বাংলা না ইংরেজি – লিখবো কোন ভাষায়?

প্রশ্নটা ২০১৬ সালের হিসেবে খুব প্রাসঙ্গিক। ইংরেজি ভাষা আজ বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক ব্যাবহৃত, প্রচলিত এবং সম্মানিত ভাষা। মানতে চাইছেন না? এতো গায়ের জোরের বিষয় নয় বাপু! ধরুন আপনার পাশাপাশি বসে রয়েছেন দু’জন লেখক একজন পুলিৎজার বা বুকার প্রাইজ উইনার, আর একজন বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্যে বাংলা একাডেমী অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী। কোন লেখকটিকে ঘিরে মিডিয়া এবং সাধারণ মানুষের ভিড় বেশী থাকবে? তার ওপর, ইংরেজি তো এখন আর সে অর্থে ঔপনিবেশিক শাসকদের ভাষা নয়। যেখানে যেখানে ইংরেজরা তাদের শাসনের ঘাঁটি গেড়েছিল, ইংরেজি ভাষার ওপর এখন তাদের সবার অধিকার। ফেসবুক, টুইটার, ব্লগের কল্যাণে গোটা পৃথিবী এখন গ্লোবাল ভিলেজ এবং ইংরেজি পৃথিবী জুড়ে মানুষদেরকে সংযুক্ত রাখার ভাষা। চিনুয়া আচেবে বা সালমান রুশদির মত লেখকেরা দেখিয়েছেন কিভাবে ইংরেজিতে লিখে ইংরেজ শাসকদের টুঁটি চেপে ধরা যায়। আর ইংরেজিতে লেখা অনুবাদ না হলে তো নোবেল প্রাইজের জন্যে লেখা দাখিলই করা যায় না। এই সূত্র ধরে অনেক বাঙ্গালী এখন ইংরেজিতে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
.
ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হয়ে, দিনরাত শেক্সপিয়র, জর্জ বারনার্ড শ’, ইয়েটস- এলিয়ট পড়ে আমি তবে বাংলায় কেন লিখি?
.
লেখালিখির ক্ষেত্রে একটা বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ভাষায় লিখছেন, সে ভাষার কৃষ্টি কালচার, সে ভাষার ভাষাভাষী মানুষদের gesture posture এর ব্যাপারে আপনাকে পুরোপুরি অবগত হতে হবে।
.
আমি জন্মসূত্রে বাঙ্গালী। আমি হাসি-কাঁদি বাংলায়, ভালবাসি বাংলায়। কে যেন বলেছিল, কোন একটা ভাষার ওপর সম্পূর্ণ দখল আনতে হলে রাতে ঘুমের মাঝে স্বপ্নও দেখতে হয় সে ভাষায়। তো আমার স্বপ্নের ভাষাও বাংলা। আমার অনেক বন্ধু আছে যারা ইংরেজিতে লেখে। এদের অধিকাংশেরই বেড়ে ওঠা বিদেশে, যেখানে তারা কথা বলতো ইংরেজিতে। আর গুটি কয় ইংরেজি লেখক- লেখিকা আছেন আমার পরিচিত, যারা ইংরেজি ভাষাটাকে মনে প্রাণে ধারণ করে তারপর এই ভাষার ওপর দখল আনছেন বা এনেছেন। এই দুই গ্রুপের কারো প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই, শুধুমাত্র লেখক হিসেবে তাদের সাথে আমার strategy টা ভিন্ন।
.
বাংলাদেশে বসে ইংরেজিতে লেখার প্রধান সমস্যা হল target audience নিয়ে। আমি ঢাকায় বসে ইংরেজিতে একটা কবিতা, গল্প বা উপন্যাস লিখলাম। কিন্তু সেটা পড়বে কে? তার পাঠক হবে কারা? অধিকাংশ বাঙ্গালীর স্বাচ্ছন্দ্যের ভাষা বাংলা। বিশ্বজুড়ে কম-বেশি ২৪ কোটি বাংলা ভাষাভাষী লোকের মার্কেটটা ধরতে হলে আপনাকে লিখতে হবে বাংলাতেই। ইংরেজিতে লেখেন এমন বন্ধুরা আমার দ্বিমত জানিয়ে বলতে পারেন – ইংরেজি লেখার পাঠক সার্কেল বিশ্বজোড়া। সারা দুনিয়ায় ইংরেজি ভাষার মার্কেট। আমি তাদের লেখার প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করতে চাই, একজন ইংরেজ বা ইংরেজি মাতৃভাষা – এমন কেউ দক্ষিণ এশিয়ার একটি “উন্নয়নশীল” দেশের উদীয়মান ইংরেজি ভাষার লেখকের লেখা বই কেন পয়সা খরচ করে কিনবে , বা আপনার লেখার প্রতি আগ্রহীই বা কেন হবে? ভেবে দেখতে পারেন।
.
আর ধরুন, আপনার বাবা একজন বিগ শট, বিশাল কোন এক ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক, আপনাকে প্রমট করতে একটা বিশাল মাপের literary festival বাংলাদেশের মত একটা দরিদ্র দেশে নিয়ে আসতে পারে। তার পরেও, ইংরেজি ভাষাভাষী পাঠকেরা, বা সেখানকার সাহিত্যিকেরা, সাহিত্য সমালোচকেরা আপনাকে আপন করে নেবেনা। আমি এখনও মনে করি, পৃথিবী জুড়ে যতগুলো দেশে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসকদের কালচারাল সেন্টার বা এমব্যাসিগুলো আছে এদের কেন্দ্রীয়ভাবে মনোভাবটা এখনও পীঠ চাপড়ানোর, বা পৃষ্ঠপোষকতার।
.
এই সব কিছু বিবেচনায় রেখে আমি লিখি বাংলা ভাষায়, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্যে। আমি বাঙ্গালীদের সমস্যা নিয়ে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, তাদের ভালোবাসা পাবার জন্যে মুখিয়ে থাকি।
.
গবেষণা বা রিসার্চের ভাষা ইংরেজি হতে পারে, কিন্তু সাহিত্যের ভাষা হিসেবে ইংরেজি? নৈব নৈব চ!
.
-সাজিদ উল হক আবির
৩০ জানুয়ারি ২০১৬,
রাত ৯টা ৫০,
উত্তর কমলাপুর, বাজার রোড, ঢাকা।

Related Posts

About The Author

Add Comment