বাংলাদেশের প্রধান সংকট ও বুদ্ধিজীবিদের নীরবতা প্রসঙ্গ

বিবিসিতে প্রকাশিত একটি সংবাদে এই ছবিটি প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসির ছবিটিই প্রধান ফটোতে দিলাম; বিবিসির সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার মেলবন্ধন রয়েছে কীনা। অন্যান্য উৎস থেকেও আরও অনেক ছবি দেয়া যাবে। গত এক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশে এরকম শতাধিক ছবি ও ঘটনার জন্ম হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে নিয়মিত অসংখ্য খবর ও ছবি প্রকাশিত হয়ে আসছে।

ছবিটির ব্যাকগ্রাউন্ড যদি দেখি তাহলে দেখবো-শহীদ মিনারে বাংলাদেশের একদল নাগরিক সমবেত হয়েছেন, তাদের দাবি দাওয়া জানাতে চেয়েছেন। সেখানে তাদের দাড়ানোর সুযোগ তো দেয়া হয়নিই বরং তাদেরকে মেরে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে। দণ্ডায়মান শহীদ মিনারের সামনে শায়িত এক তরুণ। এ যেন বর্তমান বাংলাদেশেরই এক প্রতিচ্ছবি! ছবিতে হামলারত ক্যাডার ও দাড়িয়ে থাকা ছাত্রদের মধ্যে ফ্রেমে থাকা কুকুরটিকেই সবচেয়ে বেশি মানবিক মনে হচ্ছে। কুকুরটির ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে আন্তরিকভাবেই এ ধরণের পাশবিক হামলার প্রতিবাদ করছে!

ছবিটা বাংলাদেশের চলমান সংকটকে প্রতিনিধিত্ব করছে। গত এক সপ্তাহে যে ধরণের ছবি ও ভিডিওচিত্র সৃষ্টি হয়েছে তা কী আক্রান্তের মা-বাবা, ছোট-ভাইবোন, পরিবারের সদস্যরা হজম করতে পারবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য তাদের সন্তানকে পাঠানো যেকোন মা-বাবা আতঙ্কিত না হয়ে পারবে? বা বাংলাদেশের কোন সচেতন নাগরিক কী আতঙ্কিত না হয়ে পারবে?

চলমান এ সংকটকে সুতো ধরে আমার আলোচনায় প্রবেশ করি। আলোচনার পূর্বে কয়েকট প্রশ্ন রাখি। এগুলোর উত্তর ধীরে ধীরে কিছুটা দেয়ার চেষ্টা করবো। আপনারাও এখানে যোগ করতে পারেন।

  1. বাংলাদেশের এখনকার মৌলিক সংকট কী?
  2. আমরা দীর্ঘদিন ধরে যে সমস্যাগুলো দ্বারা আক্রান্ত সেগুলো কী কী?
  3. আর ভবিষ্যতে কোন কোন সমস্যার মোকাবিলা করতে হতে পারে?
  4. সত্যিকারের কল্যাণ রাষ্ট্র হওয়ার পথে আমাদের বাঁধাগুলো কী কী? আমরা কীভাবে সেগুলো উত্তরণ ঘটাতে পারি?

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকটের তালিকা করতে হলে প্রথমেই আমি যেটা বলবো সেটা হলো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার সংকট। মানে একটি রাষ্ট্রের সচলতার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, একইসঙ্গে তাদের মধ্যে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় যে স্বাধীনতা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিভাগের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা, স্বাধীনতা ও সায়ত্তশাসনের অভাব সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

আধুনিক রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভ ছবি ক্রেডিট: স্টাডি ডট কম

শাসনবিভাগ, বিচারবিভাগ ও আইনসভার মধ্যে সমন্বয় থাকলেও তা নেতিবাচক অর্থে বিরাজমান। তিনটি বিভাগের মধ্যে ভারসাম্যের উপরই সবল রাষ্ট্রের চিহ্ন বর্তমান। তিনটি বিভাগই যদি সবল, শক্তিশালী, সচল ও স্বনির্ভর হয় তখন রাষ্ট্রের চাকা সচল থাকে।

