বই পরিচিতি : সূর্য-দীঘল বাড়ী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মাত্রই শেষ হয়েছে। মন্বন্তর পরবর্তী বিধ্বস্ত বাংলার জীবনযুদ্ধ শেষ হয়নি তবু। অন্যদিকে সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, পুরুষতান্ত্রিকতা এবং ধর্মান্ধতাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে সুবিধাবাদী শ্রেণী। এহেন পরিস্থিতিতে একজন নারীর জীবনসংগ্রাম ও সাংসারিক টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে “সূর্য-দীঘল বাড়ী”। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত কালজয়ী এই উপন্যাসের স্রষ্টা সুসাহিত্যিক আবু ইসহাক।

আকালের ধকল শেষে বাঁচার আশা নিয়ে গাঁয়ে ফিরতে শুরু করে গাঁ-ছাড়া মানুষেরা। ছেলে হাসু আর মেয়ে মায়মুনকে নিয়ে ফিরে আসে জয়গুন নামের একজন মা। সাথে আনে ভাইপো শফি এবং তার মাকেও। ঠাই নেয় পিতার রেখে যাওয়া অভিশপ্ত  ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’-তে। বছরের পর বছর ধরে যে বাড়ী নিয়ে গ্রামময় গড়ে উঠেছে কুসংস্কার-, ‘যে-ই এ বাড়ীতে থাকবে, সে-ই নির্বংশ হবে’। বলে রাখা ভালো, সূর্য-দীঘল বাড়ী বলতে সূর্যের উদয়াস্তের দিকে অর্থাৎ পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি টানা বাড়ীকে বুঝায়।

স্বামী জব্বার মুন্সীর মৃত্যুর কারণে সংসারের চাকা ঘোরানোর দায়িত্ব পড়ে জয়গুনের কাঁধে। হাসু নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশনে কুলির কাজ করে কিছুটা সহযোগিতা করে। কিন্তু চাল কেনাসহ বিভিন্ন কারণে বাড়ীর বাইরে এমনকি ময়মনসিংহ পর্যন্ত যেতে হয় জয়গুনকেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেনে নিতে পারে না এটা। এজন্যই দেখা যায় হাসু মসজিদে হাসের প্রথম ডিম নিয়ে গেলে হুজুরসহ মুসল্লিরা ফিরিয়ে দেয়। অন্যদিকে গদু প্রধানের মতো নারীলোভী মোড়লদের কুদৃষ্টি তো আছেই। জীবনধারণের খাতিরে নির্বিঘ্নে সবকিছু উপেক্ষা করে জয়গুন। উপেক্ষা করতে পারেনা ফেলে আসা ছেলে কাসুর স্মৃতি। পাশের গাঁয়ে করিম বখশের সাথে বিয়ে হয়েছিলো তার। সেই ঘরের ছেলে কাসু। আকালের সময় করিম বখশ জয়গুনকে তালাক দেয়। রেখে দেয় ছেলে কাসুকে।

দশ বছর বয়সী মায়মুনের বিয়ে হয় প্রভাবশালী সোলেমন খাঁর ছেলে উসমানের সাথে। বিয়ের আসরে ছেলে পক্ষ শর্ত জুড়ে দেয়,- ‘জয়গুনকে পর্দার নামে ঘরে বসে থাকতে হবে’। নিরুপায় জয়গুন মুখ বুজে কথা দেয় শুধু মেয়ের সুখের জন্য। কিন্তু সুখ-দুখ নিয়ন্ত্রণ করে হয়তো সমাজের উপর তলার মানুষেরাই। ক’দিন যেতে না যেতেই মায়মুনকে ছেড়া কাপড়ে বাড়ী পাঠিয়ে দেয় শ্বশুরবাড়ীর লোকেরা। অসহায় চোখে শুধু ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা দেখে মা আর মেয়ে।

ঘটনাক্রমে ছেলে কাসুর কাছেও গোপন থাকেনা মায়ের খবর। অবুঝ কাসু ব্যকুল হয়ে ওঠে জয়গুনের কাছে যাবার জন্য। স্বভাবতই করিম বখশ আটকে রাখে ছেলেকে। শত বাঁধাতেও যখন বশে আনতে পারেনা, তখন প্রতিবেশী হারুনের সাথে গোঙাবুড়ির গল্প ফাঁদে। ছেলে যাতে বাড়ী ছেড়ে বের না হয় এজন্য বাড়ীর সামনের গাছে নকল গোঙাবুড়ি বসিয়ে ভয় দেখায়। কাসু ভয় পায় বটে, সাথে সাথে ভয়ানক অসুস্থতার কাছে বন্দী হয়। নানা চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়ে করিম বখশ বাধ্য হয় জয়গুনকে ডেকে পাঠাতে।

