বর্ধমানের চিঠি – ০২

“সুখে থাকলে ভূতে কিলায়” বলে একটা প্রবাদ গ্রামবাংলার লোকমুখে শোনা যায়। প্রবাদটি কতটুকু সত্য অর্থাৎ ভূত সত্যিই সুখী মানুষকে কিলায় কি না কিংবা ভূত বলতে কিছু আছে কি না -সেসব আমি জানি না। তবে, “অতিরিক্ত সবকিছুই খারাপ” এই বাক্যের সত্যতা নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। সবাই তো সুখী হতে চায়, কিন্তু  “অতিসুখে” থাকা যে কতটুকু কষ্টদায়ক, তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি!

 

কোলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাসে করে দমদম রেলস্টেশনে যাওয়ার পথে ভাবছিলাম বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “সেই সময়” উপন্যাসের কথা। আমার আরেকটি বইয়ের কথা মনে পড়ছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”। এই দুটো বই পড়ে আমার মনে কোলকাতা শহরের যে ছবি এঁকেছিলাম, তার সাথে বাস্তবে মেলাতে চেষ্টা করছিলাম।

কার্জন গেট, বর্ধমান। (বিস্তারিত আরেকদিন)

কার্জন গেট, বর্ধমান।
(বিস্তারিত আরেকদিন)

কিন্তু, দশ মিনিটের বাস ভ্রমণে তো আর তা সম্ভব না! তবে, ঢাকার বাতাস ও কোলকাতার বাতাসের গন্ধটাও কেমন যেন একটু আলাদা! এছাড়া রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সাইনবোর্ড থেকে মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, “আপা’র বাংলা থেকে দিদি’র বাংলায় এলাম।”

 

দমদম স্টেশনের সামনে একটি “হিন্দু হোটেলে” “এগ রোল” অর্ডার করা হলো। একটা পোড়া তেলেভাজা পরোটার ভিতরে ডিম আর কাঁচা পিঁয়াজ ভরে দেওয়া জিনিসটার কিছুটা খেয়েই রেখে দিলাম। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, কোলকাতা ও বর্ধমান শহরে যেটুকু দেখলাম তাতে বুঝলাম এখানে হোটেলগুলোও ধর্মীয় আবরণে ঢাকা। প্রায় সব হোটেলের সাইনবোর্ডেই “হিন্দু হোটেল” কিংবা “মুসলিম হোটেল” ট্যাগ লাগানো! হিন্দু হোটেলগুলোতে গোঁড়া হিন্দুয়ানী পরিবেশ বিরাজমান থাকলেও মুসলিম হোটেলে গরুর গোস্ত ব্যতীত আর কোন তফাৎ নেই! সুতরাং, রক্ষণশীল মুসলিমদের জন্য এই শহরগুলোর হোটেলে খাওয়া সামান্য পীড়াদায়কই বটে!

 

দমদম স্টেশন থেকে বর্ধমানের উদ্দেশ্যে লোকাল ট্রেনে চেপে বসলাম। বসলাম বললে ভুল হবে, দাঁড়ালাম। দেড়/দুই ঘন্টার রেলপথ পেড়িয়ে বর্ধমান চলে এলাম। আসার সময় রেললাইনের পাশের গ্রামগুলো দেখতে ভালোই লাগছিল! দিগন্তজোড়া খোলা মাঠে বিভিন্ন রকমের ফসলের খেত। মাঠের মাঝে মাঝে একটি করে পাকা দালান। আম, সজনে, কলা, কচুগাছ যেমন আছে, তেমনি অসংখ্য বাঁশঝাড়! দুই বাংলার প্রকৃতির উপাদানগুলোও একই রকম। আমার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে জয়দেবপুর, গফরগাঁও পেরিয়ে ময়মনসিংহের দিকে যাচ্ছি যেন!

IMG_1468949858193

বর্ধমানে এসে দেখি ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই ও সার্ক কালচারাল সোসাইটির বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা’র সেক্রেটারি জাহাঙ্গীর আলম ভাই সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, পানি ও ওয়াইফাইয়ের সুব্যবস্থা সম্পন্ন ফ্ল্যাট বাসার একটি রুমে উঠেছি। আমার বাসা যে এরিয়ায় এখানে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সাথে সাথে মুসলমানও আছেন অনেকেই। বাসার আশেপাশেই তিন-চারটে সুবিশাল মসজিদ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আযান শুনে মনেই হয় না বাংলাদেশের বাইরে আছি!

 

সমস্যা এই জায়গায়ই! ক্লাস শুরু আগস্টের দুই তারিখ থেকে। এখন এই বদ্ধঘরে শুয়ে-বসে থাকা ছাড়া তেমন কোন কাজও নেই। পৃথিবীটা কত রহস্যময়! একজন মানুষকে জীবনধারণের সব উপাদান দিলেও তার ভাল লাগে না! একাকী জীবন প্রাচুর্যতায় পরিপূর্ণ হলেও সুখময় হয় না। ক্লাস ফাইভে (সম্ভবত) পড়েছিলাম বর্ধমানের কৃতি সন্তান চিরবিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা “থাকব নাকো বদ্ধঘরে, দেখব এবার জীবনটাকে….”।

 

আমিও বদ্ধঘরে থাকতে পারব না। বেরিয়ে পড়ব সুবিশাল ভারতবর্ষের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা জ্ঞানসমুদ্র থেকে কিছু জ্ঞানসুধা পান করতে। “বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র।” ভারতমাতার অফুরন্ত তথ্যভান্ডার থেকে শিক্ষা অর্জনের এই শুরু……চলবে …..।

 

-লেখক:

মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী,

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়,

২০-০৭-২০১৬ ইং।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment