বই পরিচিতিঃ দ্যা গুড আর্থ

১৯৩৮ সালে তাঁকে নোবেল প্রদানের কারণ হিশেবে বলা হয়- “For her rich and truly epic descriptions of peasant life in China and for her biographical masterpieces”. ১৯৩২ সালে পুলিৎজার পুরস্কার প্রদানের আগেও ছোড়া হয় প্রায় একইরকম কৈফিয়ত। এতোকিছুর পেছনে অন্যতম ভূমিকা ছিলো ১৯৩১ সালে প্রকাশিত একটি বই- দ্যা গুড আর্থ। এখানেই শেষ নয়। উপন্যাসটি ১৯৩১ এবং ৩২ সালে আমেরিকার বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত। লেখিকা পার্ল এস বাক- এর ট্রিলজি “হাউস অব আর্থ” এর প্রথম দফা “দ্যা গুড আর্থ”। অপর দুটি যথাক্রমে “সন্স” এবং “এ হাউস ডিভাইডেড”।
এক কথায় বলতে গেলে চীনের প্রত্যন্ত পল্লীতে একজন প্রান্তিক কৃষকের উত্থানের আখ্যান “দ্যা গুড আর্থ”। দরিদ্র নায়ক ওয়াং লাং এর বিয়ে দিয়েই আনুষ্ঠানিক শুরু ঘটেছে। পাত্রী পাশের হুয়াং জমিদার বাড়ির দাসী ও-লান। স্বভাব নিঃস্তব্ধ ও-লানের আগমন ওয়াং লাং এর জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটায়। মনোযোগী চাষী ওয়াং একের পর এক সাফল্যের সাথে ফসল তুলতে থাকে। পাশাপাশি ক্ষয়িষ্ণু জমিদারের জমি ক্রয় করে বৃদ্ধি করতে থাকে নিজের পরিধি। স্ত্রী ও-লান অনুরূপ সাফল্যের সাথে শ্বশুরের সেবা করেও মাঠে হাজির হয় ওয়াং লাং এর সাহায্যার্থে। ত্রুটি ঘটেনা বছর বছর সন্তান জন্মদানেও।
হঠাৎ কাল হয়ে দাড়ায় দুর্ভিক্ষ। মৃতের মিছিল ডিঙিয়ে ওয়াং পাড়ি জমায় দক্ষিণে। স্ত্রী-পিতা-সন্তানেরা বেঁচে থাকার জন্য বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তি আর ওয়াং রিক্সা চালানো। পথের ধারে পরে থেকে হলেও একেবারে খারাপ যাচ্ছিলো না দিন। কিন্তু এবার বাঁধা হয়ে দাড়ায় বিপ্লব আর বিশ্বযুদ্ধের দামামা। যদিও ওয়াং বুঝতে পারে না এতোকিছু। বিদেশী ধনীদের উপর ক্ষেপে থাকা দেশীয় সাধারণ মানুষেরা একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে।
অস্থিতিশীলতায় যখন না খেয়ে মরা অবস্থা, তখন হঠাৎ প্রসন্ন হন ভাগ্যদেবতা। পাশের এক অভিজাত বাড়িতে আক্রমণ করে হিংস্র সাধারণ মানুষ। যে যা পারে লুটে নিতে ব্যস্ত। ওয়াং তখন মালিককেই দেখতে পায়। বাঁচার জন্য লোকটি ওয়াংকে সমর্পণ করে সমস্ত অর্থ। ঠিক এই সময়ে ও-লানও বাড়ীর গোপন কোঠর থেকে মুক্তা উদ্ধার করে নিজের বুকে লুকিয়ে রাখে।
এবার সপরিবারে বাড়ি ফিরে ওয়াং। ক্রমে বাড়িয়ে অর্থ খাটাতে শুরু করে জমিতে। প্রতিবেশী চিং এর জমিকে অন্তর্ভুক্ত করে চিং কে কাজে লাগায়। দুর্ভিক্ষের সময় ডাকাত এসে জমিদারের পতনপথে শেষ আঘাত করে গেছে। এসুযোগে ও-লানের বয়ে আনা মুক্তা দিয়েই জমিদারের বাকি জমি করায়ত্ত করে ওয়াং। তীব্র গতিতে বাড়তে থাকে অর্থ-প্রতিপত্তি। বড় ছেলে নাং এন আর মেজো ছেলে নাং ওয়েনকে ভর্তি করে দেয় স্কুলে।
ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে ওয়াং নিজেও। কৃষকের বেশ বদলে সাহেবি বেশ আনে চালচলনে। স্ত্রী ও-লানকে ফেলে শহরে পতিতালয়ে গমন শুরু করে। লোটাস নামের এদেরই একজনকে ঘরে নিয়ে আসে উপপত্নী হিশেবে। বরাবরের মতো এবারও ও-লান কিছু বলেনা। শুধু মুখ বুজে কাঁদে। এদিকে বউ আর পুত্র নিয়ে অভিশাপের মতো হাজির হয় কাকা। নৃশংস ডাকাত দলের একজন বলে কিছু বলতে পারেনা ওয়াং।
