বাংলাদেশে তিন প্রকারের শিক্ষা ও তিন আত্মপরিচয় প্রসঙ্গে

মাসুদ রানা

“রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য; (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য; (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য; কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন৷”ধারা ১৭, দ্বিতীয় বিভাগ-রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাস থেকেই একটি অভিন্ন ন্যাশনাল কারিক্যুলামের অধীনে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আনা উচিত ছিলো। তা করলে, আজকের.৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৫০ বছর বয়েসীরা পর্যন্ত এক অভিন্ন শিক্ষার আলোকে আলোকিত হতেন।

হাটহাজারি মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম। ছবিঃ গেটিইমেজডটকম

একটি আধুনিক জাতি গঠনের জন্যে অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু প্রয়োজনীয় নয়, অত্যাবশ্যকীয় বটে। এটি ছাড়া একটি জাতি অভিন্ন আত্মপরিচয় নিয়ে গড়ে উঠতে পারে না।

দুর্ভাগ্যবশতঃ বাংলাদেশে পৃথক তিনটি ভাষাকে পাঠের প্রধান (একমাত্র না হলেও) মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে অন্ততঃ তিন প্রকারের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। আর, প্রতিটি শিক্ষাব্যবস্থারই রয়েছে নিজস্ব কারিক্যুলাম।

ফলে, অভিন্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে অভিন্ন বাঙালী জাতির মধ্যে তিন প্রকারের ভিন্ন বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন মানুষ তৈরি হচ্ছে। বলাই বাহুল্য, বোধের গভীরে তাদের আত্মপরিচয় বিভিন্ন হতে বাধ্য। নিচে আমি এর ওপর সংক্ষেপে আলোকপাত করছি।

(১) ইসলামিক শিক্ষাব্যবস্থাঃ সবচেয়ে প্রাচীন যে-শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত চালু আছে, তা হচ্ছে আরবি ভাষা ভিত্তিক ইসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাকে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাও বলা হয়। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা আছে অন্ততঃ দু’প্রকারের। একটি হচ্ছে কওমী মাদ্রাসা এবং অন্যটি আলিয়া মাদ্রাসা। এদের মধ্যে জন্মের ইতিহাস ও পঠন-পাঠনে বিভিন্ন পার্থক্য থাকলেও, উভয় শিক্ষাব্যবস্থাতেই মনে করা হয় যে, সকল জ্ঞানের উৎস হচ্ছে কুরআন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ও পবিত্রতম

একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ। ছবিঃ এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক-এর ওয়েবসাইট

ভাষা হচ্ছে আরবি, ইহজগতের চেয়ে পরকাল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের জাতিগত আত্মপরিচয় হচ্ছে মুসলমান।

(২) আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাঃ ইহজগতকে প্রাধান্য দিয়ে এবং এই ইহজগতে উন্নতি কল্পে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানকে জ্ঞানের উৎস মনে করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল

থেকে গড়ে ওঠে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার প্রধানতম মাধ্যম বাংলা হলেও, ইংরেজি ভাষাকে উচ্চতর মর্য্যাদা দিয়ে শেখানো হয়। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় দেশপ্রেম ও বাঙালী আত্মপরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ধর্মকে নৈতিকতার উৎস মনে করা হয় বলে ধর্মশিক্ষাকে একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে শিক্ষা দেওয়া হয়। এই শিক্ষা অনিবার্যভাবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়ে বাঙালী জাতি গঠন ও জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে।

(৩) বিদেশী শিক্ষাব্যবস্থাঃ এই শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার অনুরূপ হলেও এর মাধ্যম হচ্ছে ইংরেজি এবং পাঠ্যক্রম প্রধানতঃ ব্রিটিশ ন্যাশনাল কারিক্যুলাম বা ব্রিটেইনের আন্তর্জাতিক কারিক্যুলামের অনুসারী। ব্রিটিশ কারিক্যুলাম ছাড়াও অন্যান্য দেশের কারিক্যুলামেও শিক্ষা দেওয়া হয়। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষাকে শ্রেষ্ঠতম ভাষা হিসেবে শেখানো হয় এবং ‘বিশ্বে কোনো মূল্য নেই’ যুক্তিতে বাংলাভাষাকে অগুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে অব্যবহারযোগ্য মনে করা হয়। এই ব্যবস্থায় আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয়তা কিংবা জাতীয়তার প্রতি আকর্ষণ ও বিকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক এলিটিজম লক্ষ করা যায়।

রিজেন্ট কলেজ, ঢাকা। (ইংরেজি মাধ্যম এ লেভেল কলেজ)

চিন্তাশীল মানুষ মাত্রেরই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, বাংলাদেশে এই তিন প্রকারের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন তিন প্রকারের বিশ্ববোধ সম্পন্ন এবং ভিন্ন তিন প্রকারের আত্মপরিচয় বোধের নাগরিক তৈরি করছে। ফলে, জগত-জীবন ও দেশ-জাতি-রাজনীতি সংক্রান্ত প্রায় সকল বাংলাদেশে এই তিন প্রকারের শিক্ষাসম্পন্ন মানুষ তিন ধরনের অবস্থান গ্রহণ করে থাকেন, যাদেরকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে নিয়ে আসা সত্যিই কঠিন।

যারা আধুনিক জাতি গঠনে ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যাগী হন, তাঁদেরকে এই বিষয়গুলোতে নজর দিতেই হয়। কিন্তু আমি এ-কথা বলতে মোটেও দ্বিধান্বিত ও সঙ্কুচিত নই যে, বাঙালী জাতি গঠন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টায় উদ্যোগী রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীগণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই ব্যর্থতার জন্যে আমি তাঁদের মনোবৃত্তিক ক্ষুদ্রতা্র চেয়ে বরং বুদ্ধিবৃত্তিক দারিদ্র্যকেই দায়ী করবো।

আজ বাংলাদেশে আমরা যে মৌলিক প্রকারের অনৈক্য ও অসংহতি এবং এর হিংসাত্মক প্রকাশ লক্ষ করছি, তার মূলে আছে পরস্পর বিরোধী এই তিন প্রকারের শিক্ষাব্যবস্থা। আর, এ-ব্যবস্থা যদি কোনো ইণ্টারভেনশন ছাড়া চলতে থাকে, এই জাতি ও রাষ্ট্রে অস্তিত্বই ঝুঁকিতে পড়বে।

আমি মনে করি, এখনও খুব দেরি হয়ে যায়নি। এখনও সময় আছে নবতর প্রজন্মকে একটি অভিন্ন ন্যাশনাল কারিক্যুলামের অধীনে এনে শিক্ষিত করে তোলার। কিন্তু তার জন্যে প্রয়োজন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, যা হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঘোষিত প্রতিশ্রুতির পরিপূরক রাষ্ট্র ও নাগরিক গড়ে তোলার উপযুক্ত সামাজিক প্রকৌশলের পরিকল্পনা।

০৭/০১/২০১৭
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

Related Posts

About The Author

One Response

Add Comment

Leave a Reply to Mahbubul Haque Cancel reply