বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশনাঃ কিছু পর্যবেক্ষণ

একজন তরুণ গবেষক হিসেবে আমি যে কোন বই হাতে নিলে প্রথমেই চেষ্টা করি সেই বইয়ের প্রকাশকাল দেখতে এবং গবেষণাধর্মী বই হলে তার টীকা টিপ্পনীসহ গ্রন্থপুঞ্জি ও নির্ঘণ্টও খেয়াল করি। তো এতোদিনের অভিজ্ঞতায় একটা কথা আমার মনে পোক্ত হয়েছে আর তা হল আমরা বাংলাদেশীরা হয় গবেষণা করতে পারি না আর নয়তো কোন গবেষণা গ্রন্থ সুচারুরূপে প্রকাশ করতে পারি না। একটি গবেষণাগ্রন্থের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ঘণ্ট, তথ্যসূত্র বা গ্রন্থপুঞ্জি, প্রকাশকাল আর প্রভৃতি বিষয়ে বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থা কিংবা গবেষকদের যারপরনাই গাফিলতি আমাকে অতিশয় বিস্মিত করে। 

নির্ঘণ্ট প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের গবেষকদের গবেষণাকর্মের প্রতি আন্তরিকতা কিংবা তাদের মেধা বিষয়ে আমার কোন অভিমত নেই, তবে তারা যে শেষ মুহূর্তের কুঁড়েমিতে তাঁদের অনেক সেরা কাজকেও সাধারণ মানে নামিয়ে আনেন তা কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যায়। এর কারণ তাঁরা একটি বইয়ের পিছনে যতটা সময় ব্যয় করেন, তার থেকে অল্প কিছু বেশি সময় ব্যয় করে  বইয়ের নির্ঘণ্ট তৈরির খাটুনি করতে অনিচ্ছুক বা অপারগ। এই বিষয়টির প্রতিফলন আমরা যেকোন বই হাতে নিলেই দেখতে পাই। ফলশ্রুতিতে মনে হয় গবেষক হিসেবেও তাদের আন্তরিকতা এবং গবেষণার বিষয়ের প্রতি তাদের শ্রদ্ধার অভাব রয়েছে। আয়েশ তাদের আরাধ্য আর আয়াসে তাদের বৈরাগ্য; অবশ্য এ কথা মনে হয় সমগ্র বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাগুলো (যেমন পেঙ্গুইন, ম্যাকমিলান, ফেবার এন্ড ফেবার, ভিন্টেজ, রিউটলেজ ইত্যাদি) থেকে প্রকাশিত কোন গবেষণাধর্মী বইয়ের কথা আমার মনে পড়ে না, যেখানে বইয়ের শেষে নির্ঘণ্ট নাই। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য নির্ঘণ্টের না থাকাই বাংলাদেশে প্রথা। একবার বাংলা একাডেমী থেকে ফোকলোরের ওপর প্রায় হাজার পৃষ্ঠার একটা বই আমি  কিনেছিলাম, তো লালন ভক্ত হিসেবে বই নিয়ে সবার আগে নির্ঘণ্টে লালনকে খুজতে গিয়ে দেখি বইয়ে নির্ঘণ্টই নেই। এখন ধরেন আমার শুধু লালনেই আগ্রহ, বা শুধু লালনই প্রয়োজন; তাহলে কি এই সামান্য আগ্রহ বা সামান্য প্রয়োজনের খাতিরে সম্পূর্ণ বইই অধ্যয়ন করতে হবে? অথচ যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত সামান্য চটি সাইজের বইয়েও নির্ঘণ্ট পাওয়া যায়। নির্ঘণ্টের সুবিধা বলতে আমি বুঝি, ধরুন, আপনি সাহিত্যের ছাত্র, রাজনীতিতে আপনার মন নাই, তবুও আপনি জানতে চান নজরুল ইসলাম বা রবি ঠাকুর সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর অভিমত কি, তবে আপনি তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর নির্ঘণ্টে চলে যান, মুহূর্তেই পেয়ে যাবেন।

আবুল মনসুর আহমেদের আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বইয়ে একটা সযত্নে তৈরিকৃত নির্ঘণ্ট আছে (সযত্নে তৈরি বললাম এ জন্য যে তিনি নির্ঘণ্টকে “ইংগিত” লিখেছিলেন)। তবে আজ তিনি পরলোকগত বলেই হয়তো খোশরোজ কিতাব মহল থেকে প্রকাশিত সংস্করণে বইটার আদি প্রকাশকাল নাই।

তথ্যসূত্র বা গ্রন্থপুঞ্জি প্রসঙ্গ

একটি গবেষণাধর্মী বইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করে বইয়ে উল্লেখিত তথ্যের যাচাই যোগ্যতার ওপর। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে এমন অনেক মননশীল তথা গবেষণাধর্মী বই দেখা যায় যাতে লেখক তথ্যসূত্র বা গ্রন্থপুঞ্জি উল্লেখের প্রয়োজন মনে করে না। যেমন কয়েকদিন আগে দীপ্র পাবলিকেশন প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রাচীন কীর্তিঃ ১ম খন্ড (হিন্দু ও বৌদ্ধ যুগ) নামে একটি ইতিহাস বই দেখলাম যাতে কোন তথ্যসূত্র বা গ্রন্থপুঞ্জি দেয়া নাই। তো এখন কেউ যদি দাবি করে আসলে বইয়ে উল্লেখিত তথ্যাদি আসলে সমস্তটাই লেখকের কল্পনাপ্রসূত তখন লেখকের কি বলার কিছু থাকবে? পাশ্চাত্যে দেখা যায় কোন বিষয়ে সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞ ওই বিষয়ে কোন লেখা লিখলে তথ্যসূত্র উল্লেখের কথা ভোলে না; অথচ বাংলাদেশে মহারথী থেকে চুনোপুঁটি এমন অনেক লেখক-ই আছেন যারা তথ্যসূত্র বা গ্রন্থপুঞ্জি উল্লেখের দায়বদ্ধতা স্বীকার করে না।

অনুবাদপুঁথি প্রসঙ্গ

বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত অনুবাদ বইয়ের কথা না বলাই ভালো। অনুবাদ প্রকাশের সময় মূল লেখকের অনুমতি নেয়ার ঘটনা খুবই বিরল, আর নিলে তার সদম্ভ প্রকাশ থাকে। সবচে’ অবাক লাগে যখন দেখি মূল বইয়ের আদি নাম (মানে যে ভাষায় লেখা বা আদি প্রকাশ, সে ভাষায় নাম), তার প্রকাশকাল বা প্রকাশকের উল্লেখ পর্যন্ত নাই। এখন আপনি যদি অনুবাদ পাঠ করে মূল বই চেখে দেখতে চান, এরা সহজে আপনাকে সেই সুযোগ দিতে চায় না। একজন লেখক কত কষ্ট করে বই লেখে অথচ (কার অবহেলায় জানি না) তা ট্রেস করা যায় না। উদাহরণ দেখতে চাইলে এই লেখাটির নিম্নাংশে চোখ বোলাতে পারেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত কাফকার দ্য মেটামরফোসিস-এর অনুবাদ হল রুপান্তর (কবির চৌধুরীর অনুবাদে)। কিন্তু কোন ভাষার কোন সংস্করণ থেকে তা উল্লেখ করা দূরে থাক, তার আদিপ্রকাশকালের উল্লেখ পর্যন্ত নাই। অথচ ভিন্তেজ বা পেঙ্গুইন থেকে কাফকার যে কোন বই হাতে নিন দেখতে পাবেন এর সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্যাদি। অনুবাদের সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য উল্লেখের ব্যাপারে চেক ভাষার ঔপন্যাসিক মিলান কুন্দেরাকে তো রীতিমত শুচিবায়ুগ্রস্ত বলা যায়। উনি উনার চেক ভাষা থেকে ফ্রেঞ্চ বা ইংরেজিতে অনূদিত বইগুলোতে মূল বইয়ের আদিপ্রকাশকালসহ যে ভাষা থেকে বইটি অনূদিত সে ভাষায় বইটির নাম এবং অন্যান্য সমস্ত আনুষঙ্গিক খুঁটিনাটি তথ্য অত্যন্ত যত্নসহকারে উল্লেখ করে থাকেন। অথচ বাংলা একাডেমীর মত দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান থেকে গত বছর প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ইংরেজি অনুবাদের এক বিশাল সংকলনে কোন ভাষণ কার দ্বারা অনূদিত তা একেবারেই উল্লেখ নেই। বিষয়টি রীতিমত বিষ্ময়কর এবং সম্পাদনার দৈন্যদশা উলঙ্গভাবে প্রকাশিত।

প্রকাশকাল প্রসঙ্গ

আমরা যে জাতি হিসেবে শিকড় তথা ইতিহাস অসচেতন, তা আমাদের প্রকাশনাগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়। বাংলাদেশের যে কোন প্রকাশনাসংস্থা থেকে প্রকাশিত বইয়ের “প্রকাশকাল” অংশ খেয়াল করলে দেখতে পাবেন ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্যের পুরানো বইগুলোর নতুন সংস্করণ প্রকাশকালে অধিকাংশেরই আদি প্রকাশকাল ও প্রকাশকের নাম নাই।(যারা বলবেন আদিপ্রকাশকাল ও প্রকাশকের নামের দরকার কি তাদের জন্যে বলিঃ এইসব তথ্য ব্যতিরেকে বইয়ের তর্কলোক বা বাকলোককে (discourse) ইতিহাসের সাথে সম্পর্কস্থাপন করতে বা তার সহাবস্থানে পাঠ করতে আমার মতো পাঠকের পেরেশান লাগে।) অথচ বিশ্বভারতী, আনন্দ বা পেঙ্গুইন ইত্যাদি থেকে প্রকাশিত যে কোন বই নিয়ে দেখেন যতবার প্রকাশিত হয়েছে ততবারের সনসহ উল্লেখ থাকে। দে’জ থেকে প্রকাশিত শংকরের অনেক বইয়ে কয়েক পৃষ্ঠা ধরে শুধু মুদ্রণ-পুনর্মুদ্রণ-এর সনের উল্লেখ পাবেন।

পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশনা প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের প্রকাশকেরা পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশকদের নিয়ে অনেক সময়ই ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই কারণে যে আমরা ওদের বই প্রচুর পরিমাণে আমদানি করি কিন্তু ওরা সে পরিমাণে আমদানি করে না। এমনকি বাংলাদেশে প্রকাশিত অনেক বইয়ের পশ্চিমবঙ্গ সংস্করণ বাংলাদেশে পাওয়া যায়; যেটা আপত্তিকর ও দৃষ্টিকুটি। এই আপত্তি সত্ত্বেও বলতে হচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশনায় উপর্যুক্ত দোষত্রুটি তেমন পরিলক্ষনীয় নয়। একটা উদাহরণ দেই আমার কাছে পশ্চিম বঙ্গ থেকে প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ আছে এবং সেটার শেষে কবিতার নামসূচি ও প্রথম পংক্তিসূচি দেয়া আছে। কয়েকদিন আগে দেখলাম নবযুগ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ওই বইয়ের বাংলাদেশী সংস্করণ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু শেষের কবিতার নামসূচি ও প্রথম পংক্তিসূচি বাদ দিয়ে। তিনশ বা চারশ টাকা দামের একটা বইয়ে এইভাবে কবিতার নামসূচি ও প্রথম পংক্তিসূচি, নির্ঘণ্ট বাদ দেয়ার কিংবা না থাকার মানে খুজে পাওয়া যায় না।

এভাবেই বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থাগুলো থেকে প্রকাশিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা পেতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রকাশপদ্ধতির আর্ন্তজাতিক মান যথাযথভাবে বজায় না রাখার জন্য। এই দিকগুলোতে আগামীতে বাংলাদেশের প্রকাশকরা এবং সংশ্লিষ্ট বইয়ের গবেষকরা যদি নজর দেন এবং পুরো গবেষণাকার্যে ব্যয়িত সময়ের কিয়দাংশ বেশি ব্যয় করে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকাশনা তৈরি করেন তবে তাদের প্রকাশনাসমূহ আরো বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।

বি.দ্র. এই নোটটা লেখার সময় আমার সিদ্ধান্তসম্পর্কে নিশ্চিত হতে আমি শ’ কয়েক বই ঘেঁটে দেখছি, শুধু প্রথমা ও ইউপিএল-এর (এদেরও সব বই ত্রুটিমুক্ত নয়) কয়েকটা বই ছাড়া আমার এই নোটের কথা সব বই-এর ক্ষেত্রে খাটে। নিচে কয়েকটার নাম দিলাম।

নির্ঘণ্টহীন/”আদিপ্রকাশকাল ও প্রকাশকের উল্লেখ নাই এমন” কয়েকটা বইয়ের উদাহরণঃ

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের মান কী রকম তা উপর্যুক্ত তালিকায় স্পষ্ট

 

একটি সুচারুপ্রকাশনার নমুনা

অনন্য জীবনানন্দ

মুলঃ এ পোয়েট অ্যাপার্ট এ লিটেরারি বায়োগ্রাফি অফ দ্য বেঙ্গলি পোয়েট জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)

অনুবাদঃ ফারুক মঈনুদ্দিন

প্রথম প্রকাশকালঃ ইউনিভার্সিটি অফ ডেলওয়ার প্রেস, নেওয়ার্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ডিসেম্বর, ১৯৯০

দ্বিতীয় মুদ্রণঃ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ভারত, মে ১৯৯৯

(রবীন্দ্রভারতীর মূল বইয়ে “ইউনিভার্সিটি অফ ডেলওয়ার প্রেস, নেওয়ার্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ডিসেম্বর, ১৯৯০” এই তথ্যের উল্লেখ নাই)

*প্রবন্ধটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা অনুপ্রাণন-এর মে-জুলাই ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

এস এম মনিরুজ্জামান

প্রভাষক, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

Related Posts

About The Author

Add Comment