রাষ্ট্রের এ তিনটি পাল্লার একটি যদি বেশি ভারি হয় তাহলে পাল্লা একদিকে বেশি ঝুলে যাবে এবং অন্য পাল্লা দুটোকে ঝুঁকিতে ফেলে দেবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটিই হচ্ছে। এখানে বেশিরভাগ ক্ষমতা শাসনবিভাগের উপর ন্যাস্ত বা শাসনবিভাগ নিজে সেসব ক্ষমতা বাগিয়ে নিয়েছে। শাসনবিভাগ বিচারবিভাগের উপর প্রভাব রাখে, বিচারক নিয়োগ থেকে শুরু করে বিচারের ফলাফল নির্ধারণে শাসনবিভাগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সুস্পষ্ট।

বেশিরভাগ ক্ষমতা শাসনবিভাগের উপর ন্যাস্ত বা শাসনবিভাগ নিজে সেসব ক্ষমতা বাগিয়ে নিয়েছে। শাসনবিভাগ বিচারবিভাগের উপর প্রভাব রাখে, বিচারক নিয়োগ থেকে শুরু করে বিচারের ফলাফল নির্ধারণে শাসনবিভাগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সুস্পষ্ট।

স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচারবিভাগ গঠনে বাংলাদেশকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত; দুজায়গাতেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ন্যায়বিচার প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত করছে।

জনসংখ্যা ও সংকটবহুল দেশটির শত সহস্র মামলা নিষ্পত্তিতে যে বিচারিক অবকাঠামো নির্মাণ দরকার তা অনেক কম। বিচারক নিয়োগ বাড়লেও বিশাল সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তিতে তা অনেক কম।

রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের মধ্যে অপর বিভাগ; আইনসভা শুরু থেকে খুবই দুর্বল। নব্বইয়ের পর তথাকথিত গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলেও কখনো মজবুত সংসদ ছিলো না। নব্বইয়ের পর থেকেই সংসদে সরকারদল ও বিরোধীদলের সুষ্ঠু প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ ছিল না। বিরোধীদলকে কোণঠাসা করে রাখা বা কথায় কথায় বিরোধী দলের সংসদ অচল করে রাখা বা সংসদ বয়কটের হুমকি সুন্দর সংসদ উপহার দিতে সহায়তা করেনি। সংসদে সরকারী দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে যে চমৎকার যুক্তর লড়াই হওয়ার কথা তা আমরা খুব কমই দেখিছি। সরকারী দল কর্তৃক সরকার প্রধান বা দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দের স্তুতি এবং বিরোধী দলের প্রতি বিষোদগার আবার বিরোধী দলের সাংসদ কর্তৃক বিরোধীতার জন্য বিরোধীতার সংস্কৃতি সংসদকে সবল হতে দেয়নি। আমাদের গৌরবজনক সংসদীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। দিনদিন সেটি আরো নাজুক হয়ে একদলীয় মঞ্চ হয়ে দাড়িয়েছে যার অর্ধেক সদস্য আবার বিনা ভোটে নির্বাচিত। তাদের উপর জনগণের ম্যান্ডেট নেই তাই তাদের তেমন দায়বদ্ধতাও নেই। এছাড়া অন্যরাও প্রহসনের ভোটে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হয়েছেন। সবাই মিলে সংসদকে একটি নাট্যমঞ্চ বানিয়ে রেখেছেন। নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা, নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি করা ছাড়া এই সংসদের অর্জন কী তার তালিকা করলে হতাশই হতে হবে।

স্বাধীনতার পর থেকেই সংসদে এমপিগণ তাদের দলনেতা বা শীর্ষনেতাদের স্তুতি গেয়ে যে সময় ও দেশের অর্থ অপচয় করেছেন তার চেয়ে কাজের কথা কয়েকগুণ কম বলেছেন।

