বর্ধমানের চিঠি – ০৭

বর্ধমানে এক মাস কাটানোর পর মনে হলো এবার একটু জন্মভিটার মাটির ঘ্রাণ নিয়ে আসি। বাংলাদেশে আসার অনুমতি পেতে আবেদন পত্র নিয়ে গেলাম ডিআইবিতে। অফিসার বললেন – “এখন বাড়ি যাবে? এখন তো বাংলাদেশে গন্ডগোল চলছে!” আমি জবাব দিলাম, “কোন গন্ডগোল নেই, স্যার। তাছাড়া আমার দেশ, গন্ডগোল হলেও যেতে হবে।” ভদ্রলোক আর কথা বাড়ালেন না, অনুমতি দিয়ে দিলেন।

 

এবার প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। বাড়ি যাব, বাংলাদেশ। আমার মাটি, আমার মানুষের কাছে যাব। সুতরাং, প্রস্তুতি শুরু হলো। বর্ধমানের বিখ্যাত ‘ল্যাংচা’ ( এক প্রকার মিষ্টি) নিলাম, লাগেজে যতটুকু নেয়া যায়। ঢাকা নিবাসী বন্ধু আলামীনের মাধ্যমে বেনাপোল-ময়মনসিংহগামী বাসের সিট বুকিং দিলাম। এদিকে রাত্রিবেলায় বন্ধু মাহমুদুলের অনুরোধে পনেরোই আগস্ট নিয়ে একটি ডকুমেন্টারীর স্ক্রিপ্ট লিখতে হলো। সময় কম থাকায় তাড়াহুড়ো করে কোনমতে শেষ করলাম।

 

ঘুমোতে ঘুমোতে রাত আড়াইটা বেজে গেল। পরদিন সকালে বাস ধরতে হবে। আব্বা বলেছিলেন প্লেনে আসতে। আমার ইচ্ছে হলো বাসেই আসব। কারণ আকাশে উড়ে আসলে তো আর বাংলার অপরূপ রূপ দেখা হবে না! শেষপর্যন্ত আমার সিদ্ধান্তই মেনে নিলেন সবাই। বাসে করে বর্ধমান থেকে বনগাঁ, বেনাপোল বন্দর পেরিয়ে সরাসরি ময়মনসিংহের বাস, এই ছিল সোজাসাপ্টা প্ল্যান। কিন্তু, আমার জন্য এই যাত্রাটি যে এতটা রোমাঞ্চে ভরপুর করা থাকবে, কে জানতো!

 

ভোর সাড়ে ছয়টায় ঘুম থেকে ওঠে ফ্রেশ হয়ে রেডি হচ্ছি, তখন আমার ঘুম ভাঙাতে সিলেট থেকে মাহমুদুলের ফোন। আমি বললাম আমি উঠে গেছি। তারপর ফজরের ক্বাজা নামাজ পড়লাম। মঙ্গলবার দিন থেকে পশ্চিমবঙ্গের আকাশ ভেঙে যে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, তা বুধবারও অবিরাম চলছিল! এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করার চ্যালেঞ্জটা নিতেই হলো। রুমমেট জুলফিকার ভাই একটা অটো ডেকে নিয়ে আসলেন বাসার সামনেই। অটোতে চেপে বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। গলির মোড়ের দোকান থেকে রিচার্জ করলাম, দোকানের মাসীমা মায়ের ভূমিকায় বিদায় জানালেন সাবধানে যেও বলে।

 

বাসস্ট্যান্ডে এলাম পৌনে দশটার দিকে। বনগাঁর বাস ছাড়ার কথা এগারোটায়। বর্ধমানের বাসস্ট্যান্ডগুলো আমাদের থেকে আলাদা। ওখানে রেলের মতোই বাসও নির্দিষ্ট শিডিউল মেনে চলে। বিস্তৃত জায়গা জুড়ে বর্ধমানের নবাবহাট বাসস্ট্যান্ড। আলাদা আলাদা প্ল্যাটফর্ম। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গার সাথে বাস যোগাযোগ চলে। বাসের হেল্পারদের “এই কৃছননগর, এই আছানছোল, এই নবদ্বীপ” জাতীয় হাঁকডাক শুনে ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে শোনা “এই মমিসিং, জামালপুর, তিশশাল…” জাতীয় শব্দগুলো মনে পড়ছিল!

