বই পরিচিতিঃ সোফির জগৎ

লেখক- ইয়েস্তেন গার্ডার
অনুবাদ- জি এইচ হাবীব
প্লেটো তাঁর একাডেমিয়ায় যে বক্তৃতা দিতেন, তা শোনার জন্য এথেন্সবাসী হুমড়ি খেয়ে পড়তো কিনা জানা নেই। কিন্তু একটা কথা সত্য। দর্শন তেতো বলে যতোটুকু দুর্নাম আছে, জাত নিমের পাতার নামেও অতোটুকু নেই। মাথার চুল না খসলে নাকি দর্শন কেবল মাথার উপর দিয়েই যায়- এটাই সাধারণ পাঠকের দৃঢ় বিশ্বাস। যাহোক, এই বিশ্বাসকে ভাঙতেই লেখা হয়েছে সোফি’জ ওয়ার্ল্ড। প্রাণবন্ত উপন্যাসের ঢঙে দর্শনের মতো গম্ভীর কিছুকে উপস্থাপনের নজীর পূবে বা পশ্চিমে আর নেই। ইয়েস্তেন গার্ডারের লেখা বইটি প্রকাশের পর শুধু বেস্টসেলারই হয়নি, বরং বিশ্বব্যাপী দর্শনের পাঠক আশাতীতরকম বাড়িয়ে দিয়েছে।
যেহেতু একই সাথে উপন্যাস আর পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস, সেহেতু উপন্যাসের হাতে ধরেই শুরু হয়েছে মূলগল্প। সোফি এমুন্ডসন নামের চৌদ্দ বছরের মেয়ে স্কুল থেকে ফিরেই ডাকবাক্সে একজোড়া চিঠি পায়। আলবার্টো নক্স নামের এক রহস্যময় ব্যাক্তির প্রশ্ন “তুমি কে?” দর্শনের এই চিরন্তন প্রশ্নে হারিয়ে যায় সোফি। এদিকে একের পর এক আরো চিঠি আসতে থাকে। শুরু হয় একজন দর্শন শিক্ষক আর এক দর্শনাগ্রহী বালিকার বন্ধুত্ব।
আলবার্টো প্রাথমিক আলোচনা শেষ করেই চলে যান প্রকৃতিবাদী দার্শনিকদের প্রসঙ্গে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে সৃষ্টি নিয়ে বিরোধ বাঁধে পার্মেনিদেস এবং এম্পিডক্লিসের মধ্যে। আশ্চর্যজনকভাবে ডেমোক্রিটাস দেন পরমাণু মতবাদ। এর পর আসেন মহাজ্ঞানী সক্রেটিস। অবশ্য এর আগেই সোফিস্টরা এসে দর্শনের মুখ প্রকৃতি থেকে মানুষের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। সক্রেটিস উপহার দিলেন একটা বিপ্লব। যদিও বিনিময়ে হেমলকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
এলেন সক্রেটিসের ছাত্র প্লেটো। ভাববাদী প্লেটো শাশ্বত সত্য আর আত্মা নিয়ে ধারণাকে অনন্য উচ্চতায় তুলে দিলেন। এরিস্টটল রাক্ষসের মতো জ্ঞানের সব গ্লাসে একটা করে চুমুক মেরেছেন। দর্শনও রক্ষা পেলো না। নীতিবিদ্যার জন্মদানসহ দিয়ে গেলেন নতুন অনেক চিন্তার খোরাক। তারপর বিরাগী, স্টোয়িক, এপিকিউরান, মরমীবাদী প্রভৃতির প্রভাবে বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠে ইউরোপ।
এর পরবর্তী ইতিহাসে ধর্ম দারুণভাবে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। প্রথমে ইহুদী তারপর সেন্ট পলের বিস্তারশীল খ্রিষ্টধর্ম প্রবেশ করে ইউরোপে। সবিশেষ আরব মুসলমানদের স্পেনদখল ইউরোপকে পরিণত করে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দুই সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র হিশেবে। প্রস্তুত হয় রেনেসাঁর ক্ষেত্র।