স্বাধীনতার পর থেকেই সংসদে এমপিগণ তাদের দলনেতা বা শীর্ষনেতাদের স্তুতি গেয়ে যে সময় ও দেশের অর্থ অপচয় করেছেন তার চেয়ে কাজের কথা কয়েকগুণ কম বলেছেন। আমাদের সংসদ সদস্যরা সংসদে যেরকম স্তুতি গায় তা উন্নত বিশ্ব দূরের কথা ভারত-পাকিস্তানের সংসদেও হয় না। আমাদের সাংসদদের স্তুতির সঙ্গে কেবল আফ্রিকার কয়েকটি দেশের তুলনা করা যাবে। অথচ সংসদে অধিবেশন চলাকালে রাষ্ট্রের অর্থের যে ক্ষতি হয় তা দিয়ে কোটিখানেক মানুষের কয়েকদিনের খাবারের ব্যবস্তা করা যেতো, কয়েক লাখ যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতো। গুদের উপর বিষফোড়া হলো অনেকটা অকার্যকর এ সংসদ চালাতে যে খরচ হয় তাতে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পার্লামেন্টগুলোর কাতারে নাম লিখিয়েছি। তৃতীয় বিশ্বের এ দেশটিতে, দারিদ্র্যপীড়িত এ দেশটির সাংসদের কাছে আরও দায়বদ্ধতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা দাবি আমরা করতেই পারি। সংসদকে সচল ও কার্যকর করা গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু রাজনীতির বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মাত্র চল্লিশ বছরের ইতিহাসে তিন থেকে চারটি সরকার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচেনে নির্বাচিত এবং তাদের স্বাভাবিক প্রস্থান ঘটেনি। কীভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করতে হবে এবং কীভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে এ বিষয়টি এখনো নির্ধারণ হয়নি।

ক্ষমতা হস্তান্তরের সংকট

বাংলাদেশের রাজনীতির আরেকটা বড় সংকট হচ্ছে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সংকট। প্রতিটি সরকারই ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করেছে। মাত্র চল্লিশ বছরের ইতিহাসে তিন থেকে চারটি সরকার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচেনে নির্বাচিত এবং তাদের স্বাভাবিক প্রস্থান ঘটেনি। কীভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করতে হবে এবং কীভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে এ বিষয়টি এখনো নির্ধারণ হয়নি। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে এ বিষয়টিতে এখনো সুরাহায় পৌছেনি বাংলাদেশ। নির্বাচন কমিশন দিনদিন আরো দুর্বল আকার ধারণ করছে। মাঝখানে দুয়েকটি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের প্রশংসনীয় ভূমিকা দেখা গেলেও ধীরে ধীরে নির্বাচন কমিশনকে দুর্বল করে দেয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি তার সায়ত্বশাসন ও স্বাধীনতা হারিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের ক্রীড়নকে পরিণত হচ্ছে।

কেন্দ্র দখল করে জালভোট ছবি-যুগান্তর

নির্বাচনে ভোট দেয়ার স্বাধীনতা এ দেশের মানুষের প্রাণের দাবি। তারা সুষ্ঠুভাবে, স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চায়। কিন্তু নিয়মিত বিরতিতেই বিভিন্ন সরকার এ ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছে, প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন করেছে। মনে রাখতে হবে আমাদের রাষ্ট্রের জন্ম প্রক্রিয়ার সঙ্গে একটি নির্বাচনের ম্যান্ডেট জড়িত। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ম্যান্ডেট না পেতাম তাহলে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হতে কীনা তা ভাবার বিষয়।

ভোটের মাধ্যমে যে স্বাধীন রাষ্ট্রের ভ্রুণ প্রতিষ্ঠা হলো সে স্বাধীন রাষ্ট্রে শুরু থেকেই কেন প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের চর্চা চলছে। ইয়াহিয়া খানের মতো একজন ঘৃণিত ব্যক্তির হাতে এতো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারলে স্বাধীন বাংলাদেশে কোন সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ ও প্রশ্নহীন নির্বাচন হচ্ছে না কেন?

