বর্ধমানের চিঠি -০৩

প্রত্যেক রাতে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নের বিষয়বস্তু কমন। আমি বাড়িতে গিয়েছি। এলাকার প্রতিটি আপন মানুষের সাথে সময় কাটাচ্ছি। যেন কত শত জনমের আপন সবাই। ছয় মাসের শিশু চাচাতো বোন থেকে শুরু করে নব্বই বছরের দাদার সাথে এক আনন্দঘন পরিবেশে অবস্থান করছি।

 

বলা হয়, মানুষ ঘুমানোর আগে যা ভাবে স্বপ্নে অবচেতন মনে তাই দেখে থাকে। গতরাতে ঘুমানোর আগে ইউটিউব থেকে পুরনো দিনের বাংলা সিনেমার গান, বিটিভির পুরনো নাটক (স্পেশালি জ্যোছনার ফুল), সিনেমা ইত্যাদি দেখছিলাম আর কুমিল্লা প্রবাসী বন্ধু মনিরকে ম্যাসেঞ্জারে সব দিচ্ছিলাম! এসব পুরনো গান, নাটক, সিনেমাকে ঘিরে বাল্যকালের স্মৃতিচারণ চলছিল বেশ।

 

এসব করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছি, জানিনা। হঠাৎ মনে হল আমি ফোনে কথা বলছি তিনবছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক বন্ধুর সাথে। এক সময় দেখলাম আমি বাড়িতে চলে গিয়েছি। সবাই অনেক খুশি। দাদী সেমাই রান্না করেছে, আমি খেতে শুরু করব এমন সময় কেউ একজন ডাকছে। তাকিয়ে দেখি, ওমা! একি! আমি তাহলে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম? কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বুঝতে পারলাম আমি বাড়িতে নয়, শত শত মাইল দূরের অচেনা এক শহরে আছি!

 

এখানে মা নেই, বাবা নেই, ভাই নেই, আত্মীয় স্বজন নেই, স্বাধীনতা নেই। এখানে আমার পরিচয় আমি “ভিনদেশী অতিথি।”

সর্ব্বমঙ্গলা মন্দির, বর্ধমান

সর্ব্বমঙ্গলা মন্দির, বর্ধমান

হ্যাঁ, এঁদের ভাষা একই, তবে সেটা বাংলাদেশের বাংলা নয়, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা। এখানে পানি নয় জল বলতে হয়, গোসল নয় স্নান বলতে হয়, ভাই নয় দাদা বলতে হয়, ফটোকপি নয় জেরক্স বলতে হয়। এঁরা বাংলাদেশী “বাঙালি” নয়, “ভারতীয় বাঙালি।” এঁদের সাথে আমাদের অনেক তফাৎ। দুই বাংলার মানুষের একই রকম ভাষা, একই রকম চেহারা থাকলেও -সবাই একই রকম বাঙালি নয়।

 

কোন কোন দিক দিয়ে এঁরা এতটাই আধুনিক হয়েছে যে, বাঙালির চিরন্তন সংস্কৃতির সাথে মেলানো মুশকিল। আবার, কিছু প্রাচীন বিষয় এঁরা এমনভাবে ধরে রেখেছে যে, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের বাঙালি সমাজে তার অস্তিত্বই হারিয়ে গিয়েছে!

 

যেমন ধরুন, “বাঙালি মেয়েরা স্বাধীন পোশাকাদি পড়ে রাস্তায় চলছে” এটা ‘রক্ষনশীল বাঙালি’ (হিন্দু-মুসলিম) সমাজে ঘোরতর অন্যায় ছিল এক সময়, এখনও আছে। বিশ শতকের গোড়ায় বেগম রোকেয়া কোলকাতা শহরে নারীশিক্ষা স্কুল চালাতে গিয়ে হিন্দু-মুসলিম বাঙালিদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েছিলেন। বর্ধমানের ছেলে কাজী নজরুল ইসলাম নারী জাগরণের অসংখ্য কবিতা-গান রচনা করেছিলেন।

 

আপনি এই শহরের রাস্তায় রাস্তায় এমন শত শত সাইকেল-বাইক চালক মা-বোনদের দেখতে পাবেন, যারা প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা কিংবা অতিস্বাধীনতা ভোগ করছেন। বর্ধমানের মত বাঙালি অধ্যুষিত জেলা শহরে অত্যাধুনিক সুপারশপিং মল দেখে আপনি ভুলে যাবেন বাঙালি ঐতিহ্যের হাট-বাজার-গঞ্জের কথা!

 

একটা বিষয় এখানে লক্ষণীয়, আপনি যদি সাতচল্লিশের বিভাজনটা উপলব্ধি করতে চান, তাহলে আপনাকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত দুই বাংলার শহর-বন্দরের দোকানের সাইনবোর্ডে নজর দিতে হবে! আপনি ময়মনসিংহের দোকানগুলোতে দেখবেন ‘বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স’, ‘মোহাম্মদীয়া লাইব্রেরী’, ‘আকবরীয়া হোটেল’, ‘শফিক মেডিসিন কর্ণার’, ‘কবীর টেইলার্স’ ধরনের সাইনবোর্ড। অন্যদিকে, বর্ধমানের দোকানগুলোতে আপনি দেখবেন, ‘কালীমাতা হিন্দু হোটেল’, ‘শ্রীরাম পুস্তকালয়’, ‘মা লক্ষী হোমিও হল’, ‘স্বরসতী টেইলার্স’, ‘গণেশ মিষ্টান্ন ভান্ডার’ জাতীয় সাইনবোর্ড।

 

সুতরাং, বুঝতেই পারছেন, একই আকাশের নীচের একই জাতি কাঁটাতারে বিভক্ত হয়ে দুটো আলাদা স্বত্তা সৃষ্টি করেছে। এই বিভাজন একদিনে হয়নি। সত্তর বছর ধরে তিলে তিলে বিভেদের দেয়ালটি গড়ে উঠেছে। দেহ-মনে-প্রাণে শতবিভক্ত দুটো বাঙালি জাতিসত্তা পৃথিবীর বুকে সমান্তরালে চলছে : “বাংলাদেশী বাঙালি” ও “ভারতীয় বাঙালি”। তবু, টিকে থাক জ্ঞাতিভাইয়ের বন্ধন।….চলবে..

 

 

—লেখক:

 

মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়,

২৪-০৭-২০১৬ ইং।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment