বই শেয়ার করি, মিলেমিশে পড়ি

অবশেষে একটা পছন্দসই স্লোগান পাওয়া গেল। বিডিএসএফ এর বন্ধুরা প্রথম থেকেই একে অন্যের সাথে বই শেয়ার করে আসছে। এটাকে আমরা আরও সুদৃঢ় করতে চাই। এজন্য গত কয়েকমাস থেকে আমাদের নিজেদের মধ্যে বই শেয়ারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছি। ব্যক্তি হিসেবে একজনের কাছে অসংখ্য বই থাকা সম্ভবপর নয়। আর ছাত্রাবস্থায় বেশি বই কিনা অনেক কষ্টকরই বটে। কিন্তু আমরা ৫০ জন বা ১০০ জন বা ৫০০ জন সেটা তো অনেক বড় সংখ্যা। আমাদের সবার বইগুলো একত্র করলে একটা ভালো সংগ্রহ হয় বটে। হয়ে যায় আমাদের একটি মোবাইল (ভাসমান) লাইব্রেরি, আমরা একেকজন এক লাইব্রেরিয়ান!

হ্যা, আমাদের এই সুন্দর পরিকল্পনাটিকে আমরা আরও সুসংহত করতে চাই, নিয়মিত করতে চাই আমাদের বই পড়া এবং বই শেয়ারের কাজ। এতে সবদিকেই লাভ! আজকের সন্ধার আড্ডাতে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হলো আড্ডায় উপস্থিত বন্ধুদের সাথে। আমাদের বই শেয়ারের এই কাজের স্লোগান বের হয়ে আসলো। স্লোগানটি হচ্ছে: ‘বই শেয়ার করি, মিলেমিশে পড়ি’। এই কাজটাকে আমরা ইংরেজিতে নাম দিতে পারি এমন: ‘Share one, take one’.

যথারীতি আজকেও লাইব্রেরিতে পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। হাজার হাজার বছরের দূর অতীতে হারিয়ে যাওয়ার জন্য শীত একটি সহযোগী ঋতু বলে মনে হয়! হ্যা, ইদানীং আমার পড়াশুনাকে একটা ক্যাটাগরিতে ফেলতে গেলে বলতে হয় ইতিহাস পড়তেই বেশ ভালো লাগছে। আমার সাধারণ পড়ার টেকনিক হচ্ছে যখন পড়তে থাকি তখন একই ডিসিপ্লিনে বেশ কয়েকদিন পড়াশুনা করি। আমেরিকান সাহিত্য পড়লে কিছুদিন আমেরিকান সাহিত্য, চীনা দর্শন, সাহিত্য ও কবিতা পড়লে একটানা কয়েকদিন ওগুলোই পড়া, পাশ্চাত্য দর্শন পড়া শুরু করলে একটানা কিছুদিন সে বিষয়েই পড়া চালিয়ে যাওয়া, ক্লাসিক উপন্যাস পড়া শুরু করলে একটানা কয়েকদিন পড়ে যাওয়া এমনটাই চলে আসছে কয়েক মাস ধরে।

আমার সাহিত্য, দর্শন ও রাজনীতি বিজ্ঞানের সাথে সাথে আমার পছন্দের একটি বিষয় হচ্ছে ইতিহাস। ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রতি আমার ফেসিনেশন অনেক দিনের। সেই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক সপ্তাহে পড়ছিলাম বিশ্ব ইতিহাস। ইতিহাস পড়তে গেলে একটা কথা মনে রাখা আবশ্যক। সেটা যেকোন ইতিহাসের ছাত্রেরই নজরে আসবে সভ্যতার ইতিহাস হচ্ছে যুদ্ধের ইতিহাস। বা ইতিহাস যখন রচনা শুরু হলো বা মানুষ যখন সাহিত্যে ইতিহাস লিখতে শুরু করলো সেগুলো কিন্তু যুদ্ধেরই কাহিনী। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দুটি মহাকাব্য মহাভারত ও রামায়ণ কিন্তু যুদ্ধ নিয়েই। আবার গ্রীক মহাকাব্য ‘ইলিয়াদ’ ও ট্রয় যুদ্ধে একিলিসের বীরত্ব নিয়েই লিখা। আবার ইতিহাসের প্রথম দিককার গ্রন্থ থিওসিডাইস এর ‘হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপনেসিয়ান ওয়ার’ ও কিন্তু যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে।

