বই রিভিউ : দ্য প্রফেট

বই- দ্যা প্রোফেট
লেখক- কাহলীল জিবরান

শায়েরি জুয়বেস্ত আয্ পয়গম্বরী। বাংলায় বললে- কবিত্ব পয়গম্বরীর অংশ। শেখ সা’দীর এই কথাটা তাঁর নিজের জীবনে কতোটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা বিশ্লেষণসাপেক্ষ। তবে এর সত্যতা প্রমাণে দাড়ানোর মতো একটি বইয়ের নাম “দ্যা প্রোফেট”। লিখেছেন লেবাননীয় জাতীয় কবি জিবরান খলিল জিবরান। অবশ্য স্কুল কেরানীর হাতে বিকৃত হওয়া কাহলীল জিবরান নামেই বিখ্যাত। ১৮৮৩ সালে জন্ম নেন বিশ শতকের এই উইলিয়াম ব্লেক। মৃত্যু ১৯৩১ সালে। তাঁর জীবনীও তাঁর রচনা আর চিত্রকর্মের মতোই বিচিত্র।

১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় “দ্যা প্রোফেট”। কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন মহাপুরুষ, আল-মুস্তফা। দীর্ঘ ১২ বছর আরফালিস নগরীতে অবস্থান শেষে ডাক এসেছে নতুন পৃথিবীর। বিদায়লগ্নে নগরবাসীদের উদ্দেশ্যে তাঁর শেষ হিতকথাগুলো নিয়েই গড়ে উঠেছে “দ্যা প্রোফেট”। জাহাজের আগমণ ও আল মুস্তফার বিদায়সহ বিয়ে, বন্ধুত্ব, ধর্ম, কর্ম, সন্তান প্রভৃতি ২৮টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত বইটি। প্রত্যেক অনুচ্ছেদে আছে কাব্যিক ঢঙে জীবনের নানা দিকের দার্শনিক উপস্থাপন।

আলামিত্রা নামক জনৈক নারীর ভালোবাসা বিষয়ক প্রশ্নের মাধ্যমেই মূলত শুরু। একে একে কবি, কৃষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, পান্থশালার মালিকসহ নগরের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তুলে। আল মুস্তফার সস্নেহ উত্তর স্বভাবতই হৃদয়গ্রাহী। ভালোবাসা নিয়ে তাঁর উক্তি,- ” ভালোবাসাকে তুমি পথ দেখাবে এমনটা ভেবো না, বরং ভালোবাসা যদি তোমায় যথার্থ মনে করে; তবে সে-ই তোমায় পথ দেখাবে”। ভালোবাসার মুক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন জিবরান। পাশাপাশি বিশ্বাসী ছিলেন এর শক্তি এবং সম্পূর্ণতায়। এজন্যই আল মুস্তফাকে বলতে শোনা যায়- ” ভালোবাসার নিজের বলতে কিছু নেই এবং সেও কারো নয়। ভালোবাসার জন্য ভালোবাসাই যথেষ্ট”। প্রসঙ্গত তাঁরই লেখা “ব্রোকেন উইংস” গল্পে নায়িকা সালমার কথা উল্লেখযোগ্য। “আমি তোমায় ভালোবাসি, কারণ আমি তোমায় ভালোবাসি।” অর্থাৎ ভালোবাসার কোনো কারণ হয়না।

বন্ধনের নামে ব্যক্তিত্ব জলাঞ্জলি দেবার বিরোধী মহাপুরুষ। বিয়ে প্রসঙ্গে উপদেশই তাঁর দলিল। “তোমরা একে অপরের সাথে গান গাও, নৃত্য করো এবং আনন্দ করো, তথাপি পরস্পর থাকবে স্বতন্ত্র। বীণার তারগুলো প্রতিটি স্বতন্ত্র থেকে একই সুমধুর সুরে শিহরিত হয়”।

