বঙ্গবন্ধুর প্রথম ১০০ দিনের সফলতা

  • স্বাধীন দেশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি:

অফিসে ১০০ দিন পার করার মধ্যেই ৬০ টি দেশের স্বীকৃতি আদায় করে নেন মুজিব। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যদের চারটি। শুধু চীন তখনো স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু চীনের সাথেও সম্পর্কের লক্ষ্যণীয় উন্নতি ঘটেছিল। মনে হচ্ছিল পিকিং এর স্বীকৃতি পাওয়া মাত্র সময়ের ব্যাপার।

  • ইনডিয়ান সৈন্যদের প্রত্যাহার:

১৯৭২ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই ইনডিয়ান সৈন্যদের বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রত্যাহার করা ছিল অনেক বড় সফলতা। এটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের একটি শক্ত ইমেজ প্রতিষ্ঠা করে। যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক দশক পরও ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন নৌঘাটি থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়নি ঐ অঞ্চলের দেশগুলোর সেখানে বাংলাদেশের মত একটি সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ থেকে শক্তিশালী প্রতিবেশি ইনডিয়ার সেনা সড়িয়ে নেয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিশাল সফলতাই বটে।

ইনডিয়ান সৈন্যরা সড়ে যাওয়ার ফলে ইনদোনেশিয়া সহ গুটিকয়েক দেশ যারা স্বীকৃতি দিতে দেরী করছিল তাদের আর কোন অজুহাত খাটেনি যে বাংলাদেশে ইনডিয়ান সৈন্য আছে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন নয় বরং ইনডিয়ার উপনিবেশ।

  • শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনা:

শেখ মুজিবের প্রথম ১০০ দিনে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ সফলতা হচ্ছে প্রায় ১ কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনা যারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আতঙ্কে দেশ ছেড়ে ইনডিয়াতে আশ্রয় নিয়েছিল। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তার সমালোচকদের গালে চপেটাঘাত দিয়েছেন যারা মনে করতো শেখ মুজিব কি ঐসব শরণার্থীদেরকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন যার বেশিরভাগ ছিল হিন্দু? এর মধ্যে আমেরিকাও পড়ে। ইনডিয়াতে আশ্রয় নেয়া বেশিরভাগ হিন্দু জনগোষ্ঠি কি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ নতুন এই দেশটিতে আবার আসবে? এসব প্রশ্নের মুখে ছাই দিয়ে প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর সবাই বাংলাদেশে ফিরে আসে। ঢাকার এক সরকারী কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন প্রতিদিন গড়ে ১ লক্ষ শরণার্থী দেশে ফিরছিল। এর বেশিরভাগই সরকারী যানবাহন ব্যবহার করে আসছিল। নতুন দেশটির সরকার তাদের জন্য এই অপ্রতুল কিন্তু আন্তরিক ব্যবস্থার কারণে নিশ্চিন্তে দেশে ফেরার সাহস পান শরণার্থীরা। যেকোন নতুন সরকারের জন্য এটা একটি কঠিন সমস্যাই বটে। কিন্তু সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটির সরকার বিস্ময়কর দ্রুততার সাথেই এ কাজটি করতে সক্ষম হন। এরকম ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে দ্রুততা হচ্ছে সফলতার মাপকাঠি। সেক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকার বেশ সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিল।

  • মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র ফিরিয়ে নেয়া:

মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন গ্রুপে, সেক্টরে ভাগ হয়ে যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের ছিল বিভিন্ন ধারা। এ বিভিন্ন ধারার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে স্বাধীনতার পরও অস্ত্র থেকে গিয়েছিল এবং পাকিস্তানী বাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অস্ত্রভান্ডার মজুত ছিল বিভিন্ন গোপন জায়গায়। এগুলো যেকোন দেশের জন্যই ভয়ানক হুমকি, বিশেষ করে নতুন স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশের জন্য। এজন্য নতুন সরকারের একটি প্রধান দায়িত্ব ছিল এসব অস্ত্রশস্ত্র ফিরিয়ে নেয়া।

এখন সব ধারার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রথম সমস্যা ছিল এটা নিয়ে বিস্তারিত তথ্যের অভাব। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে থাকা বেশিরভাগ অস্ত্র ছিল ইনডিয়া থেকে আসা। কিন্তু একটা বিশাল পরিমাণের অস্ত্রশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাদের কাছ থেকে এবং তাদের অস্ত্রাগার লুট করে সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাছাড়া পাকিস্তানের প্যারামিলিটারি ফোর্স রাজাকার, আল বদরকেও অবাঙ্গালি বিহারিদের অস্ত্র দিয়েছিল পাকিস্তান। এখন সেসব অস্ত্রশস্ত্রের সঠিক হিসাব ও অবস্থান জানা সহজ ছিলনা নতুন সরকারের জন্য। আন্ডারগ্রাউন্ডে কি পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র মজুত ছিল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কয়টি ধারা উপধারা ছিল এটা হিসাবে আনা অনেক কঠিন কাজ ছিল।

মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ দানা বেঁধে উঠেছিল যাদের উপর আসলে তেমন কওন কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। গেরিলা যুদ্ধের প্রকৃতিটাই সাধারণত এমন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে অনেকটা স্বাধীনভাবে, বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র দলটির কমান্ডারের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের লক্ষ্যই থাকে একটি; শত্রুর পরাজয়। সেক্ষেত্রে শক্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আশা করা এবং এর সম্ভাব্যতা একটা কঠিন চ্যালেঞ্জই বটে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানি তার সেক্টর কমাণ্ডারদের মাধ্যমে যুদ্ধের উপর অল্প নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারতেন। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নিচের দিকে তার সরাসরি নিয়ন্ত্রন তেমন ছিলনা। তার উপর চরমপন্থী বামদের সাথে তার যোগাযোগ ছিলনা। এদিকে টাঙ্গাইলের ত্রাস কাদেরিয়া বাহিনীর উপর তো কোন নিয়ন্ত্রণই ছিলনা। কাদেরিয়া বাহিনীর ১৭ হাজারেরও বেশি সৈন্য কাদেরিয়া বাহিনীর কাদের সিদ্দিকীর কাছ থেকে সরাসরি অর্ডার গ্রহণ করত। এটা ছিল সবচেয়ে বড় কোন ব্যক্তিগত বাহিনী।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস্ তখন বাংলাদেশ সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল যে তখন পর্যন্ত প্রায় ১ লক্ষ আগ্নেয়াস্ত্র অবৈধ হাতে ছিল যার মধ্যে অনেক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও ছিল। (আফটার দ্য ডার্ক নাইট)

নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে কোন কোন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র গিয়েছিল তার একটা পরিস্কার হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর তখন মুজিব সরকার এই শতধা বিভক্ত মুক্তিবাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র ফেরত নেয়ার জন্য জোর জবরদস্তি করতে পারেনি। প্রাথমিক স্তরে সরকারি কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কোন ধরনের বিরোধে জড়াতে চায়নি এবং তা বুদ্ধিমানের কাজ হতোনা। তাছাড়া সরকার এমনটি করলে জনপ্রিয়তা হারানোর রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে হতো। কারণ জনগণের সহানুভূতি ও প্রশংসা  মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ ছিল। সাধারণ জনগণের কাছে তারাই ছিল প্রকৃত নায়ক এবং মুক্তিযুদ্ধে নিয়মিত সামরিক বাহিনী ও ইনডিয়ান সেনাবাহিনী থেকে তাদের ভূমিকাই ছিল অনেক গৌরবজনক। তাছাড়া ইনডিয়ান আর্মি বাংরাদেশে তিন মাস অবস্থানকালেও মুক্তিবাহিনীকে নিরস্ত্র করার কোন চেষ্টা করেনি।

এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেন এস এম আলি তার ‘আফটার দ্য ডার্ক নাইট’ বইয়ে। সেটা কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে।