এ প্রশ্নগুলো আমাদের করতে হবে। আমাদের স্বাধীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং বাংলাদেশকে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা ও ভোটাধিকার প্রয়োগ করা শিখতে হবে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটারবিহীন একটি ভোটকেন্দ্রের দৃশ্য। এরকম হাজারো ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসেনি ভোটাররা বা তাদের আসার প্রয়োজন ছিল না। ছবি সূত্র: ডয়েচে ভেলে

রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের বাইরেও অন্যান্য যে কয়েকটি সায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেমন দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, ন্যায়পাল; এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ ও ক্ষমতা সুস্পষ্ট নয়। সে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বা তাদেরকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছেনা।

আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করা থাকে এবং একটির সঙ্গে অপরটির চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের একটা সম্পর্ক থাকে। কোন বিভাগ যখন অপর কোন বিভাগ বা বিভাগসমূহের চেয়ে বেশি ক্ষমতা ভোগ করে তখন রাষ্ট্র কাঠামোর ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

আধুনিক রাষ্ট্রের চতুর্থ পিলার বা স্তম্ভ বলা হয় সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমকে। বাংলাদেশে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে তা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে বুঝতে পারেন। সরকারের সমালোচনা করে বা সরকারের কর্মকাণ্ডকে সমালোচনা খবর প্রচারের জন্য অনেক সংবাদপত্রকে হুমকি দমকি দেয়াসহ অনেকগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ৫৭ ধারার মতো একটি ধারা সৃষ্টি করা হয়েছে যার মাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশকে থামিয়ে দেয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার যেমন হচ্ছে গণমাধ্যমেও এর চর্চা হচ্ছে। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ সাংবাদিকতা হচ্ছে। নির্মোহ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার জন্য যে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা দরকার তা পেতে আমাদেরকে অনেক দূর যেতে হবে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি সভা সমাবেশের স্বাধীনতা আজ নেই বললেই চলে। সর্বশেষ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন অ্যাক্টিভিস্টরা যেভাবে পুলিশি হেনস্তার শিকার হয়েছেন তা আমাদের রাষ্ট্রের নাজুক অবস্থাকে আরো দুর্বলভাবে তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ এমন একটি জায়গায় গিয়ে পৌছেছে যেখানে সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সভা সমাবেশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়েছে। ভাবখানা এমন সরকার অনুমোদিত কোন বিষয় ছাড়া কেউ রাজপথে নামতে পারবে না, সরকারের কোন সমালোচনা করতে পারবে না, সভা-সমাবেশ করতে পারবে না।

এসব কিছু ঠেলে যারা রাস্তায় নামবেন তাদেরকে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেনস্তার শিকার হতে হবে, তাদের টিয়ার গ্যাস-রাবার বুলেটের মুখোমুখি হতে হবে। এর সঙ্গে রয়েছে দেশব্যাপী ছাত্রলীগের ক্যাডারদের প্রহরা, নিজ হাতে গ্রহণ করা বিরোধী মতকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব।

এমন কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাড়িয়ে অনেক ছাত্র-জনতা, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি মুখ খুলেছেন, রাস্তায় নেমেছেন, আওয়াজ তুলেছেন-হুমকি-দমকির মুখোমুখি হয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার সমর্থিত ক্যাডারদের হয়রানির শিকার হয়েছেন-যা বাংলাদেশের এমন ক্রান্তিকালে আশা জাগানিয়া ঘটনা।

পুলিশি হেনস্তার শিকার হচ্ছেন ফাহমিদুল হকের মতো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা ছবি সংগ্রহ: অরণ্য আরিফ

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক সংকটগুলো নিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা অনেক বুদ্ধিজীবি জানলেও সেগুলোর দিকে আলো ফেলেন না কেন? রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংকটে, রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিভিন্ন সংকটে অনেক বড় বড় বুদ্ধিজীবি চুপ থাকেন কেন। সেসব কারণগুলো তল্লাশী করলে আমরা যা দেখবো তা হচ্ছে:

১. ওই বুদ্ধিজীবি চুপ থাকেন কারণ তিনি পুরোদস্তুর বুদ্ধিজীবি হয়ে উঠতে পারেননি বা চেষ্টা করেননি। তিনি বড়জোর চাকুরীজীবি।

২. তিনি অতীতে পরে আছেন। নস্টালজিয়া কিংবা অতীতপ্রেমে মোহাচ্ছন্ন। বর্তমান তাকে ছুঁয়না। বর্তমান সংকট পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে মেলাতে পারেন না। তিনি উটপাখী।

৩. তিনি একজন সুবিধাভোগি। কোন সুবিধাভোগির পক্ষে কথা বলা অসম্ভব।

৪. তিনি জীবন ও পরিবারের ভয়ে আতঙ্কিত।

শেষের পয়েন্টটা নিয়ে যদি আগে কথা বলতে চাই, তাহলে বলা যায় প্রত্যেক মানুষেরই জীবন ও পরিবারের ভয় রয়েছে, বুদ্ধিজীবিরা এর বাহিরে নন। ভীত ও পরিবার নিয়ে সচেতন হওয়া বুদ্ধিজীবিতার একেবারে নেতিবাচক কোন বৈশিষ্ট্য নয়। নিজের জীবন ও পরিবার নিয়ে সতর্ক হয়েও বুদ্ধিজীবি হওয়া যায়।

তবে বাংলাদেশের মতো তৃতীয়বিশ্বের দেশ ও বহুল সংকটাবর্ত দেশগুলোর জন্য এ বিলাসিতার সুযোগ খুবই কম। এখানে বুদ্ধিজীবি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেক দায় শোধ করতে হয়, অনেক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়।

বুদ্ধিজীবিদের অনেক সমস্যা মাথায় নিয়ে চ্যালেঞ্জিং ভূমিকা পালন করতে হয়। সময়ের সংকট অনুধাবন এবং তা নিরসনে নিজের সুস্পষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করা বুদ্ধিজীবির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নোয়াম চোমস্কি ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিরোধ করে করেই বুদ্ধিজীবি হয়ে উঠেছেন। এডওয়ার্ড সাঈদ মার্কিন মুল্লুকে বসে ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েই বুদ্ধিজীবি হয়েছেন। তাদের সামনেও জায়োনিজম বা মোসাদের ভয় ছিল। ভয়-ভীতি উতরে গিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলাটাই বুদ্ধিজীবির কাজ। বাংলাদেশেও অনেক বুদ্ধিজীবি তাদের সাধ্যমত কাজ করে যাচ্ছেন। আনু মোহাম্মদ, সলিমুল্লাহ খান, ফরহাদ মজহার কিংবা রেহনুমা আহমেদরা অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে জিয়া হাসান, ফারুক ওয়াসিফ, কল্লোল মোস্তফাদের মতো বুদ্ধিজীবি ও অ্যাক্টিভিস্টরা নিয়মিত প্রশ্ন উত্থাপন ও বিভিন্ন ইভেন্টে ইন্টারভ্যান করার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। তবে এ সংখ্যাটা একেবারেই সংখ্যালঘু। নিজ স্বার্থের বাইরে দাড়িয়ে সবার স্বার্থ নিয়ে, দেশ ও মানুষের স্বার্থ কথা বলা বুদ্ধিজীবি কিংবা মানুষের সংখ্যা খুবই কম।

স্বার্থপরতা ও সুবিধাভোগি আচরণ আমাদের বুদ্ধিজীবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। যার যার স্বার্থের জায়গা থেকে, সুবিধাভোগের জায়গা থেকে খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবিরা চুপ থাকেন। জাতির বিবেক হিসেবে স্বীকৃত পাওয়া অনেক বড় বড় বুদ্ধিজীবির নীরবতা খুবই পীড়াদায়ক।

বাংলাদেশের রাস্তায় রাস্তায় তরুণরা যখন মার খাচ্ছে, রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তখন বেশিরভাগ পক্ককেশী বুদ্ধিজীবিকে মুখ খুলতে দেখা যায় নি। হয়তো তারা আরো পরে বা মোক্ষম সময়ে বয়ান দেবেন।

১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০০৭ এও বেশিরভাগ পক্ককেশী বুদ্ধিজীবি বা সরকারী বুদ্ধিজীবিরা ক্ষমতার আশেপাশে থেকেই ক্ষমতার মধু ভোগ করেছেন। বেয়ারা, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া তরুণরাই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের যতগুলো বড় পরিবর্তন হয়েছে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ছাত্ররা, তরুণ রাজনৈতিক কর্মী, অ্যাক্টিভিস্ট ও চিন্তকরা। সাম্প্রতিক সময়ে সিনিয়র সিটিজেন খ্যাত সরকারের আশেপাশে থাকা বুদ্ধিজীবিদের নীরবতা দেখে তরুণদের শিক্ষা নিতে হবে যে, বড় বড় পক্ককেশীদের উপর নির্ভরশীলতা বা আশাবাদ নয়; তারা আমাদের/আপনাদের বাবা বা দাদা হওয়ার নূন্যতম যোগ্যতাও রাখে না। বুদ্ধিজীবি নয় স্রেফ বাবা বা দাদার জায়গা থেকে দেখলেই সত্য এসে ধরা পড়তো। তারা অনেকেই চোখ, কান ও মুখ বন্ধ রেখেই চলেন। নিজের স্বার্থের বাইরে বেশি পা ফেলেন না, মুখ খুলেন না, সরকারকে নারাজ করেন না। সরকারকে তোয়াজ করে চললেই তাদের লাভ তাই আপনার বা আমাদের লাভ দেখার তাদের টাইম নেই।

আমাদের প্রজন্মের তরুণদের নিয়ে বলা হয়; তারা রাজনীতি বুঝে না, উচ্ছন্নে যাওয়া প্রজন্ম, ফেসবুক প্রজন্ম কিন্তু এরাই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরও যে দম, জজবা দেখাচ্ছে এটাই তাদেরকে সবল করবে, ভবিষ্যত নেতৃত্বের জন্য তৈরি করবে। গুন্ডাদের ক্ষমতা বা গুন্ডাদের প্রভাব বড়জোর পাঁচ বছর বা এক দশক। ছাত্রজনতার প্রতিরোধী প্রজন্মটির নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনার খাতায় লেখা থাকবে।

ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে মার খেয়ে যাওয়া সেইসব সাহসী তরুণদের হাতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যত। তারা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেলে জয় একদিন আসবেই। যে ত্যাগ, রক্ত, ঘাম ঝড়েছে তা ব্যর্থ হওয়ার জন্য নয়।

অনেকে বলেন একদল চাকুরপ্রার্থীর বৈষম্যে রাষ্ট্রের কী যায় আসে? তাদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতার কী রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে? মনে রাখতে রাষ্ট্রের অনেক ছোট ছোট বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেই বড় বড় বিষয়গুলোর সুরাহা হয়। আপাতদৃষ্টিতে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠির চাকুরীতে বৈষম্যহীন সুযোগের দাবি মনে হলেও তা আরো অনেক বড় বড় প্রশ্নের কাছে নিয়ে যায়।

সমান্য কাগজের দামের পার্থক্য, লবণের দামের ফারাক ও চাকুরীতে বৈষম্য পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাধর শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল যা পরবর্তীতে বড় বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে এবং তার মোকাবিলা করতে শিখিয়েছিল। রাষ্ট্রভাষার মতো আপাত নিরীহ একটা ইস্যুই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করে দিয়েছিল। কোন ইস্যুই ছোট নয়; যেখানে ছাত্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ঐকমত্য রয়েছে সেটিতো ছোট হতেই পারে না!

সমান্য কাগজের দামের পার্থক্য, লবণের দামের ফারাক ও চাকুরীতে বৈষম্য পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাধর শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল যা পরবর্তীতে বড় বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে এবং তার মোকাবিলা করতে শিখিয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে, স্বাধীন বাংলাদেশে যেকোন বৈষম্যমূলক আইন, রীতি-নীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলা বর্তমানের বুদ্ধিজীবিদের অন্যতম দায়িত্ব। ছাত্ররা একটি জাতির এন্টেনা-রাষ্ট্রের গভীর সংকট তাদের অ্যান্টেনায় প্রথম ধরা পড়ে, প্রথম সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করে এই অংশটিই। তাই তাদের পাশে আত্মিক ও মানসিকভাবে থাকা যেকোন বুদ্ধিজীবি কিংবা সচেতন মানুষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

Related Posts

About The Author

Add Comment