বর্ধমানের চিঠি- ০৯ (নওমহল থেকে ময়ূর মহল)

ছোট থেকেই দূর্গাপূজার উৎসব দেখে আসছি। আমাদের পোড়াবাড়ী বাজারে আমার জানামতে তিনটা পূজামণ্ডপে পূজা হয়। আমার আশৈশব চিকিৎসক ডা. গৌরাঙ্গ সাহেবদের ওখানে একটা, ঋষিপাড়ায় একটা, মাঝি পাড়ায় আরেকটা। সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন হয় প্রথমটাতে। এসময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা উৎসবে মাতোয়ারা হন।

আমি যখন প্রি-ক্যাডেট স্কুলে পড়ি, তখনকার ঘটনা। স্কুলে তিন/চার ক্লাস জুনিয়র এক হিন্দু ছেলে ছিল। নামটা আমার মনে পড়ছে না এখন, তপন না কি যেন নাম। ছেলেটা অল্প কয়েকদিনেই আমার খুব ভক্ত হয়ে গেল। আমিও খুব স্নেহ করতাম। একদিন বর্ষার ভরা ধুরাদীর খালে ডুবে ছেলেটা মারা গেল। আমার এখনও মনে পড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে অনেক কেঁদেছিলাম। এখনও ঐদিকে গেলে ওর কথা মনে পড়ে মন খারাপ হয়ে যায়।

আমার ছেলেবেলার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের যারা, তাদের মধ্যে সুদীপ্ত অন্যতম। ত্রিশালে থাকাকালীন মনিরকে নিয়ে ওদের বাসায় যেতাম প্রায়শঃই। এক পহেলা বৈশাখে ওর মা আমাদেরকে কাঁচা আম খাইয়েছিলেন, এখনও ভুলি নাই! ওর বাবা আমাদের হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের দিন ক্লাসে স্যারের মানবিক বক্তব্য শোনার সময় থেকেই আমি তাঁর ভক্ত।

বর্ধমানের পূজামণ্ডপ

বর্ধমানের পূজামণ্ডপ

আছিম যেখানে কোচিং করতাম, সেখানকার পরিচালক ছিলেন নিমাই স্যার। আট মাসের কোচিংয়ে পড়া না পারলে, দুষ্টামি করলে কিংবা ক্লাস ফাঁকি দিলেও স্যার আমাকে মারতেন না। অথচ, পাশের বন্ধুকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলতেন! স্যারের কাছ থেকে অসাম্প্রদায়িকতা কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে শিক্ষা পেয়েছি, তা পরবর্তীতে আমার জীবনে প্রভাব ফেলেছে। স্যারের মুখে শোনা আছিমের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ইতিহাস আমাকে দেশপ্রেম শিখিয়েছে।

ময়মনসিংহে আমি যেখানে থাকতাম, জায়গাটার নাম ছিল নওমহল। বর্ধমানে যেখানে থাকি, এখানকার নাম ময়ূরমহল। নওমহলের ১৪৪/এ নম্বর বাসার বাউন্ডারির ভেতরে কয়েক ঘর হিন্দু ধর্মাবলম্বী পরিবার ছিলেন। আমাদের ঘরটা ছিল দক্ষিণ-পূর্বকোণায় দেয়াল ঘেঁষা। বাসার গেটের কাছে হাসনাহেনা ফুলের গাছ। পাশে কয়েকটা তুলসী গাছ।

দুই রুমের বাসায় চারজন থাকতাম। বন্ধু হাবিব, রাকিব এবং আমি। আর থাকতেন ভিন্ন ধর্মের ভিন্ন পিতামাতার সন্তান অথচ আমাদের তিনজনের “আপন বড় ভাই তিতাস দাদা। তিনি একাধারে আমাদের অভিভাবক, বড় ভাই, জীবনের উপদেষ্টা, প্রতিদিন সকালে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকা হাতে পাওয়ার পর অনুষ্ঠিত “মিনি যুব সংসদের” স্পীকার-মডারেটর, প্রতিরাতের টকশোর সঞ্চালক/আলোচক ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুর দায়িত্বে পালন করেছেন!

নওমহল প্রাইমারী স্কুলের সামনের মন্দিরে মহাসমারোহে দূর্গাপূজা পালিত হতো, এখনও হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে পাশের হিন্দু ঘর থেকে মিষ্টি জাতীয় খাবার পাঠাতো। রাকিব একটু বেশী খেতে চাইতো।

বর্ধমান

বর্ধমান

ময়মনসিংহের নওমহল থেকে বর্ধমানের ময়ূরমহল, সব জায়গায় হাজার বছরের বাঙালি সম্প্রীতির রূপ অভিন্ন। হয়তোবা পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে কিছুটা অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয়, সামগ্রিক বিবেচনায় সেটা স্কিপ করা যায়।

তাই, বর্ধমানের বি.সি. রোডের মুসলিম হোটেল থেকে রাতের খাবার খেয়ে আসার পথে মাইকে যখন লালন সাঁইজির “মিলন হবে কতদিনে?” কিংবা ময়ূরমহল মাতৃসংঘের পূজামণ্ডপে রবিঠাকুরের গান শুনছিলাম, তখন মনেই হয়নি আমি জন্মভিটা থেকে শতমাইল দূরে আছি!

আবহমান বাঙালির চিরন্তন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চির অটুট থাকুক। যার যার ধর্ম মেনে শান্তির পথে হাঁটুক সকল মানবসন্তান।

এই কামনায়-

 

–এম.কে. ফরাজী,

১১.১০.২০১৬ইং

বর্ধমান।

Related Posts

About The Author

Add Comment