বর্ধমানের চিঠি – ০৫

বাঙালি জাতির ইতিহাস চর্চায় জানা যায়, এটি একটি মিশ্র জাতিসত্তা। আর্য, অনার্য, মঙ্গোলীয়ান, নিগ্রো, প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জাতিগোষ্ঠীর এক মিলিত স্রোতধারার নাম বাঙালি! ফলে, বাঙালি চরিত্রে ওসব জাতিসমূহের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। বাঙালি কখনও দানবীর, কখনও হাড়কিপ্টে। বাঙালি মহান, বাঙালি দুষ্ট। বাঙালি বাচাল, বাঙালি মৃদুভাষী। বাঙালি পেটুক, বাঙালি হাভাতে। বাঙালি বীর, বাঙালি বেঈমান।

 

দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী অঞ্চলে বাঙালিদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের রয়েছে হাজার বছরের সুদীর্ঘ ঘটনাবহুল ইতিহাস। এই অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্যের জেরে ও পূর্বপুরুষের ভিন্নতার কারণে বাংলাভাষী বাঙালিদের মধ্যে রয়েছে হাজার রকমের বৈচিত্র্য। ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রদেশ ভৌগলিক সীমারেখায় বিভক্ত হয়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে জীবনযাত্রা ও আচার-আচরণের তফাৎটা যেন একটু বেশী-ই নজরে পড়ে।

 

“বাঙালি হয়ে বাঙালির রাজ্যে যাচ্ছি” -ভেবে বাংলাদেশে থাকতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছিলাম। কোলকাতা বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন সমাপ্ত করে বাইরে এসে যখন আমাকে রিসিভ করতে আসা বড় ভাইকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। তখন পর্যন্ত আমার কাছে কোন ভারতীয় সিম না থাকায় একজন বাঙালি ট্যাক্সি ড্রাইভারের ফোন থেকে বড় ভাইকে ফোন করলাম, তখন নম্বর বন্ধ দেখাচ্ছিল।

 

পরে, বিমানবন্দরের ভিতরের টেলিফোন বুথ থেকে কল করেও পাচ্ছিলাম না। বুথের মিষ্টভাষী বাঙালি দিদি ভিতরে নিয়ে বসতে দিলেন। পঞ্চাশ রূপীর বিনিময়ে আধা ঘন্টার জন্য উনার পিসি নিলাম। তড়িঘড়ি করে ফেসবুকে লগইন করে স্ট্যাটাস দিলাম আমি পৌঁছেছি। এবং ঢাকাবাসী বন্ধু আলামীনকে ফেসবুকে ম্যাসেজ করলাম আব্বাকে আমার পৌঁছানোর খবর জানানোর জন্য। যখন বড় ভাইকে ফেসবুকেও পেলাম না, তখন বাধ্য হয়ে একশ/দেড়শো রূপীর এক্টিভ ভোডাফোন সিম ঐ বুথের দিদির কাছ থেকে সাড়ে আটশো রূপীতে কিনলাম। বুঝতে পারলাম, এই বাংলা আর আমার বাংলা এক নয়। ঐ সিম থেকে আব্বার কাছে কল দিলাম যেন ঐ ভাইকে ফোন দিয়ে আমার কাছে আসতে বলেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর ভাইকে পেলাম।

 

ভারতে প্রবেশের চৌদ্দ দিনের মধ্যে এফআরও (ফরেনার রেজিস্ট্রেশন অফিস)-এ রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস নিয়ে গেলাম বর্ধমানের ডিআইবি অফিসে। প্রথম প্রথম ভয় হলেও পরে অফিসারের মাথার উপর বাংলাদেশের জাতীয় কবি ও বর্ধমানের ছেলে কাজী নজরুল ইসলামের ছবি দেখে ভয় পালিয়ে গেল। মনে মনে বললাম, কাজীদা দেখি এখানে, তাহলে আর সমস্যা নেই! অফিসার খুবই ভাল মানুষ। একেবারে নিরেট ভদ্র বাঙালি যাঁকে বলে। অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আমাদের সাথে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করলেন।