কাদের সিদ্দিকী রেসকোর্স ময়দানে চার জন রাজাকারকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। তখন এক ইনডিয়ান আর্মি কমান্ডার কাদের সিদ্দিকীকে নিরস্ত্র করার কথা ভাবছিলেন। এতে ঢাকার রাস্তা রক্তের বন্যায় ভেসে যেত। ইনডিয়ান আর্মির কমনসেন্স সে সম্ভাব্য রক্তপাত থেকে রক্ষা করেছিল।

এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যেই ছিল একমাত্র সমাধান। বঙ্গবন্ধু নিজেও অত্যন্ত সতর্বতার সাথে এবং ধীরে সুস্থ্যে মুক্তিবাহিনীকে নিরস্ত্র করার কাজ শুরু করেন। এক্ষেত্রে তিনি তার প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বপরায়ন আচরণ করেননি বরং তিনি জাতির পিতা এবং বঙ্গবন্ধু রুল প্লে করে তাদেরকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেন।

সেক্ষেত্রে কাদের সিদ্দিকীকে নিরস্ত্র করার জন্য বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মত কাজ করেন। তার ভক্ত এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান করার জন্য তিনি নিজেই টাঙ্গাইল চলে আসেন এবং কাদের সিদ্দিকী তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে।

  • আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সফলতা:

বাংলাদেশের প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ পারঙ্গমতা দেখিয়েছিল। প্রথমে ইনডিয়ান সেনাদের বাংলাদেশ থেকে ফেরত পাঠানো, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি অত্যন্ত বড় সফলতা। বলা হয় সরকারের অন্যান্য বিভাগের চেয়ে এ বিভাগটিতে সরকার সবচেয়ে বেশি সফল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশাল অংকের অর্থ সাহায্য আদায় করাও এ সফলতার মধ্যে পড়ে। বিদেশী দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে দরকষাকষি করে সর্বোচ্চ সহায়তা আদায় করার জন্য যে প্রোপাগান্ডা দরকার তা করতে সক্ষম হয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এস এম আলি তার আফটার দ্য ডার্ক নাইট বইটিতে এ নিয়ে সুন্দর প্রশংসাবাণী লিখেছেন। এক জায়গায় বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুস্ সামাদ আজাদ পররাষ্ট্র বিষয়ে দক্ষ না হলেও এ বিষয়ে যথেষ্ঠ পারঙ্গমতা দেখিয়েছিলেন।

স্বাধীন দেশের মন্ত্রীসভা গঠনের পরপরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ ছিল যতগুলো দেশ থেকে সম্ভব স্বাধীনতার স্বীকৃতি আদায় করা। ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ব্রিটিশ কমনওয়েলথ এর সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। এবং এপ্রিলের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। জুলাই মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানকারী দেশের সংখ্যা ৮০’র কাছাকাছি পৌছে যায়। স্বাধীন সরকার গঠনের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধি দল আসতে থাকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে স্বাগত জানানোর জন্য এবং সাহায্যের অফার নিয়ে। শেখ মুজিব নিজে ইনডিয়া ও রাশিয়াতে ভ্রমণ করেন এবং বিভিন্ন দেশের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ভ্রমণ করে তৃতীয় বিশ্বে এই নতুন দেশটির অবস্থান জানান দেয়ার চেষ্টা করেন।

  • ব্যক্তিগত মহানুভবতার মাধ্যমে অনেক ছোট ছোট সমস্যার সমাধান

শাহ আজিজুর রহমান: আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আজিজুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সে মুক্তিযদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনা শাসনকে সমর্থন করেছিল। স্বাধীনতার পরপরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। আজিজুর রহমানের স্ত্রী শেখ মুজিবের সাথে দেখা করতে আসেন এবং স্বামীর মুক্তির জন্য আবেদন করেন। মুজিব খুব সহজ ভাষায় বলে দিলেন যে আইন তার নিজের গতিতেই চলবে। তারপর তার ব্যক্তিগত সহকারীকে বিস্মিত করে আজিজুর রহমানের পরিবারের জন্য মাসিক ৫০০ টাকা ভাতার ব্যবস্থা করেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে এ অর্থ অনুমোদন করা হয়।

  • মুজিবের ব্যক্তিগত শাসন (পারসোনালাইজড রুল)

মুজিবকে যারা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাদের অনেকেই মনে করেন মুজিব কেন তার ক্ষমতার কিছু অংশ তার মন্ত্রীসভায় ভাগ করে দিলেন না। কিন্তু মন্ত্রীসভার বেশিরভাগ সদস্যের এমন অবস্থা ছিল তারা অত্যন্ত ছোট ছোট ব্যাপারও সমাধা করতে পারতোনা। সব কিছুতেই মুজিবের পরামর্শে কাজ করতে চাইতো। মন্ত্রী হিসেবে নিজেদের পুরো দায়িত্ব পালন এবং মুজিবকে পরামর্শ দেয়ার মত যোগ্যতা বা সাহস ঐ মন্ত্রীসভার বেশিরভাগ সদস্যের ছিলনা। সে কারণে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন মুজিব এবং তিনি ‘পারসোনালাইজড রুল’ ব্যক্তিগত শাসন চালু রাখেন। একবার মুজিব চিকিৎসার জন্য লন্ডনে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে মন্ত্রীসভার উপর দায়িত্ব দিয়ে আসেন মুজিব। তখন মুজিবের ব্যক্তিগত শাসনের রূপটি আরও পরিস্কার হয়ে উঠে। মুজিবের অনুপস্থিতে দেশের এ অবস্থা হয় যে দ্রব্যমূল্যের দাম এক লাফে ২০০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়, দুর্নীতি চরম সীমায় পৌছে যায়।

মুজিব মোটামুটি সুস্থ হবার পর লন্ডনে বসে টেলিফোনের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা শুরু করেন। সেপ্টেম্বরের দিকে লন্ডনের সানডে টাইমস্ তাদের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল এমন, ‘Bangladesh Government runs by the will of God and telephone’ যার বাংলা করলে দাড়ায় ‘আল্লাহর ইচ্ছায় এবং একটি টেলিফোনের মাধ্যমে চলছে বাংলাদেশ’।

সেপ্টেম্বরের মাঝের দিকে শেখ মুজিব দেশে ফিরলে অবস্থা পরিবর্তিত হতে থাকে। দাম কমতে থাকে, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। মুজিবের উপস্থিতি বাংলাদেশের মানুষের জীবনে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এটা মুজিবের অনেক বড় সফলতা আবার অনেক বড় দুর্বলতাও বটে!

মন্ত্রীসভার দু’একজন সদস্য বাদ দিয়ে বাকি সবাই মুজিবের প্রিয় পাত্র থাকতে চাইতো, কোন প্রয়োজনীয় সমালোচনা বা পরামর্শ দিতে চাইতো না বা পরামর্শ দেয়ার যোগ্যতা রাখতো না। এটা আওয়ামী লীগের গড়পরতা নেতা ও সিনিয়র সরকারী কর্মকর্তাদের জন্য আরও বেশি সত্য। তাদের কাছে বঙ্গবন্ধু ছিল অনেক বড় নেতা, তার সাথে কোন বিষয়ে তর্ক করা যাবে না, তাকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না এবং কোন বিষয়ে বিতর্ক করা যাবে না। এক্ষেত্রে তারা মুজিবকে ভুল করতে দিতো কিন্তু কোন পরামর্শ দেয়ার সৎসাহস বা প্রয়োজনীয় সাহস রাখতো না।

এস এম আলি তার ‘আফটার দ্য ডার্ক নাইট’ বইটিতে এ বিষয় নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, ‘Like many other strong men before  him, including Sukarno and Nkrumah, Sheikh Mujib is very much alone-and, therefore, very much vulnerable.’ (page, 56)

 

Related Posts

About The Author

Add Comment