বাংলাদেশ: স্টেট অফ দ্য নেশন

বই: বাংলাদেশ: স্টেট অফ দ্য নেশন

লেখক: আবদুর রাজ্জাক

জ্ঞান তাপস অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন নিভৃতচারী জ্ঞান সাধক । জ্ঞানকে বইয়ের পাতায় লিপিবদ্ধ করার কোন প্রয়াস দেখাননি । খুব অল্প সংখ্যক লেখা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যান ।

১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী স্মারক বক্তৃতায় প্রথম বক্তা হিসেবে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশ: ষ্টেট অফ দি নেশন শিরোনামে বক্তৃতা প্রদান করেন । যেখানে তিনি বাংলাদেশের দেশ হয়ে ওঠা ও জাতির ধারণা এবং সমকালীন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন ।  যা পরে বাংলাদেশ: ষ্টেট অফ দি নেশন নামে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয় । সেমিনারের বিষয়বস্তু ছিল সরকার ও রাজনীতি ।

বক্তৃতাটি দুটি অংশে পাঠ করেন । প্রথম অংশ ছিল The nation: Identity and Ecology এবং দ্বিতীয় অংশটি ছিল The Nation : Population and Politics শিরোনামে ।

বক্তৃতার প্রথমভাগে জন্মের বাংলাদেশের সমস্যা, দেশ সৃষ্টির পটভূমি, জাতি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের অবস্থান, বঙ্গবন্ধু, জাতি গঠনে পকৃতির প্রভাব, নদী, দেশের অর্থনীতিতে সেচের অবদান নিয়ে দৃষ্টিপাত দিয়েছেন । বক্তৃতা শুরু করেন বাংলাদেশের জনসংখ্যা দিয়ে । যা ছিল এবং বর্তমানেও দেশের আয়তনের সাথে সামঞ্জস্যহীন । আশির দশকে বাংলাদেশ ছিল পৃথিবীর দরিদ্র দেশসমূহের অন্যতম । বিভিন্ন দেশ বাংলাদশকে ‘ আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি’ নামে ব্যঙ্গ করত । এই বিষয়টি বলতে গিয়ে চলে আসে ইংল্যান্ডের প্রতি উন্নত স্পেনের মামুলি দৃষ্টিভঙ্গি । পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ ও রাষ্ট্র অন্যান্য উদীয়মান দেশ ও জাতির প্রতি খুব একটা ভালো দৃষ্টি দেয় না ।

নতুন দেশে জাতির ভিত্তি ও এর দৃঢ়তা দেখাতে গিয়ে আলোচনায় নিয়ে আসেন ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ,৪৭ এর ভারত -পাকিস্তান সৃষ্টি, বাংলা ভাষা ।

বক্তার ভাষায় ‘ বাংলা জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশটি যদিও ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একলা পথ চলতে গররাজি ছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে নিজের মিলিত হওয়ার পক্ষে রায় দিল, তবে কিছু বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেই । তার এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ভাষা আন্দোলনের জন্ম দিলো যার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে জাতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশ’

বাংলাদেশের মানুষের  জাতি হয়ে ওঠার পেছনে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে তা হল অনমনীয় গর্ব, সুখ-দুঃখে আট কোটি মানুষের সঙ্গে একই পরিচয় বহন করা, অন্য কিছু নয়, শুধু বাঙালি হতে চাওয়ার জেদ । ঐতিহ্যের দিক থেকে জাতি হিসেবে আমরা খুব বেশি সমৃদ্ধ না হলেও জাতি হিসেবে পরিচয় দেয়ার ঐকান্তিক চেষ্টা রয়েছে ।

বাংলাদেশ, জাতি সত্তা, স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে গেলে যে নামাটি চলে আসে তা হল বঙ্গবন্ধু ।

বক্তার ভাষায় ‘ ঙ্গবন্ধুকে আমাদের যুগের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে । জাতির বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করতে, জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা বিচারে করতে, যে চালিকা শক্তি বঙ্গবন্ধুর মত ব্যক্তিত্বের পেছনে করেছে, তার গভীরে যাওয়া প্রাসঙ্গিক’।

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আরেকটি মন্তব্য করেন এভাবে , ‘দেশপ্রেমের সংজ্ঞাকে যতো ব্যাপক করে তোলা যাক না কেন, বঙ্গবন্ধু ততোখানিই দেশকে ভালোবাসতেন

পৃথিবীর যেকোন স্থানে অবস্থিত জাতির অবস্থা বিনির্মাণে প্রাকৃতিক বিষয়সমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । বাংলাদেশ এদিক থেকে সৌভাগ্যবান । নদীমাতৃক দেশ, উর্বর জমি পেয়েও বাবস্থাপনার দুর্বলতা ও দূরদর্শিতার অভাবে এর সুফল সামগ্রিকভাবে খুবই স্বল্প । সেচ ব্যবস্থা কৃষি ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়েও এই ভূমিতে অনেক আগে থেকেই অবহেলিত । রাষ্ট্র ব্যবস্থার দুর্বলতার ব্যবস্থার কিছু বিষয় বক্তৃতায় তুলে এনেছেন ।

বক্তৃতার দ্বিতীয় অংশে বলেন জনসংখ্যা ও রাজনীতি নিয়ে । পানি ও জমির পর জনসংখ্যাকে বাংলাদেশের তৃতীয় সম্পদ হিসেবে উল্লখ করেছেন । ইতিহাসের আলোকে বলেন,  সেই সমাজকে উন্নয়নশীল বলে যে সমাজে জনসংখ্যা বিরাট বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসংখ্যা কে তিনি সমস্যা হিসেবে দেখেননি । জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনাকে প্রয়োজনীয় কোন উপায় মনে করেননি । কারণ হিসেবে দেখান পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারে অতি উন্নত সমাজ । জনসংখ্যা এই ভূখণ্ডে সমস্যা হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখান নারী ও পুরুষের মাঝে তফাৎ । মানব সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ও নারীর পিছিয়ে থাকা ।

দেশের রাজনীতি ও জাতির অবস্থা নিয়ে বলতে গিয়ে নিয়ে আসেন সেনাবাহিনীর প্রকৃতি ও গুরুত্ব সম্পর্কে । পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলো কোন না কোন ভাবে সেনাবাহিনীর অধীনে বাস করে ।বিষয়টি বলতে গিয়ে আলোচনায় এসে যায় পাকিস্তান রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থা । পাকিস্তান রাষ্ট্র হওয়ার পর ১৯৫৯-৬০ সালের দিকে আইয়ুব খান ও ইস্কান্দার মির্জা রাজনীতিকে বন্দী রাখেন সেনানিবাসে । যা বিরাজ ছিল আর বহুদিন ।

সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে যারা জাতির দাবি আদায়ের নেতৃত্বে থাকেন ক্রমান্বয়ে অকিঞ্চিৎকর হয়ে পরেন । যারা ১৯৪৭ সালে বাঞ্ছনীয় ছিল তারা ৭১ এসে তাতে থাকতে পারেননি । তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যারা ১৯৭১ সালে সরকারের নেতা ছিল তারা পরবর্তীতে নেতৃত্বপদে কিনা তা নিয়ে ।

সম্পদের অসম বণ্টন একটি বিষয় যা দেশকে শুধু পিছিয়ে রাখতে পারে । নারী- পুরুষে পার্থক্য, নগর-গ্রাম পার্থক্য যা সৃষ্টি করছে দুটি জাতির ।

বক্তৃতার পুরো অংশে স্বাধীনতার এক দশক ও অতিক্রম না দেশর মূল সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে এযাবৎ কালের বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ মানুষটি ।

Related Posts

About The Author

Add Comment