বর্ধমানের চিঠি – ০৮

কৃষ্ণনগর নেমে শুনলাম সরাসরি বনগাঁয় যাওয়ার বাস নেই। আশা না হারিয়ে কৃষ্ণনগর আসার বাসে ঐ শিক্ষক ভদ্রলোক অন্য যে ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর সাথে দত্তফুলিয়ার বাসে উঠলাম। জিজ্ঞেস করে জানলাম দত্তফুলিয়া পর্যন্ত যেতে কমপক্ষে ঘন্টা দেড়েক লাগবে, বেশীও লাগতে পারে। ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটা বাজে। অর্থাৎ হাতে মাত্র আড়াই ঘন্টা সময় আছে আমার।

 

এমন এক অনিশ্চিত যাত্রা শুরু হলো। অবশ্য আমার মনে তখন ভয় নয়, রোমাঞ্চকর এক অনুভূতির সৃষ্টি হলো। আমি সবকিছু ভুলে কল্পবিলাসী হয়ে ওঠলাম! ছোট একটি বাস সরু রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে চলছে। কৃষ্ণনগরের দোকানপাট, বাসা-বাড়ি পেরিয়ে চলছি আমি। কৃষ্ণনগরের এমপি তৃণমূলের তাপস পাল, আমার প্রিয় ভারতীয় বাংলা সিনেমার অভিনেতা। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কৃষ্ণনগর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়া জেলার একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা। কৃষ্ণনগরের কুমোরটুলির মাটির পুতুল ও মূর্তি পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ কুটির শিল্পগুলির অন্যতম।

 

বাসের একদম পেছনে একসাথে পাঁচটি সিটের মাঝেরটাতে বসেছি আমি। এটা আমার একটা টেকনিক। যেকোন জনসমাগমের পেছনের দিকে বসলে সবার প্রতি নজর দেয়া যায়। আমি তাই বাসভর্তি যাত্রীদের পাঠ করছিলাম! সারাদিন কর্মব্যস্ততায় কাটিয়ে সবাই যার যার বাড়িতে ফিরছে। স্কুল শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী, স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী -এই ধরনের যাত্রীই বেশী। দাঁড়ানো যাত্রীও আছে অনেক। মহিলাদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশী।

 

আমার একপাশে সদ্যপরিচিত ঐ ভদ্রলোক, আরেকপাশে একটা পাঁচ/সাত বছরের ছেলে, ওর মা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভাবনায় ডুবে গেলাম, পৃথিবীর সব মা বুঝি এমনই হয়! একবার ভাবলাম উঠে দাঁড়িয়ে সিটে বসতে দিই, পরক্ষণেই লাগেজের কথা ভেবে স্বার্থপর হয়ে গেলাম। ময়মনসিংহ-ত্রিশালের বাসে জীবনে কতবার মহিলাদের সিট ছেড়ে দিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু, এবার আর তা করলাম না!

 

পাশের ভদ্রলোক পেশায় শিক্ষক। নীরবতা ভেঙে তিনি খোশগল্প শুরু করে দিলেন। বাংলাদেশের নাট্যাভিনেতা মোশাররফ করিমের অনেক প্রশংসা করে বললেন, “বুঝলেন দাদা, মোশাররফ করিম পুরো নদীয়া জেলায় প্রচুর ফেমাস! আমরা সবাই তার অভিনয় দেখি।” দুশ্চিন্তায় ডুবে থেকেও এটুকু শুনে মনে প্রশান্তি এলো! মনে হলো, আরে! এটা তো নদীয়া জেলা। আরেকটু এগুলেই তো আমার বাংলাদেশ!

IMG_20160828_195438

এই নদীয়া-কৃষ্ণনগরের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ২৪ জুলাই, ১৯৭১ সালে জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে কৃষ্ণনগর একাদশের বিপক্ষে প্রথম খেলতে নামে স্বাধীন বাংলা ফুটবল টীম। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই খেলাটি ড্র হয় ০২-০২ গোলে।

 

তবে এ নিয়ে হট্টগোল কম হয়নি। বিশ্ব মিডিয়া সমালোচনা করে এমন ম্যাচের। ফলশ্রুতিতে নদীয়ার জেলা প্রশাসক সাসপেন্ড হন অফিসিয়াল একটি দল মাঠে নামানোয়, আর ভারতীয় ফুটবল এসোসিয়েশন (আইএফএ) বাধ্য হয় নদীয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগি পদ বাতিল করতে! সেই কৃষ্ণনগরের কথা ভাবছিলাম আর শিহরিত হচ্ছিলাম। একাত্তরের সেই সময়টাতে ফিরে গিয়ে কল্পনায় গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলাম “জয় বাংলা!”