সন্তানেরা বড় হয়। নাং এনের বিয়ে হয় শহুরে বণিককন্যার সাথে। ব্যবসায়ী ওয়েন বিয়ে করে গ্রামেই। ছোট মেয়েটাকেও বিয়ে দেয়া হয় ঘটা করে। থাকার জন্য জমিদারবাড়িটা ভাড়া নেয়া হয়। সন্তানেরা সেখানে গেলেও মাটির টানে আগের বাড়িতেই আটকে থাকে ওয়াং। এদিকে উপর্যুপরি স্ত্রী ও-লান, আর পিতার মৃত্যুতে ভেঙে পড়ে তার জগৎ। স্মৃতির পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে দিন কাটতে থাকে।
ডাকাত কাকার মৃত্যু আর তার কুপুত্র যুদ্ধের নামে ঘরছাড়া হলে হাফ ছেড়ে বাঁচে ওয়াং। কিন্তু অশান্তির ইতি কি খুব সহজে ঘটে? বিপরীত স্বভাবের দুই পুত্রের মতবিরোধিতায়, পুত্রবধূদের প্রতিযোগিতায় ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয়। এর সাথে যোগ হয় ছোটপুত্রের বিপ্লবে যোগদানের হুজুগ। মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী বড় মেয়েটা ছাড়া একরকম সবাই তাকে চিন্তার গরম চুল্লীতে ফেলে রাখে।
ক্রমে নাতি-নাতনীতে ঘর ভর্তি হয়ে আসে। ওয়াং পরিবার এখন রীতিমতো জমিদার। কিন্তু মাটিপ্রেমিক ওয়াং শান্তি পায় না। সবচে বড় আঘাত আসে চিং এর মৃত্যুতে। বুঝতে দেরি হয় না, তার সময়ও খুব বেশি দূরে না। এতোকিছুর পরেও উপপত্নী লোটাসের বালিকা দাসী পিয়ার ব্লুজম-এর প্রতি দুর্বল হয়ে পরে সে। জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নতুন একজনকে ঘরে আনে।
ছোট ছেলে সত্যিই বিপ্লবে অংশ নিতে চলে যায়। বড় ছেলেরা ব্যস্ত হয়ে পরে নিজেদের আখের গোছাতে। বিছানায় পরে ওয়াং নিজের বোবা মেয়েটাকে পিয়ার ব্লুজম-এর হাতেই তুলে দিয়ে মৃত্যুর দিন গুণে। একদিন বিছানায় পড়ে থাকা অবস্থায়ই পুত্রদের ফিসফিসানি শুনতে পায় জমি বিক্রি করার জন্য। চিরকাল মাটি আগলে রাখা ওয়াং আর্তনাদ করে উঠে। বাঁধা দেয়। পুত্রেরাও কথা দেয় জমি বিক্রি না করার। কিন্তু তাদের নিজেদের ভেতরে পাকা কথাটা ওয়াং টের পায়না। “They say that they will do as he wishes, but smile knowingly at each other.”
ট্রিলজি-র দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দফায় ওয়াং পরিবারের উত্থান-পতনের আখ্যান চললেও আমাদের উপন্যাস এখানেই ইতি ঘটেছে। ইতি ঘটেছে ওয়াং লাং এর জীবনের বিচিত্র আখ্যানের।
শুধুমাত্র একটা ক্যারেক্টার জড়িয়ে ধরে শুরু থেকে শেষ অব্দি পৌঁছানো সত্যিই অভাবিত। তদুপরি গ্রামীণ সমাজ, সম্পর্কের টানাপড়েন, আচারবিধি, জীবনবোধ, ধর্মবিশ্বাস, শ্রেণিসংগ্রাম এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে এমন দক্ষভাবে উপস্থাপনের নজীর খুব বেশি নেই। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, পুরো উপন্যাসের আবহ অত্যন্ত ঘরোয়া মনে হবে যে কোনো বাঙালি পাঠকের কাছে।
এতোকিছুর পরে একটু উল্টো কথা বলাটা দুঃসাহস হবে। তবুও বলতে হয়, ওয়াং ছাড়া প্রায় সব চরিত্রই তাদের প্রভাব সম্পূর্ণ প্রয়োগ করতে পারেনি। যে ইস্যুগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, তাদেরকে আরেকটু স্পষ্ট করতে পারতেন লেখিকা। সর্বোপরি ওয়াংয়ের উপরে উঠার পথ যেনো একটু বেশি সহজ হয়ে গেছে।
যাহোক, বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে “দ্যা গুড আর্থ” অবশ্যই একটা বিশেষ স্থান লাভের দাবীদার। যেকোনো চিন্তাশীল পাঠক এর ঘটনার বৈচিত্র্য এবং বহুমুখী প্রকাশে অবশ্যই মুগ্ধ হবে। খুব সহজ করে বলতে গেলে- নোবেল আর পুলিৎজার পুরস্কারে যদি প্রমাণিত হয় পার্ল এস বাক শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের একজন; তাহলে “দ্যা গুড আর্থ” প্রমাণ করতে পারবে- এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির একটি।

Related Posts

About The Author

Add Comment