বাংলাদেশে পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালের ভূমিকা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা বলপূর্বক বা নির্বাচনের মাধ্যমে যারাই অধিকার করেছেন তারা পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালদের সম্মান ও মূল্য কোনটাই দেন নি। অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে অধিকাংশ রাজনীতিবিদ মিলে ভিসন(Vision) হিন এক জনসমষ্টি তৈরি করেছেন মাত্র। এরা হয় রাষ্ট্র কে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সীমান্তে বাঁধতে চায় অথবা চরম সঙ্কীর্ণ সেকুলারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। উভয়েরই সীমাবদ্ধতা আছে। সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে উভয়কে বিচার করা জরুরি। এমন অবস্থায় সমাধান হতে পারে মধ্যমপন্থা ও সহনশীলতা। যার কার্যকর চর্চা করতে পারেন পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালরা। কিন্তু আগেই বলেছি আমাদের সিস্টেম এ পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল স্বাগত নয়, কারন এখানে মধ্যমপন্থা ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি অবাঞ্ছিত। এই অবস্থায় আমাদের পাবলিক স্ফেয়ারে পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালদের সরব উপস্থিতি নেই। তাই বলা যায় যখন সিস্টেমের ভেতরে জনগনের বিষয়ে মতামত ও একাডেমিক বিশ্লেষণ দেয়ার ও গ্রহন করার যথেষ্ট যায়গা না থাকে তখন বুঝতে হবে সেই সিস্টেম স্বাস্থ্যকর নয়। সেখানে গলদ আছে। আর গলদ সিস্টেম এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালের কর্তব্য।

আমরা যদি গত চার দশকের দিকে তাকাই তবে দেখবো অবস্থার ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটেছে। শুরুর দশকগুলোতে হতাশা ছিল, কিন্তু একি সাথে আলোচনার সুযোগও ছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রবণতা ছিল। সমাজের উপর রাষ্ট্রের পেশিশক্তি খাটানোর যে প্রবণতা তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করার মতন একটি ইনটেলেকচ্যুয়াল ভিত্তি ছিল। কিন্তু ৯০’র দশকের পরে পরিবর্তন হয়েছে দ্রুত। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের রেওয়াজ চালু হয়েছে সত্যি, তবে সমাজের যে অংশ সিস্টেমের বিরুদ্ধে অধিকার রক্ষার নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করত তা ধিরে ধিরে হয় ক্ষমতার অংশ হয়েছে অথবা marginalize হয়েছে।

নিও লিবেরাল ব্যবস্থা কার্যকর ভাবে রাষ্ট্র কাঠামোর চরিত্র পরিবর্তন করে দিয়েছে। উন্নয়নের মন্ত্র দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশ কে মুগ্ধ করেছে । এখন সবখানে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা আশানুরূপ ভাবে কমে নি। সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় নি। সামাজিক ন্যায় বিচার অনুপস্থিত, মাফিয়ারা এখন সিস্টেমের বাইরে নয় বরং সিস্টেমের অংশ হয়েছে। সমাজ এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সেই ভয়ের উৎস যেমন ধর্মীয় উগ্রতা তেমনি রাজনৈতিক আদর্শগত কট্টরপন্থা। জনগনের ভোট দেয়ার যে সামান্য গণতান্ত্রিক অধিকার বাকি ছিল তাও বারে বারে লঙ্ঘিত হয়েছে ও হচ্ছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা ধারাবাহিক ভাবে নিপীড়নের স্বীকার, রাষ্ট্র তাদের নাগরিক মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পরও অর্থনীতি ও রাজনীতির মন্দিরে পুরোহিতের মতন রাজনীতিবিদ, সমাজবিদ, অর্থনীতিবিদ মিলে উন্নয়ন মন্ত্র জপ করছেন। এই অবস্থায় যখন রাষ্ট্র ও নাগরিকের অধিকার পুনবিবেচনার জন্য পাবলিক বিতর্ক শুরু হওয়া উচিৎ তাতে পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালের ভূমিকা অবশ্যই সামনে আসতে হবে। কিন্তু আমরা তা দেখছি না। নাগরিক অধিকার রক্ষা, মানবিধাকার রক্ষা, সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা ও সুবিধাবঞ্চিতদের রক্ষায় সামাজিক পেশি হিসেবে পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলে কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। কারন কল্যাণ রাষ্ট্র চেয়ে পাওয়া যায় না অথবা রাষ্ট্র আপনা থেকেই কল্যাণমূলক হয় না, তাকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে হয় নাগরিক সচেতনতা প্রসার ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে।

এখন পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্র চলছে কলনিয়াল আইন দিয়ে। প্রকৃতিগত ভাবেই এই আইন অগণতান্ত্রিক(Thapar 2015)। এই আইন বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তি আরও জোরদার হয়েছে। যারা প্রশ্ন করতে সক্ষম তাদের এই আইন অথবা উন্নয়নের মন্ত্রের জোরে স্তব্ধ করে দেয়ার প্রসেস তৈরি করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে আমরা প্রশ্ন করতেই পারি, কোন স্বপ্নে স্বাধীনতা চেয়েছিলাম আর কোন মন্ত্রে এখন আমরা মুগ্ধ হচ্ছি।

আমার আর্গুমেন্ট এই নয় যে বাংলাদেশে পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল নেই, অবশ্যই আছে, তবে তারা পর্দার আড়ালে ব্যক্তিগত সেন্সরশিপের ভেতরে থাকছেন। একি সাথে আমাদের সমাজে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ জনসমষ্টির (critical mass) অভাব রয়েছে। কারন পাবলিক বিতর্কে এই উভয় দলের উপস্থিতি জরুরি। তাহলে কি আমরা এমন সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে (critical mass)এর অভাবেই পাবলিক স্কলাররা সেলফ সেন্সরশিপ এ আছেন?

সত্যি বলতে কি, স্বাধীনতার সময় ও তার পরে বর্তমানের তুলনায় আমাদের একটি উদার সমাজ ছিল। কিন্তু বর্তমান সমাজ এবং সময় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শবাদের ফ্রেমে বন্দী হয়েছে। বিগত সালগুলোতে আমরা দেখেছি ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক আদর্শের উপর ভিত্তি করে কট্টর পন্থার উত্থান ঘটেছে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠন যখন রাষ্ট্র ও সমাজকে চাপে ফেলে স্বার্থ সিদ্ধি করতে চায় এবং তার কাজের বৈধতা হিসেবে ধর্মীয় বিশ্বাস বা রাজনৈতিক আদর্শ কে অজুহাত দেয় তখন তা একধরনের সন্ত্রাস।(Thapar 2015)এই সন্ত্রেসের পরিবেশে তাই পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালদের অবদান আলোচনা করা সময়ের প্রয়োজন।

এই প্রবন্ধে আমি মূলত তিনটা প্রশ্ন আলোচনা করবো। পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল বলতে কি বোঝায় ও কারা পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল। কিভাবে ইউরোপে এর উত্থান ঘটলো? এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল এর কি ভূমিকা ছিল এবং আছে? মুলত নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের ছকে আমি আমার নেরেটিভ উপস্থাপন করবো যা আমাদের বৃহত্তর পরিসরে পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বুঝতে সাহায্য করবে।

পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল:

পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল টার্ম দিয়ে আমি কি বোঝাচ্ছি তা পরিস্কার করা জরুরি। এবং এর সমর্থনে আমি কিছু মানুষের চিন্তা ও অবদানের উধারন টানবো।পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল এর ধারনা দার্শনিকের ধারনা থেকে খানিকটা আলাদা। উনিশ সতকে পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালরা একটা শ্রেণী হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই স্বীকৃতির সাথে Alfred Dreyfus এর ঘটনা জড়িত। ইনি ছিলেন ফরাসি সেনাবাহিনীর এক ইহুদী সদস্য, যাকে জার্মান সেনাদের কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগে শাস্তি দেয়া হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এমিলি জোলা এই শাস্তির প্রতিবাদে লেখা শুরু করেন। তিনি একি সাথে বহুসংখ্যক আর্টিস্ট, লেখক, একাডেমিক এর সমর্থন পান। এরা অভিযোগ করে এই শাস্তি ইহুদী বিদ্বেষ থেকে দেয়া যাতে মুল ভূমিকা ছিল সেনা প্রধান ও তার সমর্থক রাজনীতিবিদদের। যারা প্রতিবাদ করেছিল তাদের একসাথে ইনটেলেকচ্যুয়াল বলা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি অভিযুক্তকে মুক্তি দেয়। কিন্তু এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ইনটেলেকচ্যুয়াল টার্মটি বৃহত্তর পরিসরে ব্যবহৃত হয়। (Thapar 2015:05)

 

ইনটেলেকচ্যুয়াল হতে হলে ব্যক্তিকে পণ্ডিত হতে হবে এমন নয়। বরং যে কেউ হতে পারে। এমন কেউ যিনি তার পেশায় প্রতিষ্ঠিত এবং তিনি সিস্টেম এর কাছে কৈফিয়ত দাবি করেন। প্রয়োজনে তিনি সিস্টেমের সমালোচনা করেন।তিনি প্রতিষ্ঠিত অর্থোডক্স এর সামনে দাড়িয়ে তাকে প্রশ্ন করেন, আমাদের জানা জগত সম্পর্কে ভিন্ন একটা নেরেটিভ দেয়ার চেষ্টা করেন।এবং তাদের কাজ তখনই সহজ হয় যখন সমাজে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির একটা ঐতিহ্য থাকে।

যাই হোক আমি আমার এই প্রবন্ধের প্রথম অংশে ইউরোপিয়ান পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল এর উদাহরণ আলোচনা করবো তার সাথে বাংলাদেশেরও। আমি জানি তাদের মধ্যে সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই তবে এই উদাহরণ আমাদের পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল এর কাজের ধরন ও সমাজে তাদের ভূমিকা বুঝতে সাহায্য করবে। লক্ষণীয় বিষয় হল যাদের কথা আমি বলছি তাদের অনেকেই আমাদের দৃষ্টিতে সরাসরি পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল না হলেও তাদের সময়ের প্রেক্ষিতে তাদের কাজ, কথা ও লেখা পাবলিক স্কলার হিসেবে তাদের অবদানের প্রমান।এবং আমি যাদের উধারন টানছি তাদের কাজ আমাদের বর্তমান প্রশ্ন করার অধিকারকে বৈধতা দেয়।

ইউরোপ প্রেক্ষিতঃ

ইউরোপের পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালরা শুধু মাত্র দর্শনের ক্ষেত্রেই প্রশ্ন করেননি বরং পলিটিকাল স্ফেয়ারে ও প্রশ্ন করেছেন।এরা আথরিটির কে প্রশ্ন করা ও সমালোচনা করাকে নিজেদের অধিকার হিসেবে দাবি করেছেন। এতে কিন্তু কম ভোগান্তির স্বীকার হন নি তারা।(Thapar 2015:6)যেমন সক্রেতিস করেছিলেন। তিনি এথেনিয়ান গ্রিসের সিস্টেম ও বিচার পদ্ধতির সমালোচনা করেছিলেন। এথেন্স তাকে বিষ পানে বাধ্য করে।

অথবা রোমান আইনবিদ সিসেরো এর কথাই ধরা যাক। তিনি রোমান গভর্নরদের দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ করেন। তিনি তার আইনি মেধা দিয়ে বিধিবদ্ধ করেন যে, যে ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা দরকার সে ক্ষেত্রেই প্রশ্ন করা ব্যক্তির অধিকার।

মধ্যযুগের ইউরোপের কথাই ধরি। সেই সময়ে ক্যাথলিক চার্চ রাজার ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ইনটেলেকচ্যুয়ালদের প্রশ্ন ইউরোপকে এনলাইটেনমেন্ট এর জগতের দিকে নিয়ে চলে।  জন লক, হিউম, ভলতেয়ার, মতেস্কু, জ্যাক রুশো এবং আরও অনেকেই তৎকালের প্রচলিত জ্ঞান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন করেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের চার্চের মোরাল অথরিটি থেকে মুক্ত করেন। আমরা যাদের বর্তমান কালের সিভিল সোসাইটি বলছি তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন এরা। প্রশ্ন ও মোরাল অথরিটি প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে সেকুলার প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ঘটে যার অনেকগুলোই রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত।

এই ধরনের চিন্তার উপকারিতা হল এটা এক ধরনের প্রথা প্রতিষ্ঠা করে। এই প্রথা আমাদের জানা জগতের সম্পর্কে নতুন বিশ্লেষণের পথ বলে দেয়। এই চিন্তা বলে দেয় সমাজ বা রাষ্ট্র কোন বদ্ধ ও গাণিতিক প্রতিষ্ঠান নয়। এই ভাবনার পথ ধরেই মডার্নিটির উত্থান ঘটে। পরবর্তীতে তা কলনিয়াল শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে কলোনিগুলোতে আসে। আমরা লক্ষ করি কলনিতে এর পক্ষে ও বিরুদ্ধের পতিক্রিয়া। সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কলোনির চিন্তকরা এর কিছু অংশ আত্তীকরণ করেন আর কিছু দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যানও করেন। গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের এই দুই প্রক্রিয়া পোস্ট কলনিয়াল জাতি রাষ্ট্রে এখনো চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতঃ

বাংলাদেশ ভূখণ্ডে কলনিয়াল মডার্নিটি গ্রহণ ও বর্জনের দ্বিমুখী প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। তা সহজে বোঝার জন্য আমরা বাংলাদেশর পলিটিকাল ডিসকোর্সকে ৪৭ পূর্ববর্তীও পরবর্তী এবং ৭১ পরবর্তী সময়ে ভাগ করতে পারি। এই সময়ে রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় ধারাবাহিক ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিবর্তন ঘটেছে। ৪৭ পূর্ববর্তী সময় থেকেই বাংলাদেশ ভূখণ্ড অংশে সেকুলার ডিসকোর্স বিকাশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই সময়ে রাজনীতিতে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ থেকে সেকুলার জাতীয়তাবাদে মোড় নেয়ার লক্ষণ স্পষ্ট হতে থাকে।এবং এই ডিসকোর্স বিকাসে পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালদের ভূমিকা গভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়। কয়েকটি গ্রুপ এতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। যেমন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, New Value Group, National Association for Social and Economic Progress ইত্যাদি। এই আন্দোলন ও দলের সদস্যরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন modernity এর হাত ধরেই আসা উদারনীতি, সমাজতন্ত্র, এবং রবীন্দ্রনাথের ইউনিভারসাল হিউমেনিজম থেকে।

১৯২০ সালের “শিখা” পত্রিকার উদাহরণ দেয়া যায়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কাজী আব্দুল অদুদ যিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ইউনিভারসারল হিউমেনিজম দিয়ে। এবং তার পত্রিকার মূল স্লোগান ছিল “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ঠ, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’ Where knowledge is restricted, there the intellect is inert, there freedom is impossible.”(HASAN ২০১৫)।৪৭ পরবর্তী সময়ে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মিলে New Value Group প্রতিষ্ঠা করেন। তারা পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা করেন ও একি সাথে সিস্টেম কে প্রশ্ন করতে থাকেন।(Murshid: 1997:9)(Hossain 2013)

ডক্টর কামাল হোসেন, ডক্টর আনিসুজ্জামান এই দলের সদস্য ছিলেন। এরা পুরনো সিস্টেমের পরিবর্তনের কথা বলেন যা ছিল মুলত কতৃত্ববাদী, কলনিয়াল দৃষ্টিভঙ্গির এবং ফিউডাল সিস্টেম নির্ভর (Hossain2013:০6)। এরা ইংরেজি ভাষায় পত্রিকা প্রকাশ করত, যার নাম ছিল New Values যাতে রবীন্দ্রনাথের ইউনিভারসাল হিউমেনিজম, উদারনীতি ও গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রভাব ছিল।(HASAN ২০১৫)

১৯৬০ সালের দিকে অপর একটি দল National Association for Social and Economic Progress নামে নিজেদের পরিচয় দিত। এই দলটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ৬ দফা প্রণয়নে সরাসরি সাহায্য করেন। এই গ্রুপের সদস্য ছিলেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরুদ্দিন উমর এবং ডক্টর কামাল হোসেন।(Hossain 2013:24-25)

এই প্রেক্ষিতে আমরা যদি সঙ্কীর্ণ জাতীয় ন্যারেটিভস্ এর বাইরে এসে এই ফোরাম ও তাদের সদস্যদের কার্যক্রম কে বৃহত্তর পরিসরে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের বিতর্কের ছকে দেখি তবে দেখব তারা সিস্টেম কে প্রশ্ন করেছেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনে ভূমিকা রেখেছেন। যার ফলে তাদের রাষ্ট্র শক্তির নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কোথাই ধরা যাক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন, ৫০’র দশকে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এ অধ্যাপক হ্যরলড্ লাস্কি এর অধিনে পিএইচডি গবেষণায় ৫ বছর কাটিয়েছেন। দেশে ফিরে এসে তিনি সেই সময়ের পলিটিকাল স্ফেয়ার কে সরাসরি প্রভাবিত করেছেন। তার এই ভুমিকার কারনে তাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম দার্শনিক প্রবক্তা বলা হয়ে থাকে। তার নিকটতম ডক্টর কামাল হোসেন স্বাধীনতা পরবর্তী সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন করেন। যাই হোক, অধ্যাপক রাজ্জাক পাকিস্তান আমলে আইউব বিরোধী আন্দোলনে এততাই প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন যে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার তাকে বিপদজনক মনে করে চাকুরী কেড়ে ন্যায়। অভিযোগ ছিল শিক্ষকতায় অমনোযোগিতা। পরে আদালতে সেই অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তিনি চাকুরী ফিরে পান। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে ৭১ সালে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকার কারনে তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।(MahmuduzzamanN.D)

যদি আমরা অধ্যাপক রাজ্জাক কে শুধুমাত্র একজন বাঙ্গালী হিসেবে দেখি যে পাকিস্থানিদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করছিলো তা হলে তা হবে আমাদের জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণ নেরেটিভ। কিন্তু যদি আমরা তার ভূমিকাকে নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পকের টানাপোড়নের বৃহত্তর পরিসরে ফেলি তবে দেখব আব্দুর রাজ্জাক অত্যন্ত সফল ভাবে একজন পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়ালের ভূমিকা পালন করেছেন।

যদি আমরা তাকে সমালোচনা মূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখি তবে বলতেই হয় তিনি অবশ্যই কোন মৌলিক চিন্তক ছিলেন না। কয়েকটি প্রবন্ধ ও বক্তৃতা দিয়ে অন্তত এইটা প্রমান করা যায় না যে তিনি মৌলিক চিন্তক ছিলেন। এর অর্থ এই নয় যে আমি তার জ্ঞান কে অস্বীকার করছি। তিনি অবশ্যই জ্ঞানী ছিলেন, তা তার ছাত্রদের লেখনিতেই বলা হয়েছে। আমরা তার সম্পর্কে খানিকটা বিস্তারিত জানতে পারি তার ছাত্র ও বাংলাদেশের প্রভাবশালী প্রবন্ধ লেখক আহমদ ছফার লেখা বই “যদ্যপি আমার গুরু” থেকে। অধ্যাপক রাজ্জাকের সাথে আহমদ ছফার কথোপকথন থেকে কয়েকটি বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট হয় যে তিনি তার শিক্ষক লাস্কির প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছেন এবং তার আদর্শিক বিশ্বাস ছিল সমাজতন্ত্র, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র।(Sofa 2010:39,52,56,78)

আমি অধ্যাপক রাজ্জাককে বৃহত্তর পরিসরে ভাবার কথা বলছি তার কারন এখন স্পষ্ট করা যাক। মনে রাখতে হবে অধ্যাপক রাজ্জাক ১৯৪৭ এ পাকিস্তান আন্দোলনের সময় অন্য আরও অনেকের মতন এর সমর্থক ছিলেন, ঠিক যুবক শেখ মুজিব যেমন এই আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। সেটাই তখনকার বাস্তবতা ছিল। কিন্তু আন্দোলনের সমর্থন মানেই যে রাষ্ট্রকে বিনা প্রশ্নে তার ক্ষমতা ব্যবহার করতে দিতে হবে এমন তো নয়, তাই না? তাই পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল হিসেবে অধ্যাপক রাজ্জাক এবং রাজনীতিবিদ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সিস্টেম কে প্রশ্ন করেছেন। পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন, যার ফলে আন্দোলন তৈরি হয়েছে। মুভমেন্ট স্ফেয়ার এ পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল এর মতামত এবং রাজনৈতিক পদক্ষেপ একসাথে সম্পর্কযুক্ত হতে পেরেছে বলেই আগ্রাসী সিস্টেম ভেঙ্গে সেই সময় নতুন দেশ ও সিস্টেম হিসেবে বাংলাদেশ এর উত্থান ঘটেছে। এই উত্থান ও পতন এক চলমান পক্রিয়া।

আমি আমার প্রবন্ধ শেষ করছি ১৪ ডিসেম্বর এর উদাহরণ টেনে। ১৯৭১ এর ঐ সময় আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ যখন শেষের পথে তখন পাকিস্তান সেনা ও তাদের দেশীয় বাঙ্গালী সমর্থকরা যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে (Bose2005) তা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল এর প্রতি সিস্টেম এর ক্ষোভ। কারন পাবলিক ইনটেলেকচ্যুয়াল সিস্টেম ও পাবলিক এর মধ্যের নিরাপত্তা স্তর হিসেবে কাজ করে যে একি সাথে সিস্টেম কে সমালোচনা ও প্রশ্নের মুখোমুখি করে ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করে। তার এই উভয়মুখী ভূমিকা একটি আদর্শ সমাজ ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে।

Speak, this brief time is ample

Before the dying of body and tongue

Speak for truth still lives,

Speak, to say what needs to be said

“Bol”, Faiz Ahmed Faiz.

লেখক : আসিফ বিন আলী, সমাজবিজ্ঞান, এম এ শিক্ষার্থী,

সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়া দিল্লি, ইন্ডিয়া

 

 

তথ্যসুত্রঃ

 

লেকচার ভিডিও :

Related Posts

About The Author

Add Comment