবহার করতে হবে নারীবাদের সুবিধার্থেই বলেন তারা। জুলিয়েট মিচেল তার ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত পুস্তক – সাইকোঅ্যানালাইসিস অ্যান্ড ফেমিনিজমে কেইট মিলেটের যুক্তি খণ্ডন করে মিলেটের নিজস্ব টার্ম এবং কনসেপ্ট ব্যাবহার করে। সেক্স এবং জেন্ডার – ফেমিনিজমের ভাষায় দুটো ভিন্ন বিষয়। জেন্ডার জন্মসূত্রে প্রাপ্ত, বা বায়োলজিক্যাল। অপরদিকে সেক্স সামাজিকভাবে বিনির্মিত। সিমন দ্য বুভ্যুয়া তার দা সেকেন্ড সেক্স বইতেও একই কথা বলেছেন – ‘one is not born a woman; rather, one becomes a woman’। মিচেল এই কথার সূত্র ধরে ফ্রয়েডকে ডিফেন্ড করেন এই বলে যে – ফ্রয়েডও তার সাইকোঅ্যানালাইসিস থিওরিতে নারীত্বকে প্রকৃতিপ্রদত্ত বা জন্মগত কিছু বলে উল্লেখ করেন নি। ফ্রয়েড তার -থ্রি এসেস অন দা থিওরি অফ স্যাক্সুয়ালিটিতে ফেমিনিটি সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা সত্ত্বা হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন।

কেউ কেউ অবশ্য ফ্রয়েডের পীঠ বাঁচানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন সাইকোঅ্যানালাইসিস রক্ষা করাকে। যেমন জেইন গ্যালপের ১৯৮২ সালের বই ফেমিনিজম অ্যান্ড সাইকোঅ্যানালাইসিসে তিনি ফ্রয়েডিয়ান সাইকোঅ্যানালাইসিসের বদলে নারীবাদী দার্শনিকদের ল্যাকানের সাইকোঅ্যানালাইসিস ব্যাবহারে উদ্বুদ্ধ করেন। ল্যাকানিয়ান সাইকোঅ্যানালাইসিসেও পুরুষ নারীর থেকে সামাজিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে চিহ্নিত, কিন্তু “phallus” তথা লিঙ্গের ব্যাবহার – যেটা পুরুষকে নারী অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী অবস্থানে নেয় বলে বলা হয়ে থাকে- ল্যাকান সেটাকে জৈবিক একটি অঙ্গ হিসেবে না দেখিয়ে সামাজিক ক্ষমতার মাপকাঠি হিসেবে দেখিয়েছেন। সেই অর্থে সামাজিক প্রতিপত্তি না থাকলে একজন পুরুষ phallus থাকা সত্যেও দুর্বল হতে পারে, আর একজন নারী phallus না থাকলেও সামাজিক প্রতিপত্তির প্রভাবে শক্তিশালী হতে পারে।

উক্ত বিতর্কের পরিসমাপ্তি টানা যায় রোল্যান্ড বার্থেসের কৃত একটি উক্তি থেকে –

“The monument of psychoanalysis must be traversed- not bypassed” (Feminist Literary Criticism, ed. Mary Eagleton, p. 214)

ফেমিনিস্ট ক্রিটিসিজম বলতে আসলে কি বোঝায়?

ফেমিনিস্ট ক্রিটিক যারা তারা উক্ত কাজগুলি করেন –

১। প্রচলিত লিটেরারি ক্যানন পুনঃপাঠ-পুনর্বিবেচনা করা এবং মহিলা লেখকদের সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম সে আলোকে পাঠ করা।

২। নারীদের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন।

৩। পুরুষ এবং নারীর রচনায় নারীর উপস্থাপনের মূল্যায়ন।

৪। নারীকে প্রাথমিকভাবে মানুষ হিসেবে চিহ্নিত না করে ভিন্ন একটি সত্ত্বা বা অপূর্ণ সত্ত্বা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

৫। বিদ্যমান সাহিত্যে নারী- পুরুষের পাওয়ার রিলেশনের অংশগুলি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ এবং এ বিভাজন ভেঙ্গে ফেলার প্রচেষ্টা করা।

৬। নারী ও পুরুষের ভাষার ব্যাবহারে ভিন্নতার দিকে লক্ষ্য রাখা। ভাষার রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া, সচেতন করা।

৭। নারী- পুরুষ কি তাদের জৈবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ভিন্ন, নাকি সমাজই তাদের ভিন্নভাবে চিহ্নিত করে? – এ প্রশ্ন তোলা।

৮। ফ্রয়েডের সাইকোঅ্যানালাইসিসের পুনঃপাঠ এবং সেখানে পুরুষ এবং নারী পরিচয়ের বিনির্মাণ চিহ্নিতকরন।

 

সমাপ্তির পথে, ফেমিনিস্ট ক্রিটিসিজম ও আমার ব্যাক্তিজীবন থেকে নেয়া একটি ঘটনা, যা না উল্লেখ করলেই নয়ঃ

ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি আমি আর আমার এক বন্ধু, আলোচনার সুবিধার্থে বলা যাক, সে আমার পুরুষ বন্ধু। মন মত প্রেমিকার খোঁজ না পাওয়ার বহুদিন পর সে সর্বগুণে গুণান্বিতা এক কন্যার দেখা পেয়ে মন দেয়া নেয়ার কাজ সারতে বিন্দুমাত্র দেরী করে না। এ ক্ষেত্রে তার মারভেল কমিক্সের ক্যারেক্টার “ফ্ল্যাশের” গতিতে সাফল্য দেখে আমাদের অনেকেরই মর্মপীড়া সৃষ্টি হয়। তবে বন্ধুর সাফল্যের আনন্দে একসময় সে পীড়ায় ভাটা পড়ে যায়।

