বর্ধমানের চিঠি – ০৪

বৃষ্টি কার না ভাল লাগে? পৃথিবীর ইতিহাসে বৃষ্টি নিয়ে যে পরিমাণ সাহিত্যরসের সৃষ্টি হয়েছে, অন্যকোন বিষয়ে এমন হয়নি। এই বৃষ্টি নামক স্বর্গীয় সুধা নিয়ে মর্ত্যের মানুষের সে কি কৌতুহল! কবির কবিতায়, লেখকের সাহিত্যে, গায়কের সুরে, শিল্পীর তুলিতে, প্রেমিকের চিঠিতে, মহীষীদের আত্মজীবনীতে, পর্যটকের ভ্রমণকাহিনীতে সর্বোপরি মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে এই বৃষ্টি নিয়ে মাতামাতি চলছে, চলবে। বৃষ্টি প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষের মনকেও সতেজ করে। বৃষ্টি মানুষকে কাঁদায়, বৃষ্টি হাসায়। বৃষ্টি হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার নিয়ামত।

 

পৃথিবীজুড়ে সব জায়গায় কমবেশী বৃষ্টি হয়। আমার প্রাণের জঙ্গলবাড়ী গ্রামে বৃষ্টিপাত হয়, ময়মনসিংহ শহরে হয়, ঢাকায় বৃষ্টিপাত হয়, বর্ধমানেও বৃষ্টি হয়। কিন্তু, স্থান-কাল-পাত্রভেদে বৃষ্টির অর্থ ভিন্ন হয়, বৃষ্টিপাতের ফলাফলও ভিন্ন হয়।

 

আমার গ্রাম্য ছেলেবেলার বৃষ্টি আর শহুরে যৌবনের বৃষ্টির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। চারপাশ অন্ধকারে ছেয়ে কালো মেঘে ঢাকা আকাশ, মুহুর্মুহু বজ্রপাতের শব্দ, প্রলয়ঙ্করী বাতাসে নুয়ে পড়া বাঁশঝাড়, টিনের চালে টুপটাপ শব্দ আর ঝরে পড়া আম কুড়ানোর প্রতিযোগিতায় পূর্ণ ছিল আমার শৈশবের বৃষ্টি। অথবা একাধারে দশদিন-পনেরদিন “বানাস” (বর্ষার গ্রাম্য প্রতিশব্দ)-এর সময় মাটির বারান্দায় একঝাঁক গ্রাম্য শিশুর খেঁজুরের বীজ দিয়ে “চারগুটি” খেলে অলস সময় পার করা। কিংবা বানের জলে থৈ থৈ খাল-বিল-নদীতে তাজা তাজা ছোটমাছ ধরা -এসবই ছিল শৈশবের বর্ষা উদযাপনের উপাদান। হাইস্কুল পড়ুয়া কৈশোরের বর্ষা ছিল আরেকটু ভিন্ন রকম। ঝুম বৃষ্টিতে পাড়ার মাঠে দলবেঁধে ফুটবল খেলা কিংবা পিতার শাসন অগ্রাহ্য করে অকারণে বৃষ্টিস্নান করা।

 

অথচ, এখন এই শহুরে প্রবাসী জীবনে বর্ষা আসে বর্ষা যায়, গ্রাম্য দুরন্তপনা দেখানোর আর সুযোগ হয় না! এখন কোথায় সেই আম কুড়ানোর বর্ষাসন্ধ্যা? কোথায় সেই থমথমে অন্ধকারাচ্ছন্ন বৃষ্টিস্নাত গ্রাম? খেঁজুরের বীজগুলো সেই যে ঘরের কোণে পড়ে আছে, কোথায় সেই খেলোয়াড় শিশুদের দল? ফুটবলটা কতদিন পাম্প করা হয় না! বাড়ির পাশে সেই ছোট্ট খালটিতে আর বুঝি নতুন মাছ আসে না?

গ্রামীণ বর্ষা

গ্রামীণ বর্ষা

ময়মনসিংহ শহরের বৃষ্টিটাও উপভোগ্য ছিল। বৃষ্টি এলেই ব্রহ্মপুত্রের তীরে চলে যেতাম। সদ্যস্নাত রমণীর ন্যায় বৃষ্টির পরপরই জয়নুল আবেদীন উদ্যানের মনমাতানো রূপ দেখে যেন প্রাণ ভরতো না! গোলকিবাড়ির রোডে হাঁটুপানি জমতো, সেই ময়লা জল পেরিয়ে এক অনাগত সুখের নেশায় দিনের পর দিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘুরেছি। বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজেছি সকলে মিলে।

 

ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় ত্রিশালের সূতিয়া নদীর তীরে বাসার ছাদে শুয়ে শুয়ে একটা কবিতা লিখেছিলাম, “মেঘের চূড়োয় উঠব আমি!” বর্ধমানের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে ঢাকায় আসার সময় অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল। ঢাকা থেকে কোলকাতার বিমান যখন মেঘের উপর দিয়ে ভেসে আসছিল, তখন আমি সেই কবিতার কথা ভাবছিলাম। কোলকাতায় পৌঁছানোর পরপরই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল। বর্ধমান স্টেশন থেকে বাসায় এসেছি বৃষ্টিতে ভিজে।

 

বর্ধমানে এসেছি প্রায় বিশদিন হয়ে গেছে। সময় কত দ্রুত চলে যায়! এখানে আসার পর প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। বাইরে জরুরী কাজ না থাকলে বের হইনা বেশী একটা। যখন বৃষ্টি হয়, তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা বর্ষাগুলোর স্মৃতিচারণ করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। এখানে আকাশের সাথে সাথে আমার চোখেও বৃষ্টি নামে। বুকের বামপাশে ভয়ানক বজ্রপাত হয়।

 

একসময় বৃষ্টি থেমে যায়। মস্তিষ্ক জানান দেয়, এটিই প্রবাস জীবন। এই জীবনে বৃষ্টি আসে কান্না নিয়ে। প্রবাসী বৃষ্টি শুধু কাঁদায়। সুখের বৃষ্টি শতমাইল দূরে।….চলবে…

 

 

—লেখক :

 

মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়

২৯-০৭-২০১৬ ইং।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment