বর্ধমানের চিঠি – ১১

যিনি নিয়মিত লিখেন, লেখালেখির সাথে যার নিত্য বসবাস -প্রকৃতভাবে তাকেই লেখক বলা চলে। কিন্ত, আমার মতো শখের লেখকদেরকে সেই অর্থে লেখক বলা যায় না। লেখালেখি কারও পেশা, কারও নেশা। আমার কোনটিই নয়। আমি মাঝে মাঝে লিখি। বর্ধমানে আসার পরপরই এই ধারাবাহিক লেখাটি শুরু করেছিলাম। সর্বশেষ লিখেছি ২০১৬ সালের অক্টোবরে। আশ্চর্যজনকভাবে সেই পর্বটি ছিলো কাছের ছোটভাই ফাহিমের অনুরোধে, আজকেও লিখতে বসেছি ওরই পীড়াপীড়িতে! আসলে লেখার জন্য কাহিনীর মধ্যে ঢুকে যেতে হয়। জাগতিক সমস্যাক্লিষ্ট হৃদয়ে লেখায় পরিপূর্ণ মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয় না।

 

দীর্ঘদিনের বিরতির পর লিখতে বসলাম। কি লিখবো? কতকিছুই তো ঘটে গিয়েছে গত দুই বছরে! এটা কোন প্রাত্যহিক দিনলিপি নয়। শুধুমাত্র উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোই লেখা যায়। এই যেমন, দশম পর্বের পর থেকেই বলি। সেটা ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস। বিদেশের মাটিতে আমার প্রথম বিজয় দিবস উদযাপন। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার বুকে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের উদ্যোগে ১৫-১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচদিনব্যপী বাংলাদেশ বিজয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সেবছর।

 

উপ-হাইকমিশন থেকে ইমেইল মারফত নোটিফিকেশন পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবো। ১৫ ডিসেম্বর ভোরবেলা জাহাঙ্গীর ভাই আর আমি বর্ধমান জংশন থেকে হাওড়াগামী ট্রেনে উঠলাম। ডিসেম্বর মাসের ভোর, তাই শীত একটু বেশীই ছিলো। তার উপর আমার হালকা সর্দিজ্বরও ছিলো। একদিকে ভারতের মাটিতে স্বাধীন বাংলার বিজয়োৎসবে অংশগ্রহণের আকুলতা, অন্যদিকে শারীরিক অস্বস্তি -দু’য়ের বিপরীতমুখী প্রবণতার মধ্যে দেশপ্রেমই প্রাধান্য পেলো। শরীরকে বললাম, “ধৈর্য্য ধরো!”

 

ট্রেন ছুটে চলেছে দিগন্তবিস্তৃত কুয়াশাচ্ছন্ন প্রান্তরের বুক চিরে। শীতের সকালের লোভনীয় রোদের প্রস্ফুটিত আলোকবিন্দু শিশিরভেজা সবুজ মাঠে যেন শত শত হীরকের কণার ন্যায় মনে হচ্ছিলো। ট্রেনের কামরাভর্তি মানুষ, সবাই ভারতবর্ষের -শুধু আমরা দু’জন ছাড়া! চাওয়ালার কাছ থেকে চা নিলাম। আমার একটি ভাল গুণ হচ্ছে, যেকোনো পরিবেশে খাপ খাইয়ে তা উপভোগের চেষ্টা করা। সেদিনও তাই করলাম। আমি মানুষ দেখতে ভালবাসি। সরকারি কর্মচারী, কৃষক, শ্রমিক, বেসরকারি চাকুরে -প্রত্যেককেই পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। এই মানুষগুলোর হাড়ভাঙা পরিশ্রমেই গড়ে উঠেছে ভারতীয় অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি। একবিংশ শতককে বলা হচ্ছে এশিয়ান শতক। আর এশিয়ায় চীন ও ভারত ক্রমশঃ পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। এই ভারতের সোয়াশো কোটি মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে ভারত হয়ে উঠেছে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী এক জাতি।

 

প্রায় ঘন্টা তিনেক পর হাওড়ায় নামলাম। হুগলি নদীর এদিকে হাওড়া জংশন। আমাদের অনুষ্ঠানের ভেন্যু “নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়াম” অপর তীরে। এদিক থেকে ওদিকে যাওয়ার জন্য বাস আছে, ট্যাক্সিক্যাব আছে আর আছে ফেরি। জাহাঙ্গীর ভাই প্রস্তাব দিলেন ফেরিতে করেই নদী পার হবার।

 

অগত্যা মেনে নিলাম সেই প্রস্তাব। টিকিট কেটে ফেরিতে গিয়ে বসলাম। আমার জীবনে সেই প্রথম ফেরিতে উঠলাম। নদীর শীতল হাওয়ায় অসুস্থতা যেন বেড়ে গেলো। চোখভরে অঝর ধারায় জল পড়ছে। কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হয়ে নদীর সৌন্দর্য্য উপভোগের চেষ্টা করলাম। ফেরি যখন মাঝ নদীতে, তখন সবচেয়ে উৎফুল্ল হলাম কলকাতা তথা ভারতবর্ষের গর্বের হাওড়া ব্রীজের (বর্তমান নাম রবীন্দ্র সেতু) অপরূপ সৌন্দর্য্য অবলোকন করে।

[রবীন্দ্র সেতু (পূর্বনাম হাওড়া ব্রিজ) হুগলি নদীর উপর অবস্থিত কলকাতা ও হাওড়া শহরের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী সেতুগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৮৭৪ সালে প্রথম হাওড়া সেতু নির্মিত হয়। পরে ১৯৪৫ সালে পুরনো সেতুটির বদলে বর্তমান ক্যান্টিলিভার সেতুটির উদ্বোধন হয়। ১৯৬৫ সালের ১৪ জুন সেতুটির নাম পরিবর্তন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে রবীন্দ্র সেতু রাখা হয়।

 

রবীন্দ্র সেতু বঙ্গোপসাগরীয় প্রবল ঝড়ঝঞ্জাগুলি সহ্য করতে সক্ষম। এই সেতু দিয়ে দৈনিক ৮০,০০০ যানবাহনও প্রায় ১০ লক্ষ পথচারী চলাচল করে। এই জাতীয় সেতুগুলির মধ্যে রবীন্দ্র সেতু বিশ্বে ষষ্ঠ বৃহত্তম।

 

হাওড়া ব্রিজ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর উপর অবস্থিত বড় খিলানযুক্ত একটি ঝুলন্ত সেতু৷ সেতুটি ১৯৪৩ সালে অনুমোদিত হয়৷ প্রকৃতপক্ষে সেতুটির নামকরণ করা হয় নিউ হাওড়া ব্রিজ হিসাবে, কেননা একইস্থানে অবস্থিত কলকাতা এবং হাওড়া জেলার মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী একটি ভাসমান সেতুর পরিবর্তে এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়৷ ১৯৬৫ সালে সেতুটির নাম ভারত এবং এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে পুনঃ নামকরণ করা হয়৷ -উইকিপিডিয়া]

এর আগে হাওড়া ব্রীজ থেকে নদীর দৃশ্য দেখেছি, এবার মাঝনদী থেকে ব্রীজটা দেখে আনন্দিত হলাম। নদীর দুইধারে মন্দির, বাড়িঘর আর অফিসিয়াল দালানকোঠা। নদীভর্তি সারি সারি ছোট ছোট যাত্রীবাহী ফেরি চলাচল করছে। সত্যিই খুব মনোরম এক পরিবেশ!

 

কিছুক্ষণের মাঝেই নদীর অপরতীরে পৌঁছে গেলাম। অর্থাৎ, আমরা হাওড়া জেলা থেকে কলকাতায় প্রবেশ করলাম।….চলবে…

—লেখক : মোঃ মেহেদী কাউসার, শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় (১৩-০৭-২০১ ইং)

আগের পর্বগুলো পড়ুন

Related Posts

About The Author

Add Comment