প্রেমিকার উচ্ছসিত বর্ণনায় বন্ধু সবসময় পঞ্চমুখ। তার প্রেমিকা পড়ুয়া। প্রচুর বই পড়ে। ইংলিশ সিরিয়াল দেখে একের পর এক। হঠাৎ একদিন আমার বন্ধু এসে বলে

– আর ভাল্লাগে না দোস্ত

– (আমি কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে। বুঝতে পারলাম, সে তার রিলেশনের দিকে ইঙ্গিত করেই কথা বলছে, কারণ সাম্প্রতিক আলোচনা তার সাথে আমার ছিল এটা নিয়েই) কি হল তোর? অ্যাদ্দিন সুখে থাকার পর হঠাৎ আজ এই কথা?

– আচ্ছা ক’ তো, পিএমএস কি আমাদের মা বোনদের হয় না? ওরা তো কখনো এইরকম করেনা এইটা নিয়া আমার সাথে। কিন্তু আমার গার্লফ্রেন্ডের পিএমএস হইলে সে কেন আমার সাথে খালি ট্যানট্রাম থ্রো করে আর বলে যে তার এইটা সেইটা ক্রেভিংস হয়? আজগুবি সময়ে আজগুবি খাবার খাইতে ইচ্ছা করে, গা হাত পা ব্যাথা করে?

– তুই কি পাগল, তোর মা বোন – তাদের পিএমএসের এক্সপিরিয়েন্স নিয়ে তোর সাথে কথা বলবে কেন? (পিএমএস কি বুঝতে গুগোল করুন পাঠক)

– আচ্ছা, তাও ঠিক। (কিছুটা চিন্তা করে) কিন্তু, এই বিষয় নিয়ে কান্নাকাটি করা তো বাঙ্গালী মেয়েদের অভ্যাসে ছিল না। এই অঞ্চলের কন নাটক – নভেলে তো আমি কন নায়িকারে নায়কের কাছে পিএমএসের সময়কার হরমনাল চেঞ্জ নিয়ে কান্নাকাটি করতে দেখি নাই। এই নিয়ে আমি কিছু বলতে গেলেই আমারে ইংলিশ নভেলের রেফারেন্স দেয়। বলে যে পইড়া দেখো এই সব নভেলে নায়িকাদের পিএমএস চলা কালে বা নায়িকারা প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলে নায়কের সাথে কিরকম আচরণ করে, ওদের কি রকম মুড সুইং হয়, হরমনাল চেইঞ্জ হয়। বই মনে হয় আমরা পড়ি নাই, সব ও ই পড়সে।

এরপর আমি যখন ওকে জিজ্ঞেস করলাম কি বইয়ের রেফারেন্স ও দেয় এবং তার রাইটারের নাম কি আমার বন্ধু আমাকে বলার পর নেটে সার্ফ করে দেখলাম অধিকাংশ রাইটারই ফিমেল। অর্থাৎ নারী।

এইখানে আমি আমার চিন্তার খোরাক পেলাম। আমার বন্ধুর গার্লফ্রেন্ড তার পিএমএস চলাকালে ওর সাথে রাফ আচরণ করে। পিএমএসে হরমোনাল চেইঞ্জের সাথে মুড সুইং হয় – আমার বন্ধু সেটা বিশ্বাস না করলে আমার বন্ধুর প্রেমিকা তাকে উপন্যাসের রেফারেন্স দেয়। আমার বন্ধু বলে যে গল্প উপন্যাস সে আগেও পড়েছে, তাতে নারী চরিত্রও আছে, কিন্তু সেখানে পিএমএস চলাকালে নারী চরিত্রগুলি কেমন আচরণ করে – তার কোন সাইকোলজিক্যাল বর্ণনা নেই। তার কারণ – আমার বন্ধুর পঠিত বাংলা সব টেক্সট পুরুষ রাইটারদের লিখিত। কিন্তু আমার বন্ধুর প্রেমিকার পঠিত নভেলগুলির লেখিকা নারী হওয়ায় নারীর প্রাত্যাহিক জীবনের আনুসাঙ্গিক ঘটনাগুলোর যথার্থ বর্ণনা উঠে আসে। কাজেই এই ব্যাখ্যা বা এই বর্ণনা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। উপায় নেই বন্ধুর প্রেমিকার দাবী প্রত্যাখ্যানেরও। বন্ধুকে বললাম সে যদি তার প্রেমিকার সাথে এই সূত্রে খারাপ ব্যাবহার করে থাকে, তবে যেন সে তার আচরণের জন্যে সরি বলে।

এভাবেই, আরও নিখুঁতভাবে নারীর জীবন, নারীর সমস্যা, সামাজিকভাবে নারীর পুরুষতান্ত্রিক উপস্থাপনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী লিটেরারি এবং ক্রিটিক্যাল ক্যানন হিসেবে উঠে আসে ফেমিনিজম – আজকের নারী দিবসে এই আমার কামনা।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

আমার এই প্রবন্ধে ব্যাবহৃত তাত্ত্বিক আলোচনার প্রায় পুরো অংশটুকুই পিটার ব্যারির বই Beginning Theory – An Introduction to Literary and Cultural Theory থেকে নেয়া।

Related Posts

About The Author

Add Comment