বর্ধমানের চিঠি – ০১

সময়টা কঠিন। পরিবর্তনের সময়। চলতি বছরের এপ্রিলে আমার জন্মদিনে পরিবর্তনের পথে যাত্রা শুরু করেছিলাম। অতীতের ভুল-ভ্রান্তি মুছে দিয়ে শুদ্ধতার দিকে নিজেকে ধাবিত করেছিলাম।

 

এরপর থেকে প্রতিদিন নিজেকে পাল্টে ফেলার চেষ্টা করছি। পরিবর্তনের সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছি, মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

বৃষ্টিস্নাত বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

বৃষ্টিস্নাত বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

বর্ধমানে আমার দিন কাটছে ভাল-মন্দ মিলিয়েই। এখানকার কিছু বিষয় ভাল লাগছে, কিছু বিষয় মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে। “আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান” গানের মতো এখানকার সবকিছু সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিবহাল হয়েই এখানে এসেছি। আমি চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেছি জীবনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষার জন্য।

 

আমার জন্মস্থান ময়মনসিংহের আবহাওয়া অত্যন্ত চমৎকার। পল্লীবাংলার সবুজাভ জঙ্গলাকীর্ণ পরিবেশে, নাম না জানা হাজারো পাখপাখালির কলরবে মুখরিত, সোঁদা জলের ঘ্রাণময় বাতাসে বেড়ে ওঠেছি আমি। আমি গ্রামের উর্বর উঠোনের মাটি খেতে খেতে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে শিখেছি। আমার আকাশটা ছিল ছয় ঋতুর। বারো মাসে ছয়বার ঋতু পরিবর্তনের সাথে নিজেকে পাল্টিয়েছি, খাপ খাইয়ে নিয়েছি। কখনও ঘাবড়ে যাইনি।

 

কাজী নজরুল ইসলাম যখন আসানসোলের রুটির দোকান থেকে ত্রিশালের দরিরামপুরে চলে গিয়েছিলেন, তখন কি এই বর্ধমানের জন্য তাঁর প্রাণ কাঁদতো? বর্ধমানবাসী কি নজরুলকে চেনেন? বর্ধমানের বর্তমান প্রজন্ম কি জানে তাঁদের রুটির দোকানে কাজ করা ছেলেটি ময়মনসিংহের মাটির জাদুতে কতবড় মানুষে পরিণত হয়েছিল?

 

একশো বছর পর ময়মনসিংহের মাটি থেকে আমি বাঙালির চির পরিচিত দুখুমিয়ার বর্ধমানে এসেছি। বর্ধমানের মাটিও উর্বর। এই মাটিতে নজরুলের জন্ম, বেড়ে ওঠা। তাঁরও অনেক আগে মোঘল আমলে এই বর্ধমানের শাসক ছিলেন শের আফগান। সুঠামদেহী এই বিখ্যাত শাসকের অকালমৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্যা স্ত্রী মেহেরুন্নিসা মোঘল বাদশাহ্ হুমায়ূনের স্ত্রী’র মর্যাদা লাভ করেছিলেন, ইতিহাসে যিনি সম্রাজ্ঞী নূরজাহান নামে পরিচিত।

শের আফগান ও নবাব কুতুবউদ্দীনের সমাধিক্ষেত্রের সামনে লেখক

শের আফগান ও নবাব কুতুবউদ্দীনের সমাধিক্ষেত্রের সামনে লেখক

তারপর কেঁটে গেছে বহুকাল। সিন্ধু-যমুনা-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা-দামোদর দিয়ে গড়িয়েছে অনেক জল। উপমহাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ঘটেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ময়মনসিংহ কিংবা বর্ধমান এই পরিবর্তনের আওতার বাইরে নয়।

 

নজরুল যখন এখান থেকে আমার ময়মনসিংহে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর পাসপোর্ট-ভিসা লাগেনি। কিন্তু, আমি যখন ময়মনসিংহ থেকে নজরুলের বর্ধমানে এসেছি তখন আমার দুটো আলাদা আলাদা স্বাধীন সরকারের অনুমতি নিতে হয়েছে। নজরুলের কবর ঢাকায়, তাঁর প্রথম স্ত্রী’র কবর চুরুলিয়ায়। দুই কবরের মাঝে রয়েছে হাজার মাইলের কাঁটাতারের বেড়া। কে জানে, মাটির নীচ দিয়েই তাঁদের অমীমাংসিত লেনদেন চলছে কি না! তারাক্ষ্যাপা’র যা বিদ্রোহী স্বভাব!……চলবে….

—-

মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী,

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়,

১৮/০৭/২০১৬ ইং।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment