বই পরিচিতি : আট কুঠুরি নয় দরজা

আট কুঠুরি নয় দরজা -লেখক ও সুসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় লেখা একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। লেখকের অন্যান্য উপন্যাসের মতই এই বইয়েও রয়েছে রাজনৈতিক বিপ্লবের গল্প। বিপ্লব, বিপ্লবী, স্বৈরাচারী ও সাধারণ জনতার নানাবিধ কর্মকাণ্ড ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দারুণ মিশেল ঘটেছে এই বইটিতে।

ভারতের পার্শ্ববর্তী এক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার উপর ভিত্তি করে এই উপন্যাসের প্লট তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের পুতুল রাজার দুর্বলতার সুযোগে শাসন বোর্ড ও তাদের নিযুক্ত মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক সারাদেশে একটি স্বৈরাচারী ও পুলিশী শাসনব্যবস্থা চলমান। তবে, সবকিছু ছাপিয়ে অদৃশ্য ও রহস্যময়ী এক “ম্যাডাম” কিভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন, তা এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় রহস্য। এছাড়া, রাজধানী শহরের পুলিশ কমিশনার ভার্গিস, মিনিস্টার, বোর্ড, ম্যাডাম -এই চতুর্মুখী শক্তির ক্ষমতার ব্যবহার-অপব্যবহার রাজ্যের সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করেছে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক সরকার না থাকায় রাজ্যজুড়ে পুলিশী জুলুম নির্যাতনের মাত্রা চরমে উঠে এসেছে। গ্রামের নিরস্ত্র, নিরীহ সাধারণ মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা, নারী ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ফলে চরম অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ফলে, রাজ্যের কিছু নির্যাতিত ও মুক্তিকামী যুবক সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেয়। সাধারণ মানুষের নিরঙ্কুশ নৈতিক সমর্থন নিয়ে বিপ্লবী দলের নেতা ও এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আকাশলাল সশস্ত্র সংগ্রামে পুলিশের সাথে পেরে উঠেন না। তবে, তাঁর বিশ্বাস একদিন রাজ্যের সব মানুষ তাদের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করবে, তখন তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জিত হবে।

উপন্যাসের বর্ণনা শুরু হয় ভারতীয় এক ডাক্তার দম্পতির পার্শ্ববর্তী ঐ রাজ্য সফরের মধ্য দিয়ে। বিশেষ চিকিৎসা বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ ভারতীয় ডাক্তার স্বজন তার সিনিয়র কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে পার্শ্ববর্তী ঐ রাজ্যে যায়, সাথে স্ত্রী পৃথ্বাকেও নিয়ে যায়। তবে, দীর্ঘ যাত্রাপথে নানান রকম নাটকীয় ও হরর ঘটনার সম্মুখীন হয় তারা।

এদিকে, রাজ্যটির মন্ত্রিপরিষদ, রাজধানী শহরের পুলিশ কমিশনার ভার্গিস সহ সমগ্র প্রশাসনের ঘাম ছুটে যাচ্ছে দেশদ্রোহী বিপ্লবী নেতা আকাশলালকে গ্রেফতার করতে। সারা রাজ্যে আকাশলালের মাথার মূল্য দশলক্ষ টাকা ঘোষণা সম্বলিত পোস্টারিং করা হলেও, কোন মানুষই বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে না।

অন্যদিকে, বিপ্লবী দলের নেতা আকাশলাল ও তাঁর সঙ্গীরা ব্যস্ত তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে আকাশলালাকে। তাদের ধারণা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেই তাঁরা সফল।

উপন্যাসের শেষদিকে লক্ষ করা যায় সেই অসীম ক্ষমতাশালী “ম্যাডাম” সরকারের একজন অদৃশ্য প্রভাবশালী সদস্য হয়েও বিপ্লবীদের শেল্টার দিচ্ছেন। কি তার কারণ? রহস্য জানা যাবে বইয়ের শেষে।

প্রথমদিকে বিপ্লবীদের ধারণানুযায়ী বিপ্লবের সফলতা নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকলেও শেষদিকে দেখা যায় একে একে বিপ্লবীদের সবাই পুলিশের হাতে নিহত হয়। তাদের নেতা আকাশলালের ভাগ্যেও রহস্যময় পরিণতি ঘটে। সবশেষে মনে হয় পুরো উপন্যাসটির সমস্ত ঘটনা যেন একজনের বিচক্ষণ ষড়যন্ত্রের ফসল! কে সেই রহস্যময় ব্যক্তি? জানতে হলে এক নিমেষে পড়তে হবে সমরেশ মজুমদারের এই বইটি।

লেখক : মোঃ মেহেদী কাউসার ফরাজী

Related Posts

About The Author

Add Comment