আমার যুদ্ধ নিয়ে এসব কথা পাড়ার একটা কারণ হচ্ছে আমার ইদানীং কালের পড়াশুনা নিয়ে আলাপটা সামনে নিয়ে আসা! আজকে যে বইটা ঘন্টা দুয়েক পড়লাম সেটা হচ্ছে:

  1. 100 Decisive Battles by Paul K. Davis, Oxford, Call Number: 94.7 DAO

আরেকটা বইয়ের কথা গতকাল উল্লেখ করেছিলাম যেটা ছিল জওহারলাল নেহরুর ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’। ক্লাসিক বইয়ের একেবারে নতুন কপি ধরতে এবং পড়তে অনেক ভালো লাগে। (নতুন বই দেখা এবং ধরার বিষয়টা অনেকটা নতুন প্রেমিকার প্রথম হাত ধরার অনুভূতির মতো! তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে পুরাতন বই কেমন! পুরাতন বইও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পুরাতন বই হচ্ছে আপনার পুরনো বন্ধুর মতো। তাদের সাথে নিয়মিত দেখা না হলেও তাদেরকে আপনার জীবন থেকে মুছে দিতে পারবেন না! পুরাতন বই পড়াও আপনি ফেলে দিতে পারবেন না!)

যে কথা বলছিলাম নেহরুর বিখ্যাত বইটির কথা। যারা এই বইটি পড়তে চান তাদের জন্য সুখবর হলো এ বইটির প্রায় ৫ কপি বই রয়েছে লাইব্রেরির ইতিহাস সেকশনে। ফার্স্ট ফ্লোরে গিয়ে কল নাম্বার দিলে বইটি পড়তে পারেন। কল নাম্বারটি হচ্ছে: Glimpses of World History, Jawaharlal Nehru, Call: 909NEG

আজকে যে বইটি নিয়ে পড়ছিলাম সেটা নিয়ে কথা বলি।

“100 Decisive Battles by Paul K. Davis”-এ বইটিতে ১০০ টি ঐতিহাসিক যুদ্ধ নিয়ে লেখক আলাপ করেছেন যা পৃথিবীর ইতিহাস পাল্টে দিয়েছে, যে যুদ্ধের মাধ্যমে কোন সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে বা নতুন সাম্রাজ্যের উত্থান হয়েছে। প্রথম যে যুদ্ধটির কথা নিয়ে এসেছেন লেখক সেটা হচ্ছে ‘মেগিদ্দোর যুদ্ধ’। যুদ্ধটি হয়েছিল প্রায় ১৫০০ খ্রি.পূ.। এখন থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের সে যুদ্ধ। যুদ্ধ হয়েছিল মিশরের সম্রাট ফারাও তৃতীয় থুটমুজ ও তার বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিদ্রোহী প্রদেশ। কয়েকটা কারণে এ যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত এ যুদ্ধে জিতে ফারাওদের শাসন প্রথম বড় কোন হুমকি থেকে রক্ষা পায়। আর দ্বিতীয়ত মানুষের ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধ ইতিহাসের বিবরণ সেখান থেকেই শুরু। মনে রাখার বিষয় ইতিহাসের জনক (!) হেরোডোটাস বা থিওসিদাইদেস এর ও ‘হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপনেসিয়ান ওয়ার’ এর প্রায় এক হাজার বছর আগে! মজার ব্যাপার হচ্ছে ওই ফারাও তৃতীয় থুটমুজ যুদ্ধাভিজান নিজে পরিচালনা করেছিলেন এবং যুদ্ধে তার সেনাদলের কর্মকাণ্ড লিখে রাখার জন্য সাথে রেখেছিলেন একদল নথিকার বা এখনকার সময়ের সাংবাদিক বা রিপোর্টার এমন আর কি! সেখান থেকেই ‘মেগিদ্দো’ যুদ্ধের খানিক বিবরণ পাওয়া যায়।

আজ তাহলে এ পর্যন্তই!

ক্যাম্পাস ডায়রী, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৫

সাবিদিন ইব্রাহিম

[email protected]

Related Posts

About The Author

Add Comment