রেনেসাঁ জন্ম দেয় একটা নতুন ধর্মবোধ। গীর্জার চৌকাঠ ছেড়ে ঈশ্বর অনেকটাই ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত হলো মানুষের বিশ্বাসে। মার্টিন লুথার কিং এবং রটারডাম ইরাজমাসের মতো সংস্কারকরা ধর্মকে পাদ্রীদের পুথি থেকে সাধারণ সমাজে মিশিয়ে দিলেন।
এদিকে উপন্যাসটাও কিন্তু দর্শনের ইতিহাসের পাশাপাশি চলছে। রহস্যজনকভাবে সোফির কাছে আলবার্ট ন্যাগ নামের এক মেজরের চিঠি আসা শুরু করেছে। চিঠিগুলো হিল্ডা নামে তার বয়েসী এক বালিকার উদ্দেশ্যে লেখা। অসম্ভব রকমের কাকতালীয়তা নিয়ে আসা লেখাগুলো তাকে চিন্তান্বিত করে তুলে। তথাপি সোফির দর্শন-পৃথিবী আলবার্টো আর তার কুকুর হার্মেসের সাথেই আবদ্ধ।
সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে অর্থাৎ রেনেসাঁ পরবর্তী যুগের নাম বারোক বা নিয়মহীনতা। জীবন সম্পর্কে এই যুগের প্রধান অস্ত্রই ছিলো থিয়েটার। কার্পে দিয়েম বা আজকের জন্য বাঁচো- এই কথাটাই ছিলো মুলমন্ত্র। স্পেনিশ নাট্যকার কলদেরন দে লা বার্কা, কবি পিটার ডাস, লুদভিগ হোলবার্গ এমনকি শেক্সপিয়ার এই যুগের পুরোধা। একই সঙ্গে আইডিয়ালিজম এবং ম্যাটারিয়ালিজমের কথা বলাই বারোকের বৈশিষ্ট্য।
সেই সক্রেটিস থেকে যে রেশনালিস্ট বা বুদ্ধিবাদী ধারার সূচনা হয়, তার এই পর্যায়ে দেখা দেন দেকার্ত। এই দ্বৈতবাদী দার্শনিক “ডিসকোর্স ইন মেথড” বইয়ের মাধ্যমে দুটি সিদ্ধান্তে পৌছেন। প্রথমত “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি”। দ্বিতীয়ত একটা নিখুঁত সত্ত্বার (ঈশ্বর) অস্তিত্ব আছে। অতঃপর ইহুদী দার্শনিক স্পিনোজার আবির্ভাব। “ইথিক্স জিওমেট্রিকেলি ডেমনস্ট্রেটেড” বইয়ের মাধ্যমে জোর গলায় বুঝাতে চেয়েছেন, ঈশ্বরই জগৎ। দেকার্তের দ্বৈতবাদ আর সাবস্টেন্স ধারণা দুটোরই বিপরীত অবস্থান নিয়েছিলেন তিঁনি।
এরপর অভিজ্ঞতাবাদী জন লকের কাল। “কনসার্নিং হিউমেন আন্ডারস্ট্যান্ডিং” প্রকাশের মাধ্যমে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, আমরা তাই চিন্তা-চেতনায় ধারণ করি, যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আহরিত। সুতরাং ঈশ্বর, চিরন্তনতা এবং সারবস্তু নিয়ে কথা বলাটা নেহাৎ প্রজ্ঞার অপপ্রয়োগ”। ডেভিড হিউম আরেকজন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক। প্রকৃত অজ্ঞাবাদীর (agnostic) মতোই যে ভাবের উৎসে অনুরূপ ইন্দ্রিয়ের প্রত্যক্ষণ পাওয়া যায়না, তা তিনি বর্জন করেছেন।
উপন্যাসের প্রবাহমানতাও কিন্তু বাধাগ্রস্ত হয়নি। ঘটনাক্রমে সোফি আলবার্টোর কাছে এক অদ্ভুত সত্য জানতে পারে। সোফি এমুন্ডসন কিংবা আলবার্টো নক্স- দু’জনেই একটা নিছক উপন্যাসের চরিত্রমাত্র। আলবার্ট ন্যাগ নামে কোন এক মেজর তাঁর মেয়ে হিল্ডার জন্মদিন উপলক্ষ্যে বইটি লিখছেন। দর্শন শেখানোর জন্য। এবার ছাত্রী-শিক্ষক চেষ্টা শুরু করে লেখকের ভাব থেকে মুক্ত হতে।
এদিকে বার্কলে এসে স্বপ্ন আর বাস্তবতা নিয়ে ঘাটাঘাটি করেছেন বহুদূর। সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন সময় এবং স্থান এর পরম অস্তিত্ব আছে কি না। তিঁনি স্পিরিট বা চিদাত্মায় বিশ্বাস করতেন। অতঃপর আলোকপ্রাপ্তির যুগ ভলতেয়ার আর রুশোর মতো প্রথম সারির চিন্তকেরা জেগে উঠলেন, প্রকৃতির কাছে ফিরে চলো- মন্ত্রে। বুদ্ধিবাদের উপর ভর করেই এসেছিলো ফরাসি বিপ্লব।
কান্ট বিশ্বাস করতেন আমরা কী জানতে পারি, তার একটা সীমারেখা আছে। অন্যকথায় আমরা যা বুঝি, তার বাইরেও প্রজ্ঞা কাজ করে। সত্যি বলতে কি, বুদ্ধিবাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদের ভেতরকার দীর্ঘ বিতর্কের অবসান টানতে পারার জন্যই কান্ট দর্শনে বেশি সমাদৃত। এরপর রোমান্টিসিজম। রোমান্টিকরা তাদের উৎস হিসেবে স্পিনোজা, ব্রুনো আর ব্যোমের কাছে ফিরে যাচ্ছিলেন। যার মূলকথা হলো- প্রকৃতির ভেতরেই স্বর্গীয় অহম। শেলিং ছিলেন এ ধরনের দার্শনিক।
এদিকে সোফি এমুন্ডসন আর আলবার্টো নক্স লেখক মেজরের প্রভাব থেকে বেড়িয়ে আসার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। চেষ্টা করছে উপন্যাসের পাঠিকা হিল্ডার দৃষ্টি আকর্ষণের। যাহোক, দর্শনের এপর্যায়ে আবির্ভাব ঘটে হেগেলের। তাঁর ধারণা, চিরন্তন প্রজ্ঞা বলে আদতে কিছু নেই। প্রবাহমান সময়ের সাথে পরিবর্তন ঘটে মানুষের বোধেরও। অনেকটা নদীর মতোন। কিয়ের্কেগার্ড কিন্তু ঘোর বিরোধিতা করলেন এর। ব্যক্তি অস্তিত্বের জোর চিৎকারই বারবার ফুটে উঠেছে তাঁর গলায়। গৌতম বুদ্ধের মতোই যুক্তি দিয়েছেন ব্যক্তির মুক্তি নিয়ে। হেগেল সম্পর্কে তাঁর একটা উক্তি, “হেগেল ভুলে গিয়েছিলেন, সবার আগে তিঁনি একজন মানুষ।”
এরপর এলেন সভ্যতার মোড় পাল্টে দেয়া তিনজন বিবর্তনবাদী। জীববিবর্তন নিয়ে ডারউইন, সামাজিক বিবর্তন নিয়ে কার্ল মার্ক্স এবং মনোবিবর্তন নিয়ে সিগমন্ড ফ্রয়েড। মানুষ জানতে পারলো তাঁর জন্মের প্রক্রিয়া, বেঁচে থাকার ইতিহাস আর মানসিক উত্থান-পতনের ব্যাখ্যা। পরিশেষে জানানো হয়েছে দর্শনের বর্তমান অবস্থা এবং দর্শনের পক্ষ থেকেই স্টিফেন হকিংয়ের বিগ ব্যাং থিউরির জবাব।
উপন্যাস কিন্তু শেষ হয়নি। সোফি আর আলবার্টো লেখকের ভাবজগত থেকে মুক্তি পায় একসময়। কিন্তু হারিয়ে ফেলে নিজেদের চিরাচরিত পরিচয়। হয়তো বুঝতে পারে, কেবল লেখকমনের কল্পনার ভেতরেই তাঁদের অর্থময় জগৎ আর জীবন দুটোই। তাহলে এই বস্তুজগৎ আর মানবজীবনও কি কোনো এক লেখকের(ঈশ্বর) মনের নিছক কল্পনা?

সোফির জগৎ
ধরি ধরি করেও যারা দর্শনপাঠ শুরু করতে পারে নি, নিঃসন্দেহে সোফির জগৎ তাদের প্রথম বই হতে পারে। অনেক দার্শনিক বিয়ে না করে দর্শনকেই কেনো বউ করে নেন, উত্তরটা পাওয়া যেতে পারে। দর্শন নিমের পাতা নাকি অমৃত? আশা করি এর জবাবও গোপন থাকবে না।

Related Posts

About The Author

Add Comment