 

এভাবে নদীয়ার জলবেষ্টিত ঘর-বাড়ি-গ্রাম পেরিয়ে বগুলা নামক একটি জায়গায় পৌঁছুলাম। নব্বই শতাংশ যাত্রীর সাথে আমার সদ্য পরিচিত ভদ্রলোকও নেমে গেলেন। পুরো বাস ফাঁকা। পেছন থেকে মাঝখানের একটি সিটে গিয়ে বসলাম। বগুলা স্টেশনে দশমিনিট অপেক্ষার পর বাস ছেড়ে দিল। বর্ষার বিকেলে একা একা নার্ভাস লাগছিল। তখন এগিয়ে এলেন একজন মহিলা, বাংলার মা। পাঁচটা কুড়ি মিনিটে দত্তফুলিয়া নামতে যাব, এমন সময় বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেল। সে কী বৃষ্টি!

 

লাগেজ নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই দত্তফুলিয়া বাজারের ব্রিজ পার হচ্ছি, ওপারে বনগাঁ যাওয়ার বাস। এমন সময় ঐ মাসীমা আমার মাথায় ছাতা ধরলেন। নিজে প্রায় পুরোটা ভিজে গেলেও আমাকে লাগেজসহ যথাসম্ভব শুকনো রাখলেন। বিদেশ বিভুঁইয়ে এমন মাতৃস্নেহ বুঝি বাঙালি মহিলার দ্বারাই সম্ভব! ভাবতেই আমার চোখে জল এসে গেল। দত্তফুলিয়ার বৃষ্টির জল আর আমার চোখের জল একাকার হয়ে গেল।

 

ব্রিজ পেরিয়ে এসে বনগাঁর বাসে উঠলাম। পাঁচটা ত্রিশে বাস ছাড়লো। এই বাসে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের সংখ্যা বেশী। ওদের হাস্যরস দেখে আমার বন্ধুদের কথা খুব মনে পড়ছিল। মাসীমা পাশে বসে মায়ের মত বারবার বলতে লাগলেন, “ভয় করছে তোমার? চিন্তা করো না, সময়মতো না যেতে পারলেও ওখানে ভাল হোটেল পাবে থাকার জন্য। আমার মেয়ের জামাইয়ের বাড়ি খুলনায়, সে প্রায়ই আসে।”

 

বাস নদীয়া ছেড়ে প্রবেশ করল উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলায়। কিছুক্ষণ পর হেলেঞ্চা নামক একটা জায়গায় তিনি নেমে গেলেন। সত্যিই, সারাদিন ধরে বৃষ্টিভেজা একটি দিনের শেষলগ্নে এসে যখন একাকী বোধ করছিলাম, তখন পশ্চিমবাংলার এই মা আমাকে স্নেহের বন্ধনে বেঁধে চিরঋণী করে ফেললেন! বাংলার মা, তোমায় হাজারো প্রণাম!

 

ঠিক ছয়টা পাঁচ মিনিটে বনগাঁ নামলাম। ঝুম বৃষ্টি পড়ছিল, চারপাশে অন্ধকার নেমে গেছে। সরাসরি একটা সিএনজি রিজার্ভ করে বর্ডারের দিকে ছুটলাম। ভাবলাম কোনভাবে যদি পার হওয়া যায়! কিন্তু, কিছুদূর গিয়ে বিএসএফের চেকপোস্টে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম বর্ডারে গিয়ে লাভ নেই। ঠিক ছয়টায় বন্ধ হয়ে গেছে। তখন বাজে ছয়টা কুড়ি। অর্থাৎ, মাত্র বিশ মিনিটের জন্য আমার বাংলাদেশে প্রবেশ বারো ঘন্টা পিছিয়ে গেল। বাধ্য হয়ে ফেরত আসতে হলো। বড় ভাইয়ের ফোন পেয়ে নির্দেশনানুযায়ী বনগাঁর “মাতৃমন্দির আবাসিক হোটেল”-এ পৌঁছুলাম।…চলবে…

 

-লেখক :

মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়।

 

Related Posts

About The Author

2 Comments

Add Comment

Leave a Reply to Mahedi Kawser Farazi Cancel reply