দামোদর নদী, বর্ধমান

দামোদর নদী, বর্ধমান

বর্ধমানের বাজারে সবজি তরকারি সব আমাদের ওখানকার মতোই। কি নেই এই বাজারে? আলু, পটল, ঢেঁড়স, কুমড়া, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, ফুলকপি, ধনেপাতা, ডাঁটা ইত্যাদি প্রায় সব সবজি। মাছও আছে অনেক। ময়মনসিংহের সানকিপাড়া বাজার, মেছুয়া বাজার অথবা আমার গ্রামের পোড়াবাড়ী বাজারের মতই সব। তবে, ব্যতিক্রম হচ্ছে এই বাজারে বাড়তি কিছু জিনিস আছে, যেগুলো আমাদের ওখানে খাওয়া হয় না। যেমনঃ ছোট ছোট শামুক আমাদের দেশে হাসের খাবার হলেও এখানে কিছু কিছু মানুষ তা খায়। আবার, কচি কলাগাছের ভিতরের নরম কান্ডটাও এই বাজারে দেখতে পেলাম সবজির কাতারে। বর্ধমানের বাজার নিয়ে বিস্তারিত একটা লেখা ভবিষ্যতে প্রকাশের ইচ্ছে আছে।

 

এফআরও রিপোর্টের জন্য আমার সম্পর্কে ইনকোয়ারি করতে ফাইল ডিআইবি অফিস থেকে বর্ধমান থানায় পাঠানো হলো। থানায় প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস কি লাগবে তা জানতে এক কাঠফাঁটা রোদেলা দুপুরে গেলাম থানার সামনে। গরম আমি একদম সহ্য করতে পারি না। ফলে, প্রচন্ড গরমে শরীর দুর্বল লাগছিল, তাই থানার সামনের এক দোকানের সামনে একটা টুল দেখতে পেয়ে বসার জন্য দোকানির অনুমতি চাইলাম। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মত চমকিয়ে উনি বললেন, “না, না, এখানে বসা যাবে না!” আমি রাগে-দুঃখে-অপমানে তার দিকে শুধুই চেয়ে রইলাম! এই ব্যাটা বাঙালি? এটাই এই বাঙালির অতিথিপরায়ণতা? মনে মনে বললাম, বাংলাদেশ হলে নির্ঘাত ঘন্টাখানেকের মধ্যে এই ব্যাটার দোকান উচ্ছেদ করে দিতাম!

 

যাহোক, অফিসারের সাথে ফোনে কথা বললে তিনি সন্ধ্যায় যেতে বললেন। বর্ধমান শহরের সন্ধেবেলার আকাশ দেখতে দেখতে গন্তব্যে পৌঁছুলাম। এখানেও ভয় হচ্ছিল, থানার অফিসার কি না কি জানতে চায়! পরে ঐ অফিসারের সাথে দেখা হতেই কিছুটা ভয় দূর হলো, মনে হলো আমি তো এঁকে চিনি! তিনিও একজন সাদাসিধে বাঙালি অফিসার, অন্তত তাঁর আচার আচরণে তেমনই মনে হলো। উনি আমাকে একটা রুমে নিয়ে বসালেন। ওমা! এ কী? এখানেও তো অফিসারের মাথার উপর কাজীদা’র ছবি! সেই কাজী নজরুল ইসলাম, ত্রিশাল ও আশেপাশের আবালবৃদ্ধবনিতাদের কাছে চির পরিচিত যিনি। যেন ঘরের মানুষ।

 

আসলে ত্রিশালে প্রতিবছর নজরুল জয়ন্তী হওয়ার কারণে এই এলাকার মানুষের নিকট অতি পরিচিত তিনি। শিশুদের শৈশবের বার্ষিক আনন্দের একটা হচ্ছে নজরুল জয়ন্তীতে যাওয়া। এছাড়া ত্রিশালে জাতীয় কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার ফলে তিনি বর্ধমানের চেয়ে বেশী জনপ্রিয় ও আপনজন হয়ে গেছেন ত্রিশাল তথা ময়মনসিংহবাসীর কাছে।

 

যাহোক, থানাতেও বাঙালি অফিসারের ব্যবহারে মুগ্ধ হলাম। তিনিও খুব আন্তরিকতার সাথে প্রয়োজনীয় কাজ সমাপ্ত করলেন।…..চলবে ….

 

—লেখক :

মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়।

৩০-০৭-২০১৬ ইং।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment