বাক্সবন্দি, একটি হৃদয়ছোঁয়া ছোটগল্প সংকলন

নতুন লেখকদের নতুন বই পড়তে আমি সবসময় একটা ঝামেলায় পড়ি। সেটা হলো পুরো পড়ার ধৈর্য্য থাকে না। হয় বইটা খুবই দুর্বল ও নিম্ন মানের বা কারো কাটকপি বা ভাষা খুবই দুর্বল। আর গল্পের ক্ষেত্রে তো কথা-ই নেই। এতো গল্প কবিতার বই বের  হচ্ছে তার মধ্যে ভালোটা খুজে বের করা সিন্ধু সেচে মুক্তা আনার মতো ব্যাপার। এজন্য সাধারণত ক্লাসিকেই আমার ভরসা।

কিন্তু বর্তমানের ভাষাটা ধরার জন্য, বর্তমানে কিভাবে গল্প লেখা হচ্ছে, বাংলাদেশের গল্প কতটুকু আগালো তা বুঝার জন্য নতুন প্রকাশিত লেখকদের বই পড়া দায়ের মধ্যেই পড়ে। এজন্য অনেকটা তেতো ঔষধ গেলার মতো চোখ বুঝে অনেক বই পড়ে ফেলি। তবে অপেক্ষায় থাকি একটা নতুন বই আমাকে তাক লাগিয়ে দিক। আমার পুরোটা দিনের ভাবনার জগত দখল করে নিক। এমন ঘটনা খুব সময়ই ঘটে। আজকের দিনটা মনে হয় একটু ব্যতিক্রম। একটা গল্প বইয়ের প্রথম গল্পটা পড়া শুরু করলাম, ভালো লাগলো। তারপর আরো কয়টা পড়ে দেখলাম, ছুঁয়ে গেল। অবশেষে না শেষ করে উঠতে পারলাম না। আর সাথে সাথেই বইটা নিয়ে একটা লেখার জন্য হাত চঞ্চল হয়ে উঠলো।

বইটার নাম হচ্ছে বাক্সবন্দি। বইটা লিখেছেন তাসমিয়াহ্ আফরিন মৌ। আদর্শ থেকে প্রকাশিত মাত্র ৭১ পৃষ্ঠার এ গল্প সংকলনটির প্রচ্ছদটি অসাধারণ। সবুজ কাপড়ের মলাটে ‘বাক্সবন্দি’ নামটিকে বাক্সের মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়েছে। প্রচ্ছদটি আবার লেখক নিজে করেছেন। এটা বইয়ের বাইরের ঠাটের কথা। নিশ্চয়ই আপনারা বইয়ের বাইরের ঠাটের গল্প শুনতে বসেননি। কেন আমার কাছে ভালো লেগেছে, কেন পুরো বইটা এক টানে পড়তে হলো সেটা জানতে চাইছেন। চলেন তাহলে বইয়ের অন্দরমহলে প্রবেশ করি।

এটা আগে বলে রাখা প্রাসঙ্গিক যে লেখক বইটিকে পাঁচটি পর্বে ভাগ করেছেন। পর্ব এক-এর শিরোনাম ‘দৃষ্টি’। বাকি পর্বগুলো যথাক্রমে পর্ব দুই: শ্রবণ, পর্ব তিন: স্বাদ, পর্ব চার: ঘ্রাণ, পর্ব পাঁচ: স্পর্শ। প্রথম যে গল্পটি আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে বইয়ের ভেতর ঢুকিয়ে দিল সেটা হলো, ‘প্রেমিকার বাবার মৃত্যুর পর আমি মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলি’। প্রথমে গল্পের শিরোনামটা আমাকে টেনেছে, তারপর গল্প এবং গল্পের মোচড়। লেখকের আরো কয়েকটি গল্পের মতো এ গল্পের কথক একজন পুরুষ। গল্পগ্রন্থটি পড়ার সময় এটা ভুলে যাওয়াই বেটার যে এর স্রষ্টা একজন নারী। কারণ এখানে বেশিরভাগ গল্পেরই কথক কোন না কোন পুরুষ। নারী কথকও আছেন বেশ কজন। ‘প্রেমিকার বাবার মৃত্যুর পর আমি মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলি’ গল্পে পুরুষ প্রেমিকটি তার প্রেমিকার বাবার মৃত্যুর পর সেখানে যে দৃশ্যকল্প সৃষ্টি হয় এবং তার মনের মধ্যে যে খেলা চলতে থাকে তা বলার চেষ্টা করেছেন। গল্পের ভাষা ও ভঙ্গির কথা যদি বলি তাহলে বলবো সেটা অনেক আরামপ্রদ। মাত্র তিন-চার বা পাঁচ শব্দের বাক্য। পড়তে হৃদপিণ্ডে শ্বাস-প্রশ্বাসের চাপ পড়ে না কিন্তু গল্পগুলোর ছোট ছোট মোচড়গুলো, প্রকাশভঙ্গিগুলো হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

লেখক গল্প নিয়ে অনেক পরীক্ষণ করেছেন। তার গল্পে অনেক মৃত মানুষের কথা আছে। তার গল্পের প্রধান থিমগুলোর মধ্যে মৃত্যু, একাকীত্ব, সম্পর্ক, সম্পর্কচ্ছেদ, স্মৃতি রোমন্থন ইত্যাদি।

দ্বিতীয় পর্বে ‘হাসি’ গল্পটা আকর্ষণ করলো। এখানে একটা মরা লাশের জবানিতে গল্পটা শুরু হলো। কিভাবে তার শরীরে মাটির দলা পড়ছিল, তার সন্তান পশ্চিম দিকে মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছিল এবং সন্ধারাতে শিয়ালের মাটি খোঁড়ার শব্দ হচ্ছিল, মৃত গল্পকথক ভয় পাচ্ছিল আবার কারো হুইসেলের আওয়াজে শেয়াল পিছু হঁটছিল এমন টানটান বর্ণনা। গল্পের মজাটা হচ্ছে যখন আরো সামনে আগানো হবে। দীর্ঘদিন কবরে থাকার পর শরীরের মাংস মাটির সাথে মিশে যেতে থাকে। অবশিষ্ট থাকে শুধু কংকাল। একদিন এই কংকালটা চুরি করে নিয়ে যায় লাশ ব্যবসায়ীরা। এই মৃত কংকালের যে অনুভূতি তা উঠে আসে এখন। মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা তাকে কিভাবে নেড়েচেড়ে দেখে তার কথা জানায়। এত মানুষের সামনে উলঙ্গ থাকতে তার যে অস্বস্তি, একটু কাপড় পাওয়ার যে আকুতি সেটা গল্পকার অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন।

আরেকটা গল্প আমার ভালো লেগেছে সেটা হলো ‘মৃত বোকা হেল্পার’। মালিবাগ রেলগেটের ট্রাফিক সিগনালে বাসের হেল্পার মারা গেছেন। এটা নিয়ে আশেপাশের লোকদের যে নির্মোহ বর্ণনা, নিরাবেগ আচরণ পাঠকদের ছুঁয়ে যাবে। গল্পটা পড়তে গিয়ে মনে হবে গল্পের ‘তুরাগ’ বাসটির মতো মানুষগুলো যেন যন্ত্র হয়ে গেছে। তাদের কোন আবেগ, অভিযোগ, অনুকম্পা, ভালোবাসা নেই। যেন একটি মেশিন যে শত্রু-মিত্র ফারাক করতে পারেনা, সামনে যে-ই আসুক ঢলে দেয়, পিষে দেয় রাজপথে। আর ক্ষুদ্র হেলপারের জীবন আর একটা পিপড়ার জীবন একই কথা। পিপড়াকে ইচ্ছে হলে আমরা ঢলে দেই। নিজেরা মাঝে মাঝে ঈশ্বরের মতো ক্ষমতাবান মনে করি। তেমনি এই যন্ত্রসভ্যতা ওই পিপড়েদের মতো মানুষদের খুব সহজেই ঢলে দিতে পারে। এ নিয়ে শোরগোল করার কিছু নেই, নিরাবেগ থেকে দৃশ্য উপভোগ করা এবং সংবাদ পাঠের মতো বর্ণনা করে দিয়েই দায় সাড়া যায়।

পর্ব তিন-এর ‘একজন নায়িকার ডায়েরি থেকে’ গল্পটি আমার খুব ভালো লেগেছে। একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ নায়িকার জবানিতে অনেক সুন্দর করে তার জীবনকাহিনী উঠে এসেছে। লেখিকার অনেকগুলো কৃতিত্বের মধ্যে এটা বড় কৃতিত্ব যে বিভিন্ন গল্পে বিভিন্ন জনের জবানিতে গল্প বলা হয়েছে। সেটা করতে গিয়ে একটার সাথে আরেকটা মিশে যায়নি এবং একই কথকের পুনরাবৃত্তি হয়নি, একই গল্প পুনরায় বলার চেষ্টা করেননি। প্রত্যেকটিতেই নতুন ভঙ্গি, নতুন কথক, নতুন মোচড়। এ গল্পটিতে একজন নায়িকা কিভাবে বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যান, বেলজিয়াম আয়নাতে শুধু নিজের বাহিরটাকেই দেখেননা, ভেতরটাকেও উল্টে পাল্টে দেখেন, তাকে নিয়ে খেলেন-ভাঙ্গেন আর গড়েন। বাস্তব জীবনেও নায়িকা যে বিভিন্ন চরিত্রের অভিনয় করে যান সে অভিযোগ করে বসে তার তরুণ প্রেমিক। তার মতে নায়িকা, ‘কখনো খুব প্রাণবন্ত তরুণী আবার কখনো বিধবা নারীর মতো বিষণ্ন’। কখনো খুব আবেগঘন আবার কখনো ছন্নছাড়া ক্রূর দূরের কেউ’।

গল্পের শেষ লাইনটি লক্ষণীয়। সেখানে গল্পকথক নিজেকে আবিষ্কার করেন এভাবে, ‘আমি আমার সম্পূর্ণ শরীর, আমার শরীরসমান দৈর্ঘ্যের আয়নার সামনে মেলে দাঁড়াই। কিন্তু আমি চমকে উঠি আয়নায় কোনো মানুষের ছায়া না দেখে! দেখি একটি চৌকোনা বাক্সে একটি নিষ্প্রাণ বার্বি ডল!

পর্ব চার-এ ‘আপন মানুষ’ নামে একটি চিঠি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। বই আলোচনা বা সমালোচনা লেখার সময় অনেকেই নির্মোহ, নিরাবেগ থাকার কথা বলে। গল্প তো আবেগ নিয়ে খেলাধূলা। মানব জীবনের সংকট, সম্ভাবনা, সুখ-দুঃখের কথা লেখা থাকে গল্পে। সেখানে একজন পাঠক বা সমালোচক যদি নিরাবেগ থাকেন তাহলে তিনি কি আর মানুষ থাকেন, নাকি ‘তুরাগ’ বাসের মতো যন্ত্র হয়ে যান? না, আমি নিরাবেগ থাকতে পারি না। এ চিঠিটি পড়ার সময় দু’চোখের কোণাতে একটু পানি ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল আর এক যুগ আগে এমন কয়েকটি চিঠির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। তখন মোবাইল এত সহজলভ্য হয়নি, চিঠির প্রয়োজনীয়তা একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। তখন মেঝো আপার কাছে চিঠি লিখেছিলাম। পাঠককে নিজের গল্পের সাথে যুক্ত করতে পারা যদি একটা সফলতা হয় তাহলে লেখক এখানে খুব ভালোভাবেই সফল হয়েছেন। ‘আপন মানুষ’ একটি চিঠি। ছোট ভাইয়ের কাছে বোনের চিঠি। ভাই-বোনের একসাথে বড় হয়ে উঠা, খুনসুটি, এর আবেগময় বর্ণনা পাঠককে ছুঁয়ে যাবে এ নিয়ে সন্দেহ নেই। আর প্রত্যেকটি ভাই-বোনের গল্পগুলো ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু স্বাদ একই।

সর্বশেষ যে গল্পটির কথা বলে আজকের আলোচনা শেষ করবো সেটা হলো, ‘কবি স্বামীর মৃত্যুর পর আমার জবানবন্দি’। এখানে একজন মৃত কবির বিধবা স্ত্রীর জবানিতে কাহিনীটি এসেছে। জীবিতকালে কবি ঘরের বাইরে এবং ভেতরে যে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করতেন, বিয়ের আগে ও পরে ব্যবহারের ভিন্নতা আসে তার সুন্দর চিত্রায়ন করেছেন। কবি বাহিরের দুনিয়ায় অনেক সম্মানিত হলেও তার বউয়ের কাছে ছিল ঘৃণিতজন। এজন্য মৃত্যুর পরও সে ঘৃণার প্রলেপ সড়ে নাই বরং আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এজন্য গল্পের শেষটাতে দেখতে পারবো কবিপত্নী তার স্বামীর দেয়া সাদা ফুলটি ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। ‘আমার মৃত স্বামীর দেওয়া একমাত্র উপহার সাদা ফুলটা বের করি এবং নাকের কাছে আনি। শ্বাস নেই। না, কোন সুগন্ধ নেই। কেবল ধুলার গন্ধ নাকে লাগে। আমার ডাস্ট এলার্জি আছে। আমি ফুলটা জানালা দিয়ে ফেলে দেই।’

আসলে কবির স্ত্রী শুধু সাদা ফুলটিই ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে না। ফেলে দিচ্ছে তার সাথে জমে থাকা অনেক স্মৃতি যেগুলো ডাস্টের মতো এলার্জি বা পীড়া দিতে পারে। এজন্যে স্মৃতি থেকে মুক্তি নিয়ে বর্তমানের জীবনেই মনোযোগ দিতে চান কবিপত্নী বা কথিকা।

এখানেই শেষ করতে চাই। তবে শেষের আগে বলতে চাই ‘বাক্সবন্দি’ আমার খুব ভালো লেগেছে। এটা কোন মহান সাহিত্য হলো কি হলো না সেটা নিয়ে তর্ক করতে চাই না। তবে পাঠককে টানা এবং তাদের মনোযোগ ধরে রাখার যথেষ্ট যোগ্যতা রয়েছে লেখকের।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

[email protected]

Related Posts

About The Author

Add Comment