বইমেলা ২০১৬ – মিলিত হই প্রাণের টানে

“জাত গেল জাত গেল বলে – একি আজব কারখানা
সত্যকাজে কেউ নয় রাজি – সবি দেখি, তা না না না”

গায়ে সবুজ রঙ্গা পাঞ্জাবীটা চড়াতে চড়াতে গুণ গুণ করে গাইছিলাম গানটা, আর ভাবছিলাম নানা কথা। আজ পহেলা ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সালের বই মেলার প্রথম দিন, তাই একটু ধোপদুরস্ত পোশাকে মেলায় যাবার পরিকল্পনা।
.
ভাবছিলাম সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের লেখালিখি এবং সাহিত্যচর্চা নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠছে – সেগুলো নিয়ে। হুমায়ূন আহমেদ নেই, সৈয়দ হক- হাসান আজিজুল হকেরা আর আগের মত লিখছেন না। তাদের আগ্রহ সভা সমাবেশে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করায়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস- সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ- শওকত ওসমানেরা চলে গেছেন বহু আগে। বাজার এখন ইমদাদুল হক মিলন আর আনিসুল হকের দখলে। নূতন লেখকদের মধ্যে চোখে পড়ার মত কেউ উঠে আসছে না- ইত্যাদি কথা প্রায়ই শুনি, লেখায় চোখে পড়ে। আমার মাথায় ঘোরে লালন ফকিরের গান – “সত্য কাজে কেউ নয় রাজি, সবি দেখি তানানানা”
.
যারা এ সমস্ত অভিযোগ তোলেন, তাদের অভিযোগের জবাব কিন্তু লালন ফকিরের এই গানের মধ্যেই নিবদ্ধ। বাংলা সাহিত্যের জাত গেলো বলে যারা ধুঁয়া তুলছে – তারা নিজেরা বাংলা সাহিত্যকে জাতে তোলার দায়িত্ব কাঁধে নিতে চান কি? যদি আমি নিজে সাহিত্য না রচনা করি, অথবা যারা সমসাময়িক লেখক, তাদের লেখা একেবারেই না পড়ি বা পড়ে একটা চিন্তাপ্রসূত feedback না দিই, কেবলি ভাসাভাসা জ্ঞানের ভিত্তিতে জাত গেল জাত গেল রব তুলি – এতে করে বাংলা সাহিত্যের ওপর কোন ইতিবাচক প্রভাব রাখা হয় না।
.
আমাদের মনে রাখা উচিৎ – বই কেবলমাত্র গৃহবধুর অলস দুপুরের সময় কাটানোর খোরাক নয়, একটা বই কেবল তার টাইটেল আর ফ্ল্যাপে লেখা synopsis পড়ে তার ওপর shallow আঁতলামো ঝাড়ার বিষয়বস্তু নয়। আমাদের মনে রাখা উচিৎ যে – এদেশের মেয়েরা প্রথম প্রেমের ভাষা শেখে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস থেকে, পাবলো নেরুদার কবিতা পড়ে ছেলেরা অর্জন করে প্রেমিকাকে প্রথমবারের মত প্রেম নিবেদনের স্পর্ধা। ওয়ালীউল্লাহ- আখতারুজ্জামান- শওকত আলী এবং ওসমান- রশিদ করিম- শহিদুল জহির পড়ে আমরা সবাই আমাদের চারপাশটাকে নূতন করে চিনতে শিখি। আমাদের আন্দোলনের ভাষা নজরুল- শামসুর রাহমানের কাছ থেকে শেখা, আমাদের প্রার্থনার ভাষা রবীন্দ্রনাথ- আল মাহমুদের কাছ থেকে ধার করা।
.
প্রিয় পাঠক, পছন্দের লেখকেরা চলে গেছে, কিন্তু তাদের সমস্ত চিন্তাভাবনা তারা লিপিবদ্ধ করে গেছেন গ্রন্থাকারে। বই পড়ে তাদের সাথে পরিচিত হন। একটা বই পড়ে শেষ করার পর আপনি আর আগের আপনি থাকেন না। বইয়ের পাতায় বদ্ধ জ্ঞান আর আপনার মস্তিস্কের অনুরণনে আপনি লেখকের সাথে যে সংলাপ বিনিময় করবেন – তা আপনাকে পরিণত করবে আলোকিত এক মানুষে।
.
নূতন লেখকদের মধ্যেও অনেকেই ভালো লেখেন। অনেক ভালো লেখেন। তাদের বইও এবারের বইমেলায় আপনাদের বই সংগ্রহের লিস্টিতে রাখুন। আমার নিজের বই – আয়াজ আলীর ডানা , প্রকাশিত হচ্ছে শব্দশিল্প প্রকাশনী থেকে। স্টল নং – ৪৯২-৪৯৩, সোহরাওয়ারদি উদ্যানে। আপনাদের সাথে দেখা হবার এবং মত বিনিময়ের অপেক্ষায় থাকবো আমি, সম্ভব হলে মেলার প্রতিদিনই। আজ মেলায় হাজির আছি বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে।
.
প্রিয় পাঠক, গুরু দায়িত্ব আপনার কাঁধে। হায় হুমায়ূন- হায় হুমায়ূন করে কারবালার মাতম তোলার দায়িত্ব প্রকাশকদের কাঁধেই থাকুক। কিংবদন্তী এক লেখকের সাথে অন্যায্য একটা মাপের পাল্লা দাঁড় করিয়ে নূতন লেখকদের পাওনা, দাবি দাওয়া এড়িয়ে যাওয়াটা সহজ হয় এতে করে তাদের জন্যে। নূতন লেখকদের একটা সুযোগ, যদি বাংলা সাহিত্যের কথা আদৌ চিন্তা করেন, তবে তা আপনাকেই করে দিতে হবে।
.
-সাজিদ উল হক আবির
১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,
বিকেল ৪টা ১০,
উত্তর কমলাপুর, বাজার রোড, ঢাকা।

Related Posts

About The Author

Add Comment