বিশ শতকের গোড়ায় দাড়ানো জিবরানের ধারণা কতোটা আধুনিক ছিলো? এই প্রশ্নের উত্তরও আঁচ করা যায় ‘সন্তান’ অনুচ্ছেদে। “তাঁদের তুমি তোমার ভালোবাসা দিতে পারো, কিন্তু ভাবনাগুলোকে না। কারণ তাঁদেরও রয়েছে নিজস্ব ভাবনা”। ‘সুখ ও দুঃখ’ অনুচ্ছেদে বলেছেন- “তারা অবিচ্ছেদ্য এবং একইসাথে তোমার কাছে আসে। তুমি যখন এদের একজনের সাথে বসে গল্প করছো; অপরজন তখন তোমার বিছানায় শায়িত”।

মৃত্যুর প্রতি মহাপুরুষের দৃষ্টি বেশ উদার। “তোমরা যদি মৃত্যুর প্রকৃত স্বরূপ দেখতেই চাও, তবে জীবনের সামনে উন্মুক্ত করে দাও নিজের হৃদয়। কারণ নদী এবং সমুদ্র যেমন এক, জীবন এবং মৃত্যুও তেমন এক”। পাশাপাশি কর্ম সম্পর্কে- “যদি কপালের লিখনকে দুর্ভাগ্য মনে করো, তবে জেনে নাও, ঘাম ছাড়া অন্য কিছু এই দুর্ভাগ্য মুছতে পারবে না।”

সৌন্দর্য নিয়ে ব্যাখ্যাটা অত্যন্ত সরল। সৌন্দর্য সেই রূপ, যা তুমি চোখ বন্ধ করেও দেখতে পারো। সৌন্দর্য সেই গান, যা তুমি কান বন্ধ করেও শুনতে পারো। ঈশ্বর সম্পর্কে তাঁর কথা-“যদি বিধাতাকে খুঁজতে চাও, তোমার চারপাশেই তাকিয়ে দেখো। তিঁনি তাঁর সন্তানদের সাথে খেলায় মগ্ন।” এ যেনো অনেকটা আমাদের বিবেকানন্দ বাবুর কথার প্রতিধ্বনি।
বহুরূপে তব সম্মুখে রাখি কোথা খুঁজেছো ঈশ্বর,
জীবে প্রেম করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।

এমনই প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে পরিণতির দিকে ধাবিত হয় ঘটনা। স্বীয় বক্তব্য শেষে প্রস্থানে পা বাড়ান আল-মুস্তফা। অপেক্ষমান জাহাজে উঠেন। লক্ষ্য করেন আরফালিস নগরীর অজস্র বিদায়কাতর মানুষের অবস্থা। জাহাজ চলে যায়। আগামীর জন্য পরে থাকে কিছু অমূল্য উপদেশ। পৃথিবীর কাছে এভাবেই উপস্থাপিত হয়েছে “দ্যা প্রোফেট “।

মূল বইতে জীবরানের নিজের আঁকা ১২ টি চিত্রকর্ম আছে। বলে রাখা ভালো, তিঁনি ম্যারি হাসকেল নামক বিদুষী নারীর পৃষ্ঠপোষকতায় চিত্রকর্মের উপর উচ্চশিক্ষা নেন। আরবী আর ইংরেজিতে সমান সফল এই সাহিত্যিক চিত্রকর্মেও বিচিত্র প্রতিভা দেখান। সম্ভবত এজন্যই শেক্সপিয়ার আর লাউজির পরে জিবরানের বই-ই এখন পর্যন্ত সবথেকে বেশি বিক্রিত বই।
“দ্যা প্রফেট ” ছাড়াও স্যান্ড এণ্ড ফোম, ম্যাডম্যান, ফোররানার, গার্ডেন অব প্রোফেট, গডস অব আর্থ, ব্রোকেন উইংস, ওয়াণ্ডারার, জেসাস: দ্যা সন অফ ম্যান প্রভৃতি অসাধারণ বইয়ের স্রষ্টা জিবরান।

 

লেখক : আহমেদ দীন রুমি

Related Posts

About The Author

Add Comment