বর্ধমানের চিঠি – ১০

মানুষের মন বড় বিচিত্র। ভ্রমণপিয়াসী মানুষের মন আরও বিচিত্র। তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। সেই অর্থে আমি ভ্রমণকারী কিংবা পর্যটক নই। আমি বর্ধমান এসেছি জীবনের তাগিদে। সময়ের প্রয়োজনে ময়মনসিংহে কাজী নজরুল ইসলামের আগমনের শতবর্ষ পরে আমি বাংলার চিরবিদ্রোহী এই কবির জন্মস্থানে এসেছি।

আমার জীবনে বিদ্রোহী কবির প্রভাব প্রবল। ছোটবেলা থেকে নজরুল জয়ন্তী পালন ও ত্রিশালের নজরুল সেনা স্কুলে পড়ার কারণে আমি নজরুল সাহিত্য ও তাঁর ভাবধারা কর্তৃক প্রভাবিত হয়েছি। নজরুলের অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বিদ্রোহী মনোভাব, মানবাধিকার, অসাম্প্রদায়িকতা ও লেখনীর মাধ্যমে লড়াই -এগুলো আমাকে খুবই আকৃষ্ট করে।

তাজিয়া মিছিল দেখতে বর্ধমানের বি.সি. রোডে লেখক।

তাজিয়া মিছিল দেখতে বর্ধমানের বি.সি. রোডে লেখক।

এসব কারণে আমি নিজেকে একজন পথিক ভাবি। জীবনানন্দদাশের কবিতার চরিত্রের ন্যায় হাজার বছর পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখি। পথ চলতে চলতে দেখি এবং শিখি, কবি সুনির্মল বসুর ভাষায় “বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র!” এই যেমন গত এগারোই আগস্ট সড়কপথে বাড়ি যাওয়ার সময় বনগাঁর মাতৃমন্দির আবাসিক হোটেল থেকে বৃষ্টিভেজা যশোর রোড ধরে বেনাপোল চেকপোস্টের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন মনে মনে আবৃত্তি করছিলাম, অ্যালেন গিন্সবার্গের বিখ্যাত কবিতা “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” – “শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত মানুষের দল/ যশোর রোডের দুধারে বসত বাঁশের ছাউনি কাদামাটি জল।”

received_1677289725824994

বেনাপোল চেকপোস্ট পেরিয়ে স্বাধীন দেশের বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নিয়েছিলাম। কুষ্টিয়ার লালন সেতু পার হওয়ার সময় পাশের যাত্রীকে নিয়ে বেসুরো গলায় গান ধরলাম! নাটোর পৌঁছানোর পর আবার সেই জীবনানন্দ দাশ এলেন, ওখানকার এক হোটেলে মাত্রাতিরিক্ত ঝালের চিকেন খেয়ে পেট ঠান্ডা হলো, বাসে ফিরে আমিও বললাম, “আমাকে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের ঝাল চিকেন!”

টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সেখান থেকে সিএনজি করে কালিহাতী, ঘাটাইল, সাগরদিঘীর পাহাড়িয়া রাস্তা পেরোনোর সময় আবার গান, রবিঠাকুরের “গ্রাম ছাড়া এই রাঙামাটির পথ…!” এভাবেই ভাগীরথী, পদ্মা, যমুনা পেরিয়ে রাত দশটায় ক্ষীরু নদীর তীরে আমার পৈত্রিক বাড়িতে পৌঁছুলাম।

তাজিয়া মিছিল, বর্ধমান

তাজিয়া মিছিল, বর্ধমান

এবারে গিয়ে প্রায় দেড়মাসের ছুটি কাটিয়েছি। দেড়মাস সময় অনেক দীর্ঘ, কিন্তু হাজার বছরের পথিকের কাছে সে তো অতি সামান্য একটু সময়! ফলে, আবারো পথিক তার পথে নেমে পড়লো সেপ্টেম্বরের চব্বিশ তারিখ বিকেলে, যখন বৃষ্টিতে জঙ্গলবাড়ীর চারিদিক অন্ধকার, তখন।

তারপর দীর্ঘযাত্রা শেষে বর্ধমানের দিনানিপাত শুরু হলো। এখানকার অনেক কিছুর সাথে ময়মনসিংহের মিল খুঁজে পাই। অথবা নিজেই মিলন ঘটাই, যেন কখনোই বাড়ির জন্য মন খারাপ না হয়। যেমন বর্ধমানের বি.সি. রোড। মোটামুটি যেটুকু আমার ধারণা, শহরের ভেতরের প্রধান রাস্তা এটি। ওদিকে ময়মনসিংহ শহরের প্রধান রাস্তা টাউনহল থেকে জিলাস্কুল মোড়, নতুন বাজার হয়ে গাঙ্গিনারপাড় এলাকা পর্যন্ত। এখানে মিলটা হচ্ছে দুটো রাস্তাই পূর্ব-পশ্চিম বরাবর! বিরাট আবিষ্কার বলা চলে, তাই না?

তাজিয়া মিছিল, বর্ধমান

তাজিয়া মিছিল, বর্ধমান

কিন্তু, দশই মহররমের রাত্রিতে বি.সি. রোডের এক নতুন রূপ চোখে পড়লো! রাতের খাবার খেতে বের হয়ে দেখি এলাহী কান্ডকারখানা! শত শত মানুষ -শিশু, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ সবাই রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় বিভিন্ন মহল্লাভিত্তিক (শিয়া মতবাদের) মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন ইঞ্জিনচালিত গাড়িতে বিশাল সাইজের সাউন্ডবক্স, মাইক এবং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে মহাসমারোহে তাজিয়া মিছিল বের করেছে।

তাজিয়া মিছিল, বর্ধমান

তাজিয়া মিছিল, বর্ধমান

সামনে পেছনে যুবকেরা হিন্দি গানের তালে তালে বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচছে! একজন লোক নেতৃস্থানীয় হবে, মাইকে বারবার সবাইকে মহরমের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। নৃত্যরত ছেলেদের হাতে উন্মুক্ত তরবারী। মিছিলের সামনে একটা বিশাল সাইজের কি যেন কাঁধে বয়ে চলছিল একজন, আমি জিনিসটার নাম জানি না। এরকম বেশ কয়েকটা মিছিল দেখলাম। চোখের সামনে সরাসরি তাজিয়া মিছিল এই প্রথম দেখলাম।…চলবে…

তাজিয়া মিছিল, বর্ধমান

তাজিয়া মিছিল, বর্ধমান

(বিঃদ্রঃ আজকের পর্বটি স্নেহের ছোটভাই ফাহিমকে উৎসর্গ করে লিখলাম। আসলে একটু বেশী দেরি হলে অনেকেই ম্যাসেজে জিজ্ঞেস করেন পরবর্তী পর্ব কবে দিব? অপেক্ষায় থাকার কথা বলেন। সত্যি বলতে আমি এতে বিব্রত হয়ে পড়ি। লজ্জায় পড়ে যাই কি উত্তর দিব, এটা ভেবে। তবে, সত্যিই আমার লেখার বিপরীতে আপনাদের ফিডব্যাক আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আশা করি, লেখক-পাঠকের এই সম্পর্ক অটুট থাকবে, ইনশাআল্লাহ্। ধন্যবাদ।)

—মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়,

১৬-১০-২০১৬ ইং।

Related Posts

About The Author

Add Comment