ছেলের অসুস্থতার খবর শুনে রাগ করে থাকতে পারেনা জয়গুন। ছুটে যায় কাসুর কাছে। ডাক্তার দেখিয়ে, রাত্রি জেগে পরম স্নেহে সেবা করে সুস্থ করে তুলে কাসুকে। অনেক দিন পর করিম বখশ হঠাৎ নিজের ভুল বুঝতে পারে। জয়গুনকে পুনরায় ঘরে তুলতে চায়। প্রয়োজনে তালাক দিতে চায় বর্তমান স্ত্রী আঞ্জুমানকে। জয়গুন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজের বাড়ী চলে আসে।

এবার আর কাসুকে আটকে রাখে না করিম বখশ। নিজে এসে সূর্য-দীঘল বাড়িতে দিয়ে যায়। পুত্রকে দেখার অজুহাতে প্রতিদিন দুধ নিয়ে আসে। শফির মায়ের কাছে জয়গুনকে ফিরিয়ে নেবার জন্য কাকুতিমিনতি জানায়। কিন্তু বরাবরের মতো নিশ্চুপতাই হয় জয়গুনের উত্তর। তারপরেও নিয়মিত যাতায়াত অনেকটা স্নেহপরায়ণ করে তুলে করিম বখশকে।

জীবনের তাগিদে আবার বাড়ির বাইরে আসে জয়গুন। আগের মতোই মুক্ত আর তোয়াক্কা বিহীন। কয়েকবার বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে ব্যর্থ হওয়া গদু প্রধান আর চুপ থাকতে পারে না। সদলবলে উঠে পড়ে লাগে কুমতলবে। সূর্য-দীঘল বাড়ির ভূত হয়ে প্রতি রাত্রিতে ঘরের চালে ঢিল ফেলতে শুরু করে।  প্রতি রাতেই ভয়ে চমকে উঠে হাসু আর মায়মুন। কাসুকে জড়িয়ে ধরে কুকড়ে যায় জয়গুনও। ভূতের ভয়ে না, সন্তান বাঁচানোর ভয়ে।

কাসু অথবা জয়গুন অথবা উভয়ের জন্য ভালোবাসা গুমড়ে উঠে করিম বখশের মনে। বিপদের কথা ভেবে তাই নিজের ঘরে বসে থাকতে পারে না। একরাতে ছুটে আসে সূর্য-দীঘল বাড়ীর উদ্দেশ্যে। স্বচক্ষে দেখতে পায় ঢিলরত তিনটি ছায়ামূর্তি। সেই ছায়ামূর্তিরাই গলা টিপে হত্যা করে তাকে। মৃত্যুর আগে শুধু গদু প্রধানকে চিনতে পারে করিম বখশ।

পরদিনই মৃত করিম বখশকে নিয়ে কুসংস্কার ঘনীভূত হয়,- ভূতে গলা টিপে মেরেছে। শুধু জয়গুন অনুভব করে বুকের ভেতর থেকে। একটা মানুষ কখনো কাউকে ভালোবাসেনি, কখনো কারো ভালোবাসা পায়নি। তারপর সন্তানদের বুকে চেপে ধরে ঘর ছেড়ে আবার পথে নামে জয়গুন। মনে একটু ভরসা, খোদার বিশাল দুনিয়ায় মাথা গুঁজার একটু ঠাই তারা পাবেই।

গ্রামীণ কুসংস্কার আর ধর্মান্ধতাকে ব্যবহার করে সমাজে রাজত্ব করে গদু প্রধানের মতো ভণ্ডেরা। আর তাঁদের পাতা ফাঁদে সর্বস্বহারা হয়ে পথে নামে হাজারো জয়গুন। মৃত্যু ঘটে করিম বখশের মতো কোনো স্বামীর, কোনো পিতার। আবু ইসহাকের নিপুণ লেখনশৈলীতে সে জয়গুনদের গল্পই যেনো উচ্চারিত হয়েছে।

বলা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করেই ১৯৭৯ সালে চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়, যেটি ৮টি বিষয়ে জাতীয় পুরস্কারসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। লেখক লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সুন্দরবন সাহিত্য পদক, একুশে পদক এবং মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক। ২০০৩ সালে মৃত্যুবরণকারী এই প্রথিতযশা সাহিত্যিকের অন্যান্য রচনার মধ্যে “পদ্মার পলিদ্বীপ”(উপন্যাস), মহাপতঙ্গ(গল্পগ্রন্থ), জাল (গোয়েন্দা উপন্যাস) এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়।

লেখক : আহমেদ দীন রুমী

Related Posts

About The Author

Add Comment