শ্যামা হোটেল, নবাবহাট বাসস্ট্যান্ড, বর্ধমান

শ্যামা হোটেল, নবাবহাট বাসস্ট্যান্ড, বর্ধমান

বাসস্ট্যান্ডের শ্যামা হোটেলে সকালের নাস্তা সারলাম। তারপর বনগাঁ যাওয়ার বাস যেখানে আসবে, সেই প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে রইলাম। বৃষ্টি চলছিল আগের মতই। দশটা পঞ্চাশে ফোন দিয়ে জানতে পারলাম আজকে বাস বন্ধ! আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। ওই মুহুর্তে বাসায় ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারলাম না। কাছাকাছি বসে থাকা একজনের সাথে কথা বললাম। তারাও বনগাঁয় যাওয়ার জন্যই এসেছিল।

 

আমি দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম, তবে আশাহত হলাম না। আত্মবিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রতি আস্থা রেখে মনে মনে বললাম, এই যাত্রা বন্ধ করব না। কাউন্টারের দুই মাসীর কাছে জিজ্ঞেস করলাম বনগাঁ পৌঁছানোর বিকল্প পথ কি আছে। তারা কৃষ্ণনগর যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। কৃষ্ণনগরের বাসে উঠে বসলাম। ষাট রূপী দিয়ে টিকিট কাটার পর শুনলাম বাস ছাড়বে বারোটা কুড়ি মিনিটে, অথচ, ঘড়িতে তখন এগারটা পঁচিশ! অর্থাৎ, আরও এক ঘন্টা এখানেই বসে থাকতে হবে!

 

অবশেষে বারোটা পঁচিশে বাস ছাড়লো। বর্ধমান শহর পেরিয়ে গ্রামের দিকে ছুটলো বাস। আর আমার ভ্রমণপিয়াসী মন সব দুঃশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বাংলার রূপ দর্শন করতে লাগলো! আহা! কি অপরূপ সেই রূপ! দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ। তার মাঝখান দিয়ে অপেক্ষাকৃত নীচু ও সরু পথ বেয়ে ছুটে চলেছি আমি। বরষার স্রোতধারা চলছেই। সে এক মনমাতানো মুহুর্ত, ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

 

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগুলো পরিকল্পিত, সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো-গোছানো বলেই মনে হলো। বিস্তৃত জায়গা জুড়ে ধানক্ষেত, তার মাঝে একটি করে পাকা বাড়ি। পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, ফুলবাগানে ঘেরা। প্রত্যেক গ্রামেই একটি করে “যাত্রী প্রতীক্ষালয়”, যেগুলো ওখানকার গ্রাম পঞ্চায়েত কর্তৃক নির্মিত। বাসগুলো আসছে, যাত্রী নামাচ্ছে-উঠাচ্ছে, সবকিছুই সুনিয়ন্ত্রিত। এমনকি ছোট ছোট স্কুলের বাচ্চারাও দেদারসে বাসে ওঠছে, কিছুদূর গিয়ে নামছে! যেন বলা যায় “গ্রামীণ বাস সার্ভিস!”

 

গ্রামগুলো প্রাচুর্যে ভরা। কোনকিছুর অভাব নেই। আমাদের বাংলাদেশের জনবহুল গ্রামগুলোতে কিছুটা সম্পদের সঙ্কট আছে হয়তো। তবে, কৃষিজ সম্পদে দুই বাংলার গ্রামীণ আবহ একই রকম মনে হলো। পশ্চিমবঙ্গের এত প্রাচুর্যের মধ্যেও একটি বিষয় দৃষ্টিতে বাঁধে, প্রায় সর্বত্রই “মা-দিদির সম্মান বাঁচান, শৌচাগার নির্মাণ করুন” জাতীয় স্লোগানে ভরপুর “নির্মল বাংলা” অভিযানের প্রচারণা সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম। অর্থাৎ, স্যানিটেশনের দিকে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হলেও, পশ্চিমবঙ্গ এদিকে পিছিয়ে আছে অনেক। এছাড়া, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের গুণকীর্তণ করা বিভিন্ন সাইনবোর্ডও চোখে পড়লো বেশ।

 

এভাবে অনেকগুলো গ্রাম পেরিয়ে বর্ধমান জেলা শেষ হলো। আমরা প্রবেশ করলাম নদীয়া জেলার গ্রামাঞ্চলে। নদীয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার সময় জীবনানন্দদাশের কবিতার চরণদ্বয় বারবার আবৃত্তি করতে লাগলাম, “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই, পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর!” বন্যার পানিতে সমগ্র নদীয়া ভেসে গেছে মনে হলো। সরু রাস্তার দুপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু সাদা জলরাশি দেখতে পাওয়া যায়। বিস্তীর্ণ জলাশয়ের তীরবর্তী জায়গাজুড়ে পাট ভেজানো রয়েছে।

 

বর্ধমানে যেমন ধানক্ষেত বেশী পেলাম, নদীয়ায় তেমন পাটক্ষেত। বানের জলে ডুবে যাওয়া পাট কাটতে ব্যস্ত কৃষকের দল। দূরবর্তী জায়গায় দেখলাম একপাল মহিষ। রাস্তার দু’ধারে ভেজানো পাটের সেই মনমাতানো ঘ্রাণ! এই পৃথিবীতে আমার যে কয়েকটি ঘ্রাণ সবচেয়ে প্রিয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পাকা ধান মাড়াইয়ের সময়কার ঘ্রাণ, ভেজা পঁচা পাটের ঘ্রাণ, গ্রামীণ জলাশয়ে মাছ ধরার মুহুর্তের পঁচা কাদার ঘ্রাণ ইত্যাদি। সুতরাং, আমি বুকভরা নিঃশ্বাস নিতে লাগলাম।

নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত


ভাগীরথী নদী

ভাগীরথী নদী

নদীয়া জেলার এমনই এক বিস্তৃত জায়গায় একটি ছোট সেতুর মাঝখানে পাঁচ মিনিটের জন্য বাস দাঁড়ালো। আমি যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম! এমন সুন্দর মুহুর্ত মানুষের জীবনে হরহামেশাই আসে না। ঝটপট কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। তারপর আবার যাত্রা শুরু হলো। অসংখ্য মাঠ, বিল-ঝিল, খাল-নদী গ্রাম পেরিয়ে একটা বড় নদীর তীরে পৌঁছুলাম। ব্রিজের প্রবেশপথে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর বিশাল মূর্তি দেখতে পেলাম। নীচে লেখা ‘ভাগীরথী নদী!’ আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ভাগীরথী নদী! অবিশ্বাস্য! কত পড়েছি এই নদীর কথা। কত কাহিনী প্রচলিত আছে এই নদীকে ঘিরে! মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিলাম। মোবাইলে কয়েকটা ছবি তুললাম।

 

নবদ্বীপ থেকে একজন লোক উঠে আমার পাশে বসেছিলেন। কথা বলে জানতে পারলাম তিনি একজন স্কুল শিক্ষক। তিনি জানালেন বগুড়া এবং ময়মনসিংহের দুজন বন্ধু তার সাথে লেখাপড়া করেছে। বাংলাদেশ নিয়ে আরও অনেক আলোচনা শেষে তার কাছে জানতে চাইলাম কৃষ্ণনগর থেকে বনগাঁয় যাওয়া যায় কিভাবে। উনি পথ বলে দিলেন এবং বাসের অন্য একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন যিনি ঐদিকেই যাবেন। কিছুক্ষণ পর কৃষ্ণনগর নামলাম। ঘড়িতে তখন বিকেল তিনটা বিশ। বর্ডারে পৌঁছুতে হবে ছয়টার মধ্যে! …. চলবে …।

 

-